শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু

যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহ তা' আলার যিনি সকল সৃষ্টি জগতের পালনকর্তা।

মুহাম্মদ (সাঃ)-আল্লাহর রাসূল

মুহাম্মদ (সাঃ)-সকল মানুষের জন্য উদাহরন, সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ, ও আল্লাহর রাসুল

আল কোরআন - মহান আল্লাহ প্রদত্ত কিতাব

এ সেই কিতাব যাতে কোনই সন্দেহ নেই। পথ প্রদর্শনকারী পরহেযগারদের জন্য,

আমাদেরকে সরল পথ দেখাও

আমরা একমাত্র তোমারই ইবাদত করি এবং শুধুমাত্র তোমারই সাহায্য প্রার্থনা করি।

আল্লাহ নিতান্ত মেহেরবান ও দয়ালু

সে সমস্ত লোকের পথ, যাদেরকে তুমি নেয়ামত দান করেছ। তাদের পথ নয়, যাদের প্রতি তোমার গজব নাযিল হয়েছে এবং যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে।

Labels: , ,

ইস্তেগফার (ক্ষমাপ্রার্থনা) করার সুফল

শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু।



فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا
يُرْسِلِ السَّمَاء عَلَيْكُم مِّدْرَارًا
وَيُمْدِدْكُمْ بِأَمْوَالٍ وَبَنِينَ وَيَجْعَل لَّكُمْ جَنَّاتٍ وَيَجْعَل لَّكُمْ أَنْهَارًا


বাংলা ভাবার্থঃ “অতঃপর বলেছিঃ তোমরা তোমাদের পালনকর্তার ক্ষমা প্রার্থনা কর। তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের উপর অজস্র বৃষ্টিধারা ছেড়ে দিবেন,  তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি বাড়িয়ে দিবেন, তোমাদের জন্যে উদ্যান স্থাপন করবেন এবং তোমাদের জন্যে নদীনালা প্রবাহিত করবেন”। [ ৭১:১০-১২] 

English Translation:  “And said, 'Ask forgiveness of your Lord. Indeed, He is ever a Perpetual Forgiver. He will send [rain from] the sky upon you in [continuing] showers And give you increase in wealth and children and provide for you gardens and provide for you rivers”. [71:10-12]


কুরআনের উনত্রিশতম পারার অন্তর্ভুক্ত সুরা নুহের তিনটি (১০, ১১ এবং ১২)  আয়াত নিয়ে আলোচনা করবো। আল্লাহ্‌‘তালা যুগে যুগে বিভিন্ন কাওমের কাছে নবী-রাসুল প্রেরণ করেছেন। এই আয়াতে নুহ (আঃ) আল্লাহ্‌কে বলছেন, তিনি (আঃ) তাঁর কাওমের জন্য কি কি সম্পন্ন করেছেন বা তাদেরকে কীভাবে আল্লাহ্‌র দিকে আহ্বান করেছেন। এই ঘটনাটি কুরআনে অন্তর্ভুক্ত করার আল্লাহ্‌‘তালা মনস্থ করেছেন, কারণ এই আয়াতগুলোতে একটি চমৎকার শিক্ষা আছে। অন্তর থেকে আল্লাহ্‌র কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করার সুফল এখানে বর্ণনা করা হয়েছে। বিশুদ্ধ ইস্তেগফার করলে কি পাওয়া যাবে বা লাভ করা যাবে? আপনি আল্লাহ্‌র কাছে ইস্তেগফার (ক্ষমাপ্রার্থনা) করছেন, স্বভাবতই বিনিময়ে আপনি আল্লাহ্‌র মার্জনা পাওয়ার আশা করবেন এবং ইন শা আল্লাহ্‌ পাবেন। কিন্তু ক্ষমাপ্রাপ্তি ছাড়াও আর বাড়তি কি কি সুবিধা পাওয়া যাবে? আল্লাহ্‌ যখন আপনার ইস্তেগফার কবুল করেন, তখন মার্জনা করার সাথে সাথে তিনি বান্দার উপর দয়াপরবশত কিছু দুনিয়াদি সুবিধাও দান করেন। এই আয়াতগুলোতে সেটাই বলা হয়েছে। “ফাকুলতুস্ তাগফিরু রাব্বাকুম; ইন্নাহূ কা-না গাফফা-রা” অর্থাৎ ‘অতঃপর বলেছিঃ তোমরা তোমাদের পালনকর্তার ক্ষমা প্রার্থনা কর। তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল’। একজন প্রকৃত ধর্মপ্রচারকদের যা কিছু করণীয় নূহ (আঃ) তার সব কিছুই প্রয়োগ করেন তার সম্প্রদায়ের হেদায়েতের জন্য। তিনি বারে বারে আল্লাহ্‌র বাণী পুণরুক্তি করেন, শোনান, প্রচারণা করেছেন,  প্রকাশ্যে ও গোপনে ব্যক্তিগত ভাবে আহ্বান করেছেন।  তিনি তাঁর কাওমকে আল্লাহ্‌র দরবারে অন্তর থেকে ক্ষমাপ্রার্থনা করার আবেদন করেন, এবং আশ্বস্ত করেন যে নিশ্চয় আল্লাহ্‌ বারে বারে ক্ষমাশীল। তিনি তাঁর বান্দাদেরকে ক্ষমা করতেই থাকেন, করতেই থাকেন, করতেই থাকেন --- যতক্ষণ পর্যন্ত তারা ক্ষমা চায়।

 নুহ (আঃ) আরও যোগ করেন যদি তোমরা ক্ষমাপ্রার্থনা কর তাহলে,  “ইউরসিলিস্ সামা-আ ‘আলাইকুম মিদরা-রা”, অর্থাৎ ‘তিনি তোমাদের প্রচুর রহমতের বৃষ্টি দেবেন’। লক্ষ্য করুন, নুহ (আঃ) এর কাওম এর জন্য কিন্তু বৃষ্টি ঠিকই এসেছিল। কিন্তু সেই বৃষ্টি রহমতের বৃষ্টি ছিল না, সেটা ছিল তাদের বরবাদের জন্য বৃষ্টি।  যদি তারা নূহ (আঃ) আহ্বানে কর্ণপাত করতো এবং আল্লাহ্‌র প্রতি ঈমান আনায়ন করতো, তবে আল্লাহ্‌র রহমতস্বরূপ বৃষ্টিপাত হতো। কিন্তু তারা নূহ্‌ নবীর আহ্বানে সাড়া দিলো না ফলে যে বৃষ্টি তাদের জন্য রহমত হতে পারতো, সেই বৃষ্টি তাদের জন্য অভিশাপরূপে আর্বিভূত হলো। প্রচন্ড বৃষ্টিপাতের ফলে সৃষ্টি হলো এক মহাপ্লাবন যা তাদের সকলকে ভাসিয়ে নিয়ে গেলো। যখন কোন শহর বা দেশ খরা কবলিত হয় তখন মুসলিমদেরকে ইস্তেগফার করতে উৎসাহিত করা হয়। একবার দুর্ভিক্ষের সময় উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বৃষ্টির জন্য দোয়া করতে বের হলেন এবং শুধু  ইস্তেগফার করেই শেষ করলেন। সবাই বললো, “হে আমীরুল মু’মিনীন আপনি তো আদৌ দোয়া করলেন না”। তিনি বললেনঃ আমি আসমানের ঐসব দরজায় করাঘাত করেছি যেখান থেকে বৃষ্টি বর্ষিত হয়। একথা বলেই তিনি সূরা নূহের এ আয়াতগুলো তাদের পাঠ করে শুনালেন। [ইবনে জারীর ও ইবনে কাসীর]



তিনি (আঃ) আরও বলেন, “ওয়া ইউমদিদকুম বিআমওয়া-লিওঁ ওয়া বানীন” অর্থাৎ ‘তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি বাড়িয়ে দিবেন’; এবং  “ওয়া  ইয়াজ্ব‘আল লাকুম জান্না-তিওঁ ওয়া ইয়াজ্ব‘আল লাকুম আনহা-রা” অর্থাৎ ‘তোমাদের জন্যে উদ্যান স্থাপন করবেন এবং তোমাদের জন্যে নদীনালা প্রবাহিত করবেন’ । আল্লাহ্‌র নেয়ামতের কয়েকটি ধাপ এখানে উল্লেখ করা হয়েছে বৃষ্টি এবং শষ্য যা পরস্পর সম্পর্কিত, সম্পদ ও জনশক্তি [সন্তান-সন্ততি], সমৃদ্ধ বাগান, স্থায়ী নদীনালা --- সবই হচ্ছে কোন জাতির জন্য সমৃদ্ধির লক্ষণ।  একবার এক ব্যক্তি হাসান বাসরীর মজলিসে অনাবৃষ্টির অভিযোগ করলে তিনি বললেনঃ আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। অপর এক ব্যক্তি দারিদ্রের অভিযোগ করলো। তৃতীয় এক ব্যক্তি বললোঃ আমার কোন ছেলেমেয়ে নেই। চতুর্থ এক ব্যক্তি বললোঃ আমার ফসলের মাঠে ফলন খুব কম হচ্ছে। তিনি সবাইকে একই জবাব দিলেন। অর্থাৎ আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। লোকেরা বললোঃ কি ব্যাপার যে, আপনি প্রত্যেকের ভিন্ন ভিন্ন অভিযোগের একই প্রতিকার বলে দিচ্ছেন? তখন তিনি সূরা নূহের এ আয়াতগুলো পাঠ করে শুনালেন।

 ইসলাম এতো চমৎকার একটি দ্বীন যে এখানে মুসলিমদের জন্য পার্থিব সমৃদ্ধির প্যাকেজও আছে। আল্লাহ্‌র কাছে অন্তর থেকে বিশুদ্ধ ইস্তেগফার করুন, আল্লাহ্‌ সেই বান্দা বা জাতির জন্য পার্থিব আশীর্বাদ প্রেরণ করবেন। এই কল্যাণে সিক্ত হয়ে পরলোকের সুখশান্তির জন্য নিজেকে তৈরি করে নিবেন। সুবাহান’আল্লাহ! কতই না সুন্দর আমাদের এই দ্বীন! আপনাকে বৃষ্টি, অর্থ-সম্পদ, সন্তানসন্ততি,  সমৃদ্ধ নগরে সুখ-শান্তিতে বসবাস করা --- এর কোন কিছুই আলাদাভাবে চাইতে হবে না। আপনি শুধু অন্তর থেকে ক্ষমাপ্রার্থনা করবেন। আল্লাহ্‌ এতো খুশী হবেন, তিনি সন্তুষ্ট হয়ে আপনার গুনাহ মার্জনা করবেন এবং তাঁর সাথে বোনাসস্বরূপ অন্য সব জিনিসও দেবেন। এইসব জিনিস আল্লাহ্‌র কাছে কোনই মুল্য রাখে না, কিন্তু আপনার কাছে অনেক মুল্যবান। আল্লাহ্‌‘তালার কাছে যেটা বড় ব্যপার সেটা হচ্ছে বান্দার আন্তরিক তাওবা। এই আয়াতে একটি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ তুলে ধরা হয়েছে। আল্লাহ্‌র কাছে কোনটা মুল্যবান এবং আমাদের কাছে কোনটা বেশী মুল্যবান?


আল্লাহ্‌‘তালা এখানে একশ্রেণীর মুসলিমদেরকে মেসেজ দিচ্ছেন। তারা মনে করে আল্লাহ্‌র কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করার পর তো সেই একই গুনাহ আর করতে পারবো না। সুদ, ঘুষ, কালোবাজারি, নোংরা রাজনীতি, দুই নম্বরী ব্যবসা, হারাম জিনিস বেচা-কেনা, নোংরা বিনোদন জগতের তারকা -– এইসব কাজ যদি নাই করতে পারি তাহলে আমাদের অর্থ-খ্যাতি-সম্পদ-ঘরবাড়ী-বিলাসী জীবন কিছুই তো থাকবে না। পথের ফকিরে পরিণত হবো। আল্লাহ্‌র কাছে ইস্তেগফার করলে যদি ইনকাম বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে বরং ক্ষমা চাওয়ার দরকার নাই। শেষ বয়সে হজ্জ করে এসে হিজাব পড়লে/ দাঁড়ি রাখলেই চলবে। এই শ্রেণীর মুসলিমদের আল্লাহ্‌ বলছেন, আল্লাহ্‌কে অসন্তুষ্ট করে অসৎ পথে যদি কেউ পার্থিব ‘সাফল্য’ খোঁজে তাহলে তাকে পাপের বোঝা নিয়ে একা পথ চলতে হবে। অপরপক্ষে, আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টির জন্য যদি কেউ সৎপথে থাকে এবং সর্বদা নিজের গুনাহের জন্য আল্লাহ্‌র কাছে ইস্তেগফার করে। তাহলে আল্লাহ্‌ খুশী হয়ে মার্জনা করার সাথে সাথে তাকে অর্থ-সম্পদ-সন্তান-সমৃদ্ধ জীবন সবকিছুই দান করবেন।  আন্তরিক ইস্তেগফারকারী মুসলিমের সাথে সর্বদা আল্লাহ্‌র আশীর্বাদ থাকবে। সুবাহান’আল্লাহ!

 আল্লাহদ্রোহিতার আচরণ মানুষের জীবনকে শুধু আখেরাতেই নয় দুনিয়াতেও সংকীর্ণ করে দেয়। অপরপক্ষে কোন ব্যক্তি/জাতি যদি অবাধ্যতার বদলে ঈমান, তাকওয়া এবং আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মেনে চলার পথ অনুসরণ করে তাহলে তা শুধু আখেরাতের জন্যই কল্যাণকর হয় না, দুনিয়াতেও তার ওপর আল্লাহর অশেষ নিয়ামত বর্ষিত হতে থাকে। মৃত্যু কখনো কড়া নেড়ে আসে না। তাই সময় থাকতেই আমরা সবাই যেন আল্লাহ্‌ রাব্বুল আলামিনের কাছে ইস্তেগফার করি। আন্তরিকভাবে আল্লাহ্‌র কাছে ইস্তেগফার করলে আল্লাহ্‌ তাঁর বান্দাকে মার্জনা করেন। তিনি শ্রেষ্ঠ মার্জনাকারী, তিনি মার্জনা করতে ভালোবাসেন। আসুন আমরা সবাই আল্লাহ্‌র কাছে বিশুদ্ধ ইস্তেগফার করি। তাহলে আল্লাহ্‌‘তালা আমাদেরকে ক্ষমা করার পাশাপাশি ইহকাল ও পরকালের সাফল্য দান করবেন, ইন শা আল্লাহ্‌।


[নোমান আলী খানের কুরানিক জেমস (Quranic Gems) সিরিজের ঊনত্রিশতম পর্বের বাংলা ভাবার্থ। দ্রুত অনুবাদ করার কারনে কিছু ভুল-ত্রুটি থাকাটাই স্বাভাবিক। আমার এই অনিচ্ছাকৃত ভুল আশাকরি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। যা কিছু কল্যাণকর তার সম্পূর্ণই আল্লাহ্‌র তরফ থেকে, আর যা কিছু ভুল সেটি সম্পূর্ণ আমার। আল্লাহ্‌ রাব্বুল আলামিন আমার সেই ভুলগুলো মার্জনা করুন। তিনি পরম ক্ষমাশীল, অসীম দয়ালু। আল্লাহ্‌তালা আমাদের সকলকে কুরআনের আয়াতসমূহ বুঝে পড়ার তৌফিক দান করুন এবং  সঠিক মর্মার্থ বুঝে সেই ভাবে জীবনকে পরিচালিত করার মত হিকমাহ, সাহস ও ধৈর্য দিক।  ]


সোর্স অনুবাদ - সেফাত মেহজাবীন

(To watch the video go to: https://www.youtube.com/watch?v=Ugx4MZK3EGQ)

Source:https://www.facebook.com/smahjabeen/notes

0 comments
Labels: , ,

পরিপূরক -- সূরা ইখলাস হতে শিক্ষামূলক উপদেশ

সূরা ইখলাস হতে শিক্ষামূলক উপদেশ

"আহাদ" এই ধারণাটি তথা একক সত্ত্বার এই ধারণাটি। পাকিস্থানে ইসলামিক ধর্মতত্ত্বের বিশিষ্ট একজন লেখক ডঃ রফী’ উদ্দীন এই সুরাহ সম্বন্ধে মন্তব‍্য করতে গিয়ে অতি আশ্চর্য‍্যজনক কিছু তত্ত্ব প্রদান করেন। আমি আসলেই এর প্রশংসা করি, এবং আমি মনে করি আধুনিক শ্রোতাদের মনে এই তত্ত্বগুলো গেঁথে দেওয়া প্রয়োজন। আল্লাহ মানব জাতির মধ্যে তাঁর সম্পর্কে জ্ঞান প্রদান করে তৈরী করেছেন। মানব জাতি শুরু থেকেই জানত যে, সর্বোচ্চ সত্ত্বা আল্লাহ বিদ‍্যমান। এরকম নয় যে, একজন উপাস‍্য আছেন, তিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন, এখন আমরা যা ইচ্ছা তাই করতে পারি। না, সেটা নয়। বরঞ্চ তিনিই রব, তিনিই প্রভু। আমার জীবনের মূল লক্ষ‍্যবস্তু হচ্ছে তিনি যা চান তা করা।এটা আমার সর্বোচ্চ আদর্শ। তাঁর দাসে পরিণত হওয়াই হচ্ছে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া। এটাই হবে আমার জন‍্য সবচেয়ে বড় সম্মানের বিষয়। আল্লাহর নবী (সাঃ), তাঁর বড় সম্মান ছিল তিনি আল্লাহর ‘‘عبد’’ হয়েছিলেন। আল্লাহর দাস হওয়া সবচেয়ে সম্মানের বিষয়। এটাই হচ্ছে জীবনের মূল লক্ষ‍্যবস্তু এবং আল্লাহ সেই লক্ষ‍্যবস্তুটি সকল মানবজাতির অন্তরে খোদাই করে দিয়েছেন। 
 
কিন্তু যদি আপনি সেই লক্ষ‍্যবস্তুর দিশা হারিয়ে ফেলেন তখন যেটা হয়... সেই লক্ষ‍্যবস্তু পরিপূর্ণতার পিপাসা বা ক্ষুধা আপনার মধ্যে বিরাজ করে, যদ্বারা আল্লাহ আপনাকে সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু আপনার ক্ষুধা যখন স্বাস্থ‍্যকর খাবার দ্বারা নিবারিত হয় না, তখন কি দিয়ে নিবারণ করেন? আপনি যদি সঠিক খাবার না পান, আপনি কি তাহলে বলবেন যে, আমি খাবই না। না। যখন কোন ব‍্যক্তি ক্ষুধায় কাতর থাকে এবং তার পছন্দের কোন খাবার যদি তখন সে না পায় অথবা কোন স্বাস্থ‍্যকর খাবারও নেই, শুধু আছে ময়লা আবর্জনা, গাছের ছাল-পালা মানুষ কি তা নিয়েই চোষাচুষি শুরু করবে না, যখন সে এরকম পরিিস্থতির স্বীকার হবে? অবশ‍্যই করবে। যখন আপনি মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যকে ভুলে যান, সেটা যখন আর আপনার লক্ষ্যবস্তু হয় না, তখন অবশ‍্যই আপনি এর একটি পরিপূরক খুঁজে বের করবেন। কোন কিছু থেকে অনুপ্রাণিত হওয়া অবশ‍্যই জরুরী, এটাই হচ্ছে আপনার জীবনের উদ্দেশ‍্য।

যে ব‍্যক্তি আল্লাহকে পেয়েছে, তাঁদের কি হয়? নিশ্চয়ই আমার নামায, আমার কোরবানী এবং আমার জীবন ও মরণ বিশ্ব প্রতিপালক আল্লাহরই জন্য (সুরা আনআমঃ ১৬২)। এটা তাঁদের জন‍্য খুবই সহজ যে ব‍্যক্তি সত‍্যিকারভাবে আল্লাহকে খুঁজে পায়, তাদের সালাত আল্লাহর জন‍্য, তাদের ত‍্যাগ-তিতিক্ষা আল্লাহর জন‍্য, তাদের জীবন এবং মৃত‍্যু এখন আল্লাহর জন‍্য। যে পদ্ধতিতে তারা জীবনযাপন করে, খাওয়া-দাওয়া করে, ঘুমায়, তারা তাদের জীবনে কি করতে চান, তাদের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা, তাদের স্বল্পমেয়াদী পরিকল্পনা, তারা তাদের সন্তান-সন্ততিদের নিয়ে কি করবেন, তারা কেন পড়ালেখা করছেন, কোথায় চাকরী করবেন, সবকিছুই এখন আল্লাহর জন‍্য, এটাই তাদের মূল লক্ষ‍্যবস্তু। কিন্তু যে ব‍্যক্তির লক্ষ্যবস্তু সেটা নয়, তাদের অন‍্য একটি লক্ষবস্তু খঁুজে নিতে হয়। আর অতীতে সেটা হত হয়তো কোন মূর্তি বা অন্য কোন ধর্ম, তারা খুঁজে নিত অন‍্য কোন উপাস‍্য।

কিন্তু আমাদের সময়ে সেটা অনেক করুণ উদ্রেককর এবং হতাশাজনক। এখন আমাদের অনেকেই শরীর নিয়ে চিন্তায় মগ্ন এবং তারা দৈনিক ১৮ ঘণ্টা ব‍্যায়াম সাধন করছে। তাদের জীবনের একমাত্র উদ্দেশ‍্য হচ্ছে, নিজেকে দিনের পর দিন পেশীসম্পন্ন এবং শক্তিশালী করে তোলা। এটাই তাদের জীবনের একমাত্র উদ্দেশ‍্য- নিজেকে সবসময় উর্দ্ধে রাখা, নিজের আকৃতিকে ধরে রাখা ।অথবা তারা তাদের প্রশিক্ষকদেরকে সাথে নিয়ে লক্ষ‍্য ঠিক করে বলে,‘‘আমাকে আরো বেশী রেপস (Reps এক ধরনের ব‍্যায়াম) করতে হবে, বা আরো বেশী পুশআপস (Pushups এক ধরনের ব‍্যায়াম) করতে হবে, বা আমি চাই আমার ভারোত্তলনে (Bench Press) আরো বেশী ওজন যোগ হোক ইত‍্যাদিই তাদের লক্ষ‍্য, এটাই তাদের ইলাহ (উপাসনার বস্তু) হয়ে বসে।

একজন ব‍্যক্তি যার জীবনটাই ছিল টাকা-পয়সার জন‍্য এমন কোন মানুষের দেখা পেয়েছেন কি? যারা তাদের কাজের কথা ছাড়া আর অন‍্য কোন কিছুই বলতে পারে না। তারা পারেই না। হ‍্যাঁ, আমি এই কোম্পানীতে কাজ করেছি, আমি এটা করেছি, ওটা করেছি এবং যে মুহুর্তেই তাদের কাজ চলে যায়, তারা আত্মঘাতী হয়ে ওঠে, কারন তাদের সকল চিন্তা-ভাবনা শুধু কাজ নিয়েই ছিল। সারাজীবন তারা শুধু এটাই করেছে শুধুই এটা করেছে তারা, এটা তাদের লক্ষ‍্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিল।

কারো কারো জন‍্য সেটা হয় তাদের সন্তান-সন্ততিরা। তারা বাঁচে তাদের সন্তান-সন্ততিদের জন‍্য, তারা তাদের সন্তান-সন্ততির জন‍্য সব কিছুই করে থাকে, দিবারাত্রি তাদের সন্তান-সন্ততিদের নিয়ে ভাবে। তাদের মস্তিষ্কে আর কোন চিন্তাভাবনা স্থান পায় না, তাদের সামনে আর কোন লক্ষ‍্য থাকে না তাদের সন্তান-সন্ততিদের ছাড়া এর পেছনেই তারা দৌড়ে থাকে।

যখন আপনি তাঁকে (আল্লাহকে) খুঁজে পাবেন না, তখন আপনি অন‍্য কিছু খঁুজে নেবেন এবং তার পেছনেই দৌড়াতে থাকবেন এবং তার জন‍্য আপনি আপনার জীবন বিসর্জন দিয়ে দেবেন এ ব‍্যাপারে মানুষের মধে‍্য কোনই ব‍্যতিক্রম হয় না। আজকাল এমনকি এটা হতে পারে একটি অলস ব‍্যক্তির ক্ষেত্রে এবং আপনি আমাকে জিজ্ঞেস করতে পারেন অলস ব‍্যক্তিদের বেলায় কি হবে?

জানেন তো, ঐ বাচ্চা ছেলেমেয়েরা যারা দৈনিক ২০ ঘণ্টা ভিডিও গেমস খেলে এবং তাদের সোফা থেকে নামেই না তাদের লক্ষ‍্য কি ? সেটা হচ্ছে তাদের নিজেদেরকে বিনোদিত করা। পর্দার পেছনে বসে তাদের মস্তিষ্কের কোষ ক্ষয় করা। এটাই তাদের একমাত্র উদ্দেশ‍্য এখানেই তারা পৌঁছাতে চায় তা অর্জন করার লক্ষ‍্যে তারা কঠোর পরিশ্রমে ব‍্যস্ত। এগুলোই হচ্ছে তাওহীদকে বোঝার মনস্তাত্বিক তাৎপর্য।

‘‘আল্লাহ এক’’ এটা বলা অনেক সহজ কিন্তু আমার জীবনে তিনিই (আল্লাহ) কি একমাত্র বিষয়? শুধু তিনিই কি আমার জীবনের এমাত্র কেন্দ্রবিন্দু? নাকি আমার অন‍্য অনেক কিছু আছে যার পেছনে আমি দৌড়াচ্ছি বা অন‍্য অনেক বস্তু যার সামনে আমি নিজেকে সমর্পণ করি? আল্লাহ আড়ম্বরপূর্ণ ভাষায় আমাদের এই প্রশ্নটি করেন - তিনি বলেন,....হে মানুষ, কিসে তোমাকে তোমার মহামহিম পালনকর্তা সম্পর্কে বিভ্রান্ত করল? (৮২: ০৬) তোমার কাছে এত গুরুত্বপূর্ন কি ছিল যে, তুমি তার পেছনে দৌড়াচ্ছিলে? আর তুমি এর জন্য প্রচেষ্টা চালাতে পারনি? সুবহানাল্লাহ ।

তাই যখন তিনি (আল্লাহ) "হুয়াল্লাহু আহাদ" শব্দটি ব‍্যবহার করেন, তখন এর মনস্তাত্বিক তাৎপর্য, আল্লাহর প্রতি আমাদের দৃষ্টভঙ্গির তাৎপর্য, এবং আমাদের জীবন নিয়ে আমরা কিভাবে চিন্তা করি তা সম্পূর্ণরূপে পরিবর্তিত হয়ে যায়। এখন আমার কাছে আর কিছুই গুরুত্ব পোষন করে না তাঁকে (আল্লাহ) খুশি করা ছাড়া, আমার কাছে আর কিছুই গুরুত্ব পেতে পারে না তাঁর আমার প্রতি সন্তুষ্ট হওয়া থেকে, আমার কাছে আর কিছুই গুরুত্বপূর্ণ নয় তাঁর ক্ষমা পাওয়া থেকে। আমার কাছে আর কিছুই গুরুত্ব পোষন করে না এই বিষয়ের চেয়ে যে তিনি শেষ বিচারের দিন আমার সাথে কথা বলবেন এবং বলবেন যে আমি সাফল‍্যমণ্ডিত। তিনি আমার দিকে তাকাবেন।

আর আমি তাদের মধ‍্যকার কেউ হব না যাদের দিক থেকে তিনি মুখ ফিরিয়ে নেবেন। "শেষ বিচারের দিন আল্লাহ তাদের সাথে কথা বলবেন না (২: ১৭৪)” আল্লাহ আমাদেরকে তাদের অন্তর্ভূক্ত না করুন । এগুলোই হচ্ছে শুধু ‘‘আহাদ’’ কে বোঝার কয়েকটি মনস্তাত্বিক তাৎপর্য। শুধু এই আহাদ শব্দটি। আল্লাহ যা বলছেন তা এরকমই, সুবহানাল্লাহ। আমাদের এটাই করা উচিৎ এবং আমি পরবর্তী কথা দিয়ে শেষ করতে চাই, কারন নামাজের সময় হয়ে গেছে।

আর সেটা হলো আল্লামা ইকবালের একটি কবিতা। আমি ইকবালের কবিতা আবৃতি করতে পারব না, কারন আমার উর্দূ খুবই খারাপ। কিন্তু আমি আপনাদের তাঁর একটি লাইনের অর্থ বলব যদিও আমি িনজে লাইনটি খুবই পছন্দ করি। এটা তাওহীদ সম্পর্কিত একটি কবিতা। এবং তিনি বলেন, "আগে যা (তাওহীদ) মানুষের হৃদয়কে প্রজ্বলিত করত, এখন তা বিমূর্ত দার্শনিক বিতর্কের বিষয়বস্তু" তিনি এটাই বলেন। এখন আমাদের কাছে তাওহীদ কি? বিতর্ক, আলোচনা, ধর্মতত্ত্বের উপর বিমূর্ত আলোচনা, যার কোন অন্ত নেই। কিন্তু এটা আগে যা ছিল তা হচ্ছে এমন কিছু যা হৃদয়সমূহকে প্রজ্বলিত করত। আমি কি এখনও সেই "আহাদ" এর অধিকার পরিপূর্ন করছি? আমি কি এখনও সেই "আহাদ" এর প্রতি ন‍্যায় বিচার করছি? আল্লাহ আমাদের তাওহীদের লোকদের অন্তর্ভুক্ত করুন আল্লাহ আমাদের হৃদয়ে সে আলো প্রজ্বলিত করুক যা জ্বলিত হয়েছিল ইব্রাহিম (আঃ), রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এবং সাহাবা (রাঃ) দের হৃদয়ে।
 
 
 

0 comments
Labels: , , ,

অনেকে বলেন এই পৃথিবীতে এত অবিচার, এত অন্যায় - স্রষ্ট্রা যদি থাকেন, তাহলে এরকম হবে কেন?

"অনেকে বলেন এই পৃথিবীতে এত অবিচার, এত অন্যায় - স্রষ্ট্রা যদি থাকেন, তাহলে এরকম হবে কেন?

আমরা বলি, নাস্তিকদের সাথে আমরা এই ব্যাপারে একমত। ইসলাম পরিষ্কার বলে দিয়েছে যে এই পৃথিবী অবাধ ন্যায়ের ক্ষেত্র নয়। এই পৃথিবীতে বহু লোক খারাপ কাজ করে পার পেয়ে যায়। শুধু এটাই নয়, অনেকে অনেক ভাল কাজ করে এর ন্যায্য প্রতিদান পায় না। বরং উল্টোটাও হয়। বহু ভাল লোকেরা কষ্ট পেয়েই এই জীবন পার করে দেয়। এটা কি ন্যায়?

আমাদের মনে রাখতে হবে, এই পৃথিবী একটা সমীকরণের অংশ। আপনারা স্কুলে সমীকরণের অংক করছেন, যেখানে সমান চিহ্নের ডানে বামে দুটি অংশ থাকে। আপনি যদি সমীকরণের বাম অংশে একটু পরিবর্তন আনেন তবে ভারসাম্য রক্ষার জন্য ডান অংশেও পরিবর্তন করতে হয়।

বিচার দিবস হবে সেই ভারসাম্য রক্ষার দিবস। যারা এই বিচার দিবসকে বিশ্বাস করে না তাদের কাছে শুধুমাত্র এই পৃথিবীই অবশিষ্ঠ থাকে। এই পৃথিবী দিয়েই সে স্রষ্ট্রাকে বিচার করতে শুরু করে। যখন দেখে এত অনাচার, অবিচার এই পৃথিবীতে, তখন সে বিশ্বাস করতে বাধ্য হয় স্রষ্ট্রা নেই।

আমাদের মনে রাখতে হবে আল্লাহ সব ব্যাপারে নিখুঁত ও নির্ভুল। বিচারের বেলাতেও তিনি নিখুঁত।"

--- লেখাটি উস্তাদ নুমান আলী খানের Quran for young adult series (From Bayyinah.tv) থেকে অনুপ্রাণিত।

.....................

হে আল্লাহ, জালিম সম্প্রদায়দেরকে তোমার হাতে ছেড়ে দিলাম বিচারের জন্য। হে আল্লাহ! গাজাবাসীদের বিজয় দাও। হে আল্লাহ, তুমি তাদের সহায় হও।


Source: https://www.facebook.com/NAKBangla
 

0 comments
Labels: , ,

মানসিক যন্ত্রণা থেকে আরোগ্য লাভের উপায়

শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু।

وَأَصْبَحَ فُؤَادُ أُمِّ مُوسَى فَارِغًا إِن كَادَتْ لَتُبْدِي بِهِ لَوْلَا أَن رَّبَطْنَا عَلَى قَلْبِهَا لِتَكُونَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ
বাংলা ভাবার্থঃ “ওদিকে মূসার মায়ের মন অস্থির হয়ে পড়েছিল। সে তার রহস্য প্রকাশ করে দিতো যদি আমি তার মন সুদৃঢ় না করে দিতাম, যাতে সে (আমার অঙ্গীকারের প্রতি) বিশ্বাস স্থাপনকারীদের একজন হয়”। [সুরা কাসাস ২৮:১০]
English Translation: “And the heart of Moses' mother became empty [of all else]. She was about to disclose [the matter concerning] him had We not bound fast her heart that she would be of the believers”. [28:10]


এই আয়াতটি কুরআনের বিশতম পারা থেকে নেয়া।  সুরা কাসাসের এই আয়াতটি আমার প্রিয় আয়াতসমুহের মধ্যে একটি। মুসা (আঃ) এর মায়ের বিষয়ে  এই আয়াতটিতে আলোচনা করা হয়েছে।


জীবনের বিভিন্ন সময় আমরা সবাই বিভিন্ন মাত্রার মানসিক কষ্টের মুখোমুখি হই। প্রচণ্ড মনোকষ্টের ভেতর সময় অতিবাহিত করি। প্রতিটি নিঃশ্বাসের সাথে বুকের ভেতর কাঁটা বিঁধে থাকার মত কষ্ট অনুভুত হয়। প্রিয়জনের মৃত্যুতে, প্রিয়জনের দুরারোগ্য রোগে (যখন শুধু চোখের সামনে তিলে তিলে শেষ হয়ে যেতে দেখি কিন্তু তাকিয়ে দেখা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না), যখন বাবা-মা সন্তানকে বা সন্তান বাবা-মাকে ভয়ঙ্কর সব কথা বলে, যখন স্বামী-স্ত্রী পরস্পরকে জঘন্য কথা বলে বা পরস্পরের সাথে নিষ্ঠুর আচরণ করে, বন্ধু শত্রুর মত ব্যবহার করে, অনেক আদরের ও দীর্ঘদিনের বিশ্বাসী কেউ চরম বিশ্বাসঘাতকতা করে --- তখন জীবনটাকে দুর্বিষহ মনে হয়। এছাড়াও বিভিন্ন ঘটনায় যেমনঃ চাকুরী হারানো, সন্তান হারানো, রাতারাতি সহায়-সম্পত্তি-অর্থ-খ্যাতি হারিয়ে পথে চলে আসা, সম্ভ্রম হারানো ইত্যাদি মানুষের আবেগকে চরমভাবে আঘাত করে। পৃথিবীতে এই মুহূর্তে কত শত মানুষ কি অবর্ণনীয় শারীরিক-মানসিক কষ্ট, নিরাপত্তাহীনতা,  প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুভয় ও আতংকের ভেতর সময় কাটাচ্ছে যা আমাদের কল্পনার বাইরে। ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চারা কি ভয়াবহ পরিবেশে জীবন কাটাচ্ছে, কি নৃশংসভাবে তাদের হত্যা করা হচ্ছে --- যা আমরা আমাদের সন্তানদের জন্য দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করতে পারিনা। এই হচ্ছে বাস্তবতা যা আমরা প্রতিদিন দেখছি, কখনো এর ভেতরে থেকে আবার কখনো দর্শক হিসাবে। এই আয়াতটি এইসকল আঘাতপ্রাপ্তদের জন্য একটি আশার বানী বহন করে। কারণ, মানুষ যখন মানসিকভাবে চরম বিপর্যস্ত হয়ে পরে, তখন সে ভাবে এই অবস্থা থেকে আমার কোন মুক্তি নাই, কোনভাবেই এই কষ্ট কাটিয়ে ওঠা আমার পক্ষে সম্ভব হবে না --- সেই ধরনের পরিস্থিতিকে কাটিয়ে ওঠার জন্য এই আয়াতটি একটি দিক নির্দেশনা দেয়।
 
মুসা (আঃ) এর মাকে আল্লাহ্‌‘তালা এমন একটি অসামান্য কঠিন কাজ দিয়েছিলেন, যা কিনা যেকোন মায়ের পক্ষে এককথায় অকল্পনীয়। তাঁর নবজাতক সন্তানকে ‘বাঁচানোর’ জন্য পানিতে ভাসিয়ে দিতে হবে। তাঁর সামনে শুধু দুটো রাস্তা খোলা ছিল।

এক. চোখের সামনে ফেরাউনের সৈন্যদের হাতে নিজ সন্তানের হত্যা দেখা

দুই. আল্লাহ্‌র নির্দেশে শিশু মুসা (আঃ) কে ঝুড়িতে করে নদীতে ভাসিয়ে দেয়া

 একটা সাধারণ ঝুড়ি, ওয়াটারপ্রুফ বা নেভিগেশনের ক্ষমতাযুক্ত নয়। নিজের নবজাতক সন্তানকে এমন একটি ঝুড়িতে ঢুকিয়ে নদীতে ভাসিয়ে দিতে হবে, সেই ঝুড়ি উলটে বাচ্চা পানিতে ডুবে যেতে পারে, তাকে নদীর হিংস্র প্রাণীরা খেয়ে ফেলতে পারে, ফেরাউনের সৈন্যরা তাকে দেখে তুলে নিয়ে মেরে ফেলতে পারে --- এই নাড়িছেঁড়া সন্তানকে আর কখনো দেখতে পারবে না, আদর করে বুকে জড়িয়ে তাঁর গায়ের গন্ধ নিতে পারবে না। এই সকল চিন্তা সম্ভবত একসাথে তাঁর মাথায় উঁকি দিচ্ছিল। চোখের সামনে ফেরাউনের সৈন্যদের হাতে নিজ সন্তানের হত্যা দেখা তাঁর পক্ষে সম্ভব হবে না ভেবেই তিনি নিরুপায় হয়ে বুকে পাথর চেপে শিশু মুসা (আঃ) কে নীল নদের পানিতে ভাসিয়ে দিলেন। মুসা (আঃ) এর মা যখন আল্লাহ্‌র ইশারায়  এ কাজ করেছিলেন (কারণ আল্লাহ্‌র সাহায্য ছাড়া এই ধরনের কাজ করা অসম্ভব), এই আয়াতটিতে আল্লাহ্‌ সেই মুহূর্তটি বর্ণনা করে বলছেন, “ওয়াআছ্ববাহা ফুআ-দু উম্মি মূসা- ফা-রিগান”, মূসার মায়ের মন থেকে আবেগ ও চিন্তাশক্তি লোপ পেয়েছিল। কোন মানুষ যখন মানসিকভাবে চরম আঘাতপ্রাপ্ত হয়, তখন সে কিছু সময়ের জন্য একেবারে আবেগশুন্য হয়ে যায়। তার চোখের দৃষ্টি শুন্য হয়ে যায়, যদি তার চোখের সামনে দিয়ে হাত নাড়া হয় তবুও তার চোখের পলক পরে না, তার চিন্তাশক্তি এতোটাই লোপ পায় যে তার আশেপাশের কোন কিছুতেই সে আর প্রভাবিত হয় না। নির্বাক হয়ে শুন্যদৃষ্টিতে শুধু তাকিয়ে থাকে। এই অবস্থাটিকে বলা হয়েছে ‘ফা-রিগান’। “ইন কা-দাত লাতুবদী বিহী”, অর্থাৎ 'সে তো তাঁর (মুসার) পরিচয় প্রকাশে প্রায় উদ্যত হয়েছিলো'। আরেকটু হলেই তিনি চিৎকার করে বলেই দিচ্ছিলেন যে, “আমার বাচ্চা!  আমার বাচ্চা!! তাকে বাঁচাও!!!” কিন্তু এটা যদি তিনি করতেন তাহলে ফেরাউনের নিষ্ঠুর সৈন্যরা তাঁর সন্তানকে মেরে ফেলতো।  এখানে আল্লাহ্‌ বলেছেন, “লাওলা আর্ রাবাত্বনা- ‘আলা- ক্বালবিহা”, অর্থাৎ ‘যদি আমি তার মন সুদৃঢ় না করে দিতাম’। মুসা (আঃ) এর মায়ের অন্তরজ্বালা (ফু’আদ) কে আল্লাহ্‌‘তালা অবদমিত করে তাঁর হৃদয়কে শান্ত ও অবিচল করেছিল। এখানে এই অর্থে ‘ক্বালব’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। আল্লাহ্‌ এই আয়াতে বলছেন যে তিনি এই কাজটি করেছেন। “লিতাকূনা মিনাল্ মুমিনীন",  ‘যাতে সে (আমার অঙ্গীকারের প্রতি) বিশ্বাস স্থাপনকারীদের একজন হয়’।


অনেকেই আছেন যারা মানসিকভাবে অসম্ভব আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার পর কোন অবস্থাতেই আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারে না। তারা মানসিকভাবে এতোটাই ভেঙে পরে যে স্বাভাবিকভাবে চিন্তা করার শক্তি চিরতরে লোপ পায়। কেন তারা পারে না? কারণ, আল্লাহ্‌ তাদের মন কে সুদৃঢ় করেন না। চরম মানসিক আঘাতের পর হৃদয়কে শান্ত ও অবিচল করে আবার স্বাভাবিকভাবে চিন্তা করা, স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা -– একমাত্র আল্লাহ্‌র সাহায্য ছাড়া কোন মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। মানুষকে সেই ক্ষমতা দেয়া হয় নি। আমরা যাকে মনের জোর বলি, সেটা শুধুমাত্র আল্লাহ্‌র সাহায্যেই অর্জন করা সম্ভব। হৃদয়ের ক্ষতচিহ্ন আরোগ্য করার ক্ষমতা শুধু আল্লাহ্‌র কাছেই আছে। এবং আল্লাহ্‌ কখন সেটি করেন? যখন বান্দা এক আল্লাহ্‌র উপর ঈমান আনে, আস্থা প্রকাশ করে অবিচল থাকে। শুধুমাত্র আল্লাহ্‌র উপর ঈমান আনার ফলাফলস্বরূপ আল্লাহ্‌র তরফ থেকে যে সাহায্য-শক্তি-সাহস পাওয়া যায় তার সাথে আর কোন কিছুরই তুলনা হয় না।

 কোন মায়ের পক্ষে তার সন্তানকে পানিতে ভাসিয়ে দেয়া সম্ভব নয়। কিন্তু আল্লাহ্‌‘তালা মুসা (আঃ) এর মায়ের হৃদয়কে এতোটাই শান্ত করে দিয়েছিলেন যে তিনি যে শুধু নিজের আবেগের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ লাভ করেছিলেন তাই নয়, বরং তিনি এই পরিস্থিতিতে ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করে মুসা (আঃ) এর বোনকে বাচ্চার পেছনে পেছনে যাবার নির্দেশ পর্যন্ত দিয়েছিলেন।  সন্তানের থেকে বিচ্ছেদের ফলে, তাঁর হৃদয় দুঃখ ভারাক্রান্ত হয়ে পড়েছিলো।  কিন্তু তাঁর ছিলো আল্লাহ্‌র কল্যাণকর পরিকল্পনার উপরে অগাধ বিশ্বাস।আল্লাহর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হওয়ার জন্য সময়ের প্রয়োজন। সেই সময় পর্যন্ত ধৈর্য্য ধারণের প্রয়োজন হয়। ফলে আল্লাহ্‌ মুসা (আঃ) এর মায়ের হৃদয়ে ধৈর্য্য ধারণের ক্ষমতা দ্বারা শক্তিশালী করেছিলেন। আল্লাহ্ পরম করুণাময়।


সবচেয়ে আশার কথা হচ্ছে, মুসা (আঃ) এর মা আমার-আপনার মত সাধারণ মানুষ ছিলেন, কোন নবী-রাসুল ছিলেন না। কিন্তু তিনি ছিলেন একজন দৃঢ় ঈমানের বিশ্বাসী নারী। শুধুমাত্র আল্লাহ্‌র প্রতি একান্ত ও বিশুদ্ধ বিশ্বাসের কারনেই তাঁর পক্ষে এই অকল্পনীয় কাজ করা সম্ভব হয়েছিল। তাই জেনে রাখুন, আপনি যে কোন মাত্রার মানসিক আঘাত, ব্যথা, বা যন্ত্রণায় ভুগছেন না কেন, যদি আল্লাহ্‌র উপর পূর্ণ বিশ্বাস থাকে, তাহলে আল্লাহ্‌ আপনার এই অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য অবশ্যই হস্তক্ষেপ করবেন। ফলশ্রুতিতে আপনার মন ও হৃদয়ে শান্তি আসবে ও পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাবেন। আল্লাহ্‌র সূদূর প্রসারী পরিকল্পনা ও দূরদর্শিতা কি ভাবে কাজ করে তার অনুধাবন করা সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। মুসা (আঃ) এর কাহিনীর মাধ্যমে এই চিরন্তন সত্যের দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। তাই কোন দুর্যোগ বা বিপদে ধৈর্য্যহারা না হয়ে আল্লাহ্‌র প্রতি ভরসা রেখে অগ্রসর হওয়া প্রয়োজন। আজ যা বিপদের কালো মেঘ, আগামীতে তাই-ই হয়তো সফলতার স্বর্ণ উজ্জ্বল দিন হয়ে দেখা যাবে যার খবর শুধু আল্লাহ্‌-ই জ্ঞাত।


আল্লাহ্‌ রাব্বুল আলামিন আমাদের সবাইকে তাঁর উপর সম্পূর্ণ আস্থাশীল হয়ে সব ধরনের বিপদ-আপদে ধৈর্য্য ধারণের ক্ষমতা দিক। কঠিন সময়ে আমাদের মন ও হৃদয়ে শান্তি দান করুন। আল্লাহ্‌র সহায়তায় আমরা যেন বিপদে নিজের উপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রেখে বিশ্বাস স্থাপনকারীদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারি।



[নোমান আলী খানের কুরানিক জেমস (Quranic Gems) সিরিজের বিশতম পর্বের বাংলা ভাবার্থ। দ্রুত অনুবাদ করার কারনে কিছু ভুল-ত্রুটি থাকাটাই স্বাভাবিক। আমার এই অনিচ্ছাকৃত ভুল আশাকরি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। যা কিছু কল্যাণকর তার সম্পূর্ণই আল্লাহ্‌র তরফ থেকে, আর যা কিছু ভুল সেটি সম্পূর্ণ আমার। আল্লাহ্‌ রাব্বুল আলামিন আমার সেই ভুলগুলো মার্জনা করুন। তিনি পরম ক্ষমাশীল, অসীম দয়ালু। আল্লাহ্‌তালা আমাদের সকলকে কুরআনের আয়াতসমূহ বুঝে পড়ার তৌফিক দান করুন এবং  সঠিক মর্মার্থ বুঝে সেই ভাবে জীবনকে পরিচালিত করার মত হিকমাহ, সাহস ও ধৈর্য দিক।]


(To watch the video go to: https://www.youtube.com/watch?v=DzSDr5xiGIE)

0 comments
Labels: , ,

বদরাগ ও সূরা নাস

‘রাগ হলে আমার লজিক্যাল সেন্স হারিয়ে যায়। অদ্ভুত সব কারণ একটার উপর একটা যোগ হতে থাকে। আমি নিজের মধ্যে বুঝতে পারি, আমি রাগ করছি কারণ আমার মধ্যে একটা হেরে যাওয়া অনুভূতি হচ্ছে। আমি নিজের মত করে একটা কিছু ভেবে রেখেছিলাম, কিন্তু বাস্তবে তেমন করে হয়নি। আমি হেরে যাচ্ছি, আমার কথা কেউ পাত্তা দিচ্ছেনা, আমার সুযোগ সুবিধার দিকে কারো খেয়াল নেই… আমার উপর অন্যায় হলে দেখার কেউ নেই..’
উপরের কথাগুলো একটু অদল বদল করে দিলে প্রত্যেকেই নিজের ছায়া খুঁজে পাবেন। রাগ এমন এক জিনিস, তখন কে যে কী থেকে কী হয়ে যায়, কোন ঠিকঠিকানা থাকেনা। রাগ আর মাতাল অবস্থার মধ্যে আমি কোন পার্থক্য দেখি না। যে মাদক নেয়া থামাতে পারে না, তাকে আমরা বলি, ওর নিজের উপর কন্ট্রোল নেই। যে রাগ হলে শান্ত হতে পারেনা, তাকেও আমরা বলি, ওর কন্ট্রোল থাকেনা। আফসোস, মাদকাসক্ত কে আমরা দেখি ঘৃণার চোখে, আর বদরাগ কে দেখি কিঞ্চিৎ প্রশ্রয়ের চোখে।

কেন এভাবে রেগে যাই আমরা? আগের কোন রাগকে ট্র্যাক করতে পারবেন? এখানে রাগ বলতে আমি কিন্তু ‘অযৌক্তিক রাগ’ বুঝাচ্ছি। নিজের উপর অন্যায় হলে যে রাগ হয়, সে রাগের কথা বলছি। যে রাগ কমানোর জন্য মানুষ মেডিটেশনের দ্বারস্থ হয়, ডাক্তারের কাছে মুখ কাঁচুমাচু করে বলে, ‘দেখেন ত ডাক্তার সাহেব, আমার প্রেশারটা কি বেশি দেখে এত রাগ উঠে?’, সেই রাগের কথা বলছি। আমার রাগের ৯০%ই তৈরি হয় ‘এটা অন্যায়’ – এই চিন্তা থেকে। এই যেমন বন্ধুরা সবাই মিলে বেড়াতে যাওয়ার প্ল্যান করছি, এর মাঝে একজন বলা নাই কওয়া নাই শেষ মুহূর্তে পিছু হটল। হয়ে গেলাম রাগ, ‘তার কি এইটা উচিৎ হইসে?’ বাসায় গুরূত্বপূর্ণ কোন সিদ্ধান্ত আমাকে জিজ্ঞাসা ছাড়াই নিয়ে ফেলল। রাগ, ‘আমি কি কেউ না?’ গ্রুপে মিলে কোন কাজ করছি, একজন ফাঁকিবাজি করল। হয়ে গেল মেজাজ খারাপ, ‘ফাইজলামি পাইসে?’ প্রত্যেকবারই হয় ‘আমার’ কমফোর্ট নষ্ট হয়েছে, নয়ত ‘আমার’ ইগো হার্ট হয়েছে, অথবা ‘আমার’ তৈরি করা প্ল্যান অনুযায়ী কাজ হয়নি। প্রত্যেকটাই খুব আত্মকেন্দ্রিক কারণ, কিন্তু আমি যখন রেগে যাচ্ছি, তখন আর স্বার্থপরতার ওই দিকটা আর চোখে পড়ছে না, মনে হচ্ছে, আমি বৃহত্তর স্বার্থে অন্যায়ের প্রতি জিরো টলারেন্স দেখাতে রাগ দেখাচ্ছি। অথচ এই ঘটনাটাই অন্যের বেলায় ঘটলে হয়ত আমি মিষ্টি মিষ্টি হেসে ধৈর্য ধরার উপদেশ দিতাম। এ রকম ডাবল স্ট্যান্ডার্ড, হীন একটা চিন্তাকে মনের ভেতর মহৎ বানিয়ে ফেলছে কে?


সূরা নাস এ আল্লাহ আমাদের শিখিয়েছেন শয়তানের অনিষ্টকর কুমন্ত্রণা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে (মিন শাররিল ওয়াসওয়াসিল খান্নাস।) শয়তান আমাদের কুমন্ত্রণা দেয় – এটা কি আমরা আসলেই বিশ্বাস করতে পারি? মাঝে মধ্যে পারি, কিন্তু বেশির ভাগ সময়ই আমাদের যুক্তিবাদী মন বিশ্বাস করতে চায়না কোন জ্বীন ভূত এসে কুবুদ্ধি দিচ্ছে, আর সেটার ফল আমাদের কাজে এসে পড়ছে। শয়তানকে নিয়ে কারো সাথে রিয়েলিস্টিক আলোচনা করার চেষ্টা করে দেখুন, হাসতে হাসতে আপনাকে উড়ায় ফেলবে, স্কিজোফ্রেনিক রোগীও বানায় ফেলতে পারে। শয়তানকে নিয়ে আমি প্রায়ই চিন্তাভাবনা করি, তারপরেও, এশার নামাজ একটু দেরি করে ফেললে যখন ভী-ষ-ণ আলসেমি লাগে, ঘুমে মনে হয় পড়েই যাব, আর কষ্ট করে নামাজ পড়ে ফেলার সাথে সাথে ঘুমও পালায় – তখনও আমার মনে হয়না এটা শয়তানের কারসাজি। শয়তান এখনও আমার কাছে সামহোয়াট ইমাজিনারি কিছু। আমার বাসা, ল্যাব, ল্যাপটপ – এরা যেমন খুব বাস্তব, শয়তানকে ততটা বাস্তব ধরতে মনের মধ্যে কেমন কেমন যেন লাগে।

রাগের বেলায় শয়তানের ভূমিকা বলার আগে সূরা নাসের পরের লাইনটা আলোচনা করে নেই। আল্লাযি ইয়ুওয়াসয়িসু ফী সুদুরিন নাস, সেই শয়তান, যে মানুষের বুকের মধ্যে বসে কুমন্ত্রণা দেয়। ‘ইয়ুওয়াসয়িসু’ হচ্ছে ঘটমান বর্তমান ক্রিয়াপদ। চলতেই থাকবে, চলতেই থাকবে। কোন থামাথামি নেই। শয়তান বুকের মধ্যে বসে থাকবে, একটা ফুট কাটবে, আপনি তাকে ধমক দিয়ে থামাবেন, সে একটু দমে যাবে, তারপর মুখটা বাড়ায় আবার আরেকটা কিছু বলবে.. আবারও, আবার… ! আপনি যখন কোন কারণে অফেন্ডেড, আপনার মনের মধ্যে এমনিতেই কিছু নেগেটিভ চিন্তা আছে অফেন্ডারের প্রতি। এখন শয়তান করবে কি, ওই ভদ্রলোকের/ভদ্রমহিলার সাথে আপনার বিগত জীবনে যা যা খারাপ অভিজ্ঞতা হয়েছে সব ছবির মত সামনে তুলে ধরতে থাকবে। একটা করে ছবি দেখবেন, মেজাজ খারাপ বাড়তে থাকবে। শুধু এই না, ছবির নিচে ক্যাপশনের মত একটা এক্সপ্লানেশন ও থাকবে, ও এইটা করসিল, দেখ, সে তোমার জন্য কক্ষণো কেয়ার করে নাই। সবসময় তুমিই করে গেছ… ইত্যাদি ইত্যাদি। কারো উপর রাগ হওয়ার পর তার ভালমানুষির কথাগুলি কি আপনার কখনো মনে পড়ে? আমি কারো উপর রাগ হয়ে আমার স্বামীর কাছে ঝাল ঝাড়লে সে তার ভাল দিকগুলি মনে করিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু আমার তখন আরো রাগ হয়, ‘আমি বলতেসি খারাপ আর তুমি ভাল দিক দেখাচ্ছ! আমার ত এখন নিজেকে আরো বেশি খারাপ মনে হচ্ছে!’ কী ভয়ংকর ইগো!


যাই হোক, পার্সোনাল ডিসকমফোর্ট আর শয়তানের ওয়াসওয়াসা – এ দুটোই আমাদের জন্য অনেক, তার উপর আরো আছে পারিপার্শ্বিকতার চাপ। আশেপাশের মানুষের উস্কানিতে ঘটনা আরো খারাপের দিকে গেছে – এ রকম দেখেছেন কখনো? আল্লাহ সূরা নাস এর শেষ লাইনে বলেছেন ‘মিনাল জিন্নাতি ওয়ান নাস’, খারাপ জ্বীন ও মানুষের কুমন্ত্রণা। ওয়াসওয়াসা শুধু বুকের ধারেকাছে ওঁৎ পেতে থাকা বেহায়া শয়তানটাই দেয়না, তার সাঙ্গোপাঙ্গো যারা অন্যদের ভেতর বসে আছে, তারাও একযোগে বুদ্ধি দিতে থাকে, এটা বল, ওটা মনে করিয়ে দাও। ফলাফল… থাক, নাই বা বলি। রাগ করে মানুষ বাসনকোসন ভাঙে, হাত পা ভাঙে। সম্পর্ক ভাঙে, ভাঙে আল্লাহর উপর বিশ্বাসও। তারপর একটা সময় ফলাফল দেখে কান্নায়ও ভেঙে পড়ে।

ফেসবুকে এক ছোট বোন লিখেছিল, মানুষকে চেনার সবচেয়ে ভাল উপায় হল তাকে রাগিয়ে দেয়া। এমনিতে ফেরেশতা, আর রাগিয়ে দিলে মুখের ভাষা শয়তান টাইপ হয়ে যায়। আমি এই বক্তব্যের সাথে একমত না। রাগিয়ে দিলে মুখের ভাষা শয়তান টাইপ হয়, কারণ সে তখন শয়তান আর মানুষের ওয়াসওয়াসা দ্বারা প্রভাবিত হয়। রাসুলুল্লাহ (স) কখনোই মানুষের রাগের অবস্থা বিচার করতেন না। এমন ভাব করতেন, যেন এমন কোন ঘটনা ঘটেই নি। তিনি বুঝতেন, এটা অন্য যে কোন প্রবৃত্তির মতই মানুষের একটা দুর্বলতা। তাই উনি সবচেয়ে শক্তিশালী বলেছেন সেই ভাই বা বোনকে, যে রাগের সময় নিজেকে সংযত রাখতে পারে।


রাগ হলে কী করতে হবে? বলব না। যে সত্যিকারের আন্তরিক সে খুঁজে বের করে নিক। আমি চাই মানুষ বদরাগ কে মাদকাসক্তির মতই এক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করুক। বদরাগের কারণে যাদের সম্পর্কে ফাটল ধরেছে তারা বিষয়টার ভয়াবহতা নিয়ে অন্যদের সাথে কথা বলুক, মানুষ যেন আরো সচেতন হয়। Domestic violence এর অনেকটুকুই আসে বদরাগ থেকে। ঠান্ডা, সুস্থ মাথায় ভায়োলেন্স করে যাচ্ছে, এরকম কেস আপনি কমই পাবেন। রাগ নিয়ে চিন্তা করুন। যে বদরাগী, সেও, যে ভুক্তভোগী, সেও। চট করে রেগে যাওয়া, লম্বা সময় রাগ ধরে রাখা – এগুলো পরিবার, সমাজের বড়সর ক্ষতি করে ফেলছে। এখন শুনি রিকশাওয়ালার সাথে ঝগড়া হলেই কষে চড় লাগিয়ে দেয় স্কুল কলেজের ছেলেমেয়েরা। রাগ কি কেবল স্টুডেন্টদেরই আছে? আল্লাহ না করুক, এইসব অন্যায় আর অসম্মানের খেসারত যদি আপনার কোন ভাই/বোনের জীবন/সম্মানের বিনিময়ে দিতে হয়, তখন কি একচেটিয়া রিকশাওয়ালাদের দোষারোপ করে পার পাওয়া যাবে?

লেখাটা শেষ করি আমার খুব প্রিয় একটা হাদীস বলে। রাসুলুল্লাহ (স) এর সামনে এক সাহাবীর সাথে আরেকজনের ঝগড়া হচ্ছিল। সাহাবী নম্রভাবে জবাব দিচ্ছিলেন আর ওইপক্ষ একনাগাড়ে গালিগালাজ করেই যাচ্ছিল। তাই দেখে রাসুলুল্লাহ (স) মুচকি মুচকি হাসছিলেন। একটা সময় আর টিকতে না পেরে সাহাবীও উঁচু গলায় জবাব দিতে থাকল, তখন রাসুলুল্লাহ (স) সে জায়গা থেকে সরে গেলেন। ব্যাপারটা সেই সাহাবী লক্ষ করলেন, উনি এসে রাসুলুল্লাহ (স) এর কাছে জানতে চাইলেন, উনি অসন্তুষ্ট হওয়ার কারণ কী। রাসুলুল্লাহ (স) তখন উনাকে জানালেন, তুমি যখন চুপ ছিলে তখন এক ফেরেশতা তোমার হয়ে জবাব দিচ্ছিল। আর তুমি যখন গলা উঁচু করলে, তখন ফেরেশতার বদলে শয়তান এসে জায়গা করে নিল, আর তোমার হয়ে জবাব দিতে থাকল। তাই দেখে আমি চলে এলাম।

লিখেছেনঃ নূসরাত রহমান 

0 comments
Labels: ,

রাগকে সংযত করা : নুমান আলী খান

জীবনে আমি নিজের যেই আচরণের কারণে অনেক বেশি করে আফসোস করেছি, তার মধ্যে রাগ জিনিসটা একদম উপরের দিকে অবস্থান করে। জীবনের বিশাল একটা সময় রাগ হলে অসহায় হয়ে যেতাম, আমি চাইনা এমন কাজগুলো ধুম করে করে বসতাম, আর ফলাফলগুলোকে সামলাতে সামলাতে ভালো সময় পার হয়ে যেতো। রাগ করে এমন আচরণ হয়ে যায় যে — প্রিয়জন/বন্ধুদের সাথে সম্পর্কে টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়। অনেকে সহজেই আরো যা করেন তা হলো গ্লাস ভাঙ্গা, খাতা ছিঁড়ে ফেলা, কলম জানালা দিয়ে ফেলে দেয়া, মোবাইল ফোন ছুঁড়ে ফেলা এবং আরো কত কী!

নুমান আলী খানের “controlling anger” নামের আলোচনাটা দেখার পর আমার চিন্তা অনেক বদলে গিয়েছে। রাগ হলে এখন ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখতে পারি, নিজের আয়ত্বে থাকতে পারি অনেকটাই। সবচাইতে বড় কথা, বুকে যন্ত্রণার উপশম হয়ে যায় সহজেই। আলোচনা করতে গিয়ে তিনি পবিত্র কুরআনুল কারীমের সূরা আশ-শুরার ৩৬-৪০ নাম্বার আয়াত উল্লেখ করেছেন।

অতএব, তোমাদেরকে যা দেয়া হয়েছে তা পার্থিব জীবনের ভোগ মাত্র” [১] আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন যে, দুনিয়ার জীবনে আমাদের তিনি যা দিয়েছেন তা কেবল ভোগের উপকরণ। এখানে আল্লাহ “মাতা’আ” শব্দটি উল্লেখ করেছেন, আরবিতে যার অর্থ বোঝায় এমন একটা উপকরণ যা আমার আছে, কিন্তু সেইটা উপভোগ করতে পারায় আমি বিশেষ আনন্দ পাইনা। যেমন একটা ব্রাশ। ব্রাশ হাতে নিয়ে আমি এমন অনুভব করিনা যে আমার ব্রাশটা দারুণ। কারণ এর উপযোগিতা অল্প সময়ের জন্যই।
আর আল্লাহর কাছে যা রয়েছে, তা উৎকৃষ্ট ও স্থায়ী” [২] — আল্লাহ উল্লেখ করেছেন যে, আল্লাহর কাছে যা আছে, তা উৎকৃষ্ট ও স্থায়ী। অর্থাৎ আমাদের এই ক্ষণস্থায়ী উপকরণসমূহ, যা পৃথিবীতে তিনি দিয়েছেন, তার চাইতে আল্লাহর কাছে যা আছে/ তিনি যা রেখেছেন আমাদের জন্য তা অনেক উন্নতমানের এবং তা স্থায়ী। এখানে তিনি উল্লেখ করেছেন “আবকা” শব্দটি, যা কোনকিছুর তুলনামূলক দীর্ঘস্থায়িত্ব বুঝায়। আমাদের পৃথিবীর আনন্দের জিনিসগুলো কিছুই বেশিদিন থাকে না। যেমন সুন্দর একটা মার্সিডিজ বেঞ্জ হোক, গুলশানের একটা ডুপ্লেক্স বাড়ি হোক, আমার নতুন আইফোন হোক — সবই একসময় ক্ষয় হয়, চাকচিক্য-উজ্জ্বলতা নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু আল্লাহর কাছে যা আছে, সেগুলো শেষ হয়ে যাবে না, বরং সেগুলো স্থায়ী।
কিন্তু সেই জিনিসগুলো কারা পাবে? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা জানিয়ে দিয়েছেনঃ “তাদের জন্যে যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও তাদের পালনকর্তার উপর ভরসা করে। যারা বড় গোনাহ ও অশ্লীল কার্য থেকে বেঁচে থাকে এবং ক্রোধাম্বিত হয়েও ক্ষমা করে” [৩] যারা আসলেই বিশ্বাস করে এবং আল্লাহর উপর ভরসা করে যে পৃথিবীর এইসব চাকচিক্যময় ভোগের উপকরণের চাইতে আল্লাহর কাছে যা আছে তা অনেক স্থায়ী আর উন্নতমানের। আর সেই দৃঢ় বিশ্বাসের ফলে যারা জীবনে যারা পথ চলতে পারে। আল্লাহ এই প্রসঙ্গে কিছু গুণাবলীর কথা উল্লেখ করেছেন যা বিশ্বাসীদের থাকতে হবে।
– বড় গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা
– অশ্লীল কাজ থেকে বেঁচে থাকা
– ক্রোধান্বিত হয়েও ক্ষমা করা
আমরা যদি আল্লাহর কাছে থাকা দীর্ঘস্থায়ী আর উন্নত আনন্দের উপকরণগুলো চাই, তাহলে আমাদের বড় গুনাহ থেকে বেঁচে থাকতে হবে। এমন নয় যে, বড় গুনাহ করতে করতে ছোট গুনাহ নিয়ে আলোচনা করবো। বরং এখানে প্রায়োরিটি হিসেব করতে হবে, বড় গুনাহগুলো থেকে দূরে চলে যেতে হবে। অশ্লীল কাজ থেকে দূরে চলে আসতে হবে। আমার হয়ত এখন আজেবাজে কিছু দেখতে ইচ্ছে করতে পারে, কিন্তু সেই ইচ্ছাটাকে দমন করতে হবে। যদি অনুমুতি নেই এমন কারো সাথে কথা বলতে/যোগাযোগ করতে ইচ্ছে করে, সে ইচ্ছেটাকে দমন করতে হবে। হয়ত আমাদের কোথাও যেতে ইচ্ছে করছে, যেখানে গেলে অশ্লীল সময়ে, বিষয়ে সময় কাটবে — সেটাকে দমন করতে হবে। আর এই দমন করতে গিয়ে যেই যুদ্ধ নিজের সাথে সেটাই আমাদের পার্থিব যোগ্যতাকেও বাড়িয়ে দেবে, ফলে আমাদের আত্মার শক্তি বৃদ্ধি পাবে।
এরপর আল্লাহ বলেছেন, রেগে গেলেও যারা ক্ষমা করে। এখানে আল্লাহ কিন্তু বলেননি, রেগে গেলে চুপ থাকে বা রেগে গেলে শান্ত থাকে। বরং তিনি বলেছেন রেগে গেলেও ক্ষমা করে দেয়ার কথা। সুবহানাল্লাহ! একজন মুমিন বান্দার কাছে আল্লাহ ক্ষমাশীলতা আশা করেন। অবশ্য ক্ষতিগ্রস্ত হলে, কারো দ্বারা আক্রান্ত হলে প্রতিশোধ গ্রহণ করার অনুমুতি আল্লাহ দিয়েছেন, কিন্তু সেটার উদ্দেশ্য হলো সমাজে ন্যায়বিচার স্থাপন করা। কিন্তু যারা প্রতিশোধ না নিয়ে বরং আল্লাহর জন্য ক্ষমা করে দিবে, তাদের জন্য আল্লাহ পরের আয়াতে একটা সুসংবাদ দিয়েছেন।
পরবর্তী আয়াতে আল্লাহ স্মরণ করিয়ে দিয়েছেনঃ “যে ক্ষমা করে ও আপোষ করে তার পুরস্কার আল্লাহর কাছে রয়েছে; নিশ্চয় তিনি অত্যাচারীদেরকে পছন্দ করেন নাই।” [৪] অর্থাৎ, ক্ষতিগ্রস্ত হলে প্রতিশোধ না নিয়ে বরং যে ক্ষমা করে করে, তার পুরষ্কার আল্লাহর কাছে রয়েছে। কেমন এই পুরষ্কার? সেকথা পূর্ববর্তী আয়াতেই আল্লাহ জানিয়েছিলেন — যা হলো উৎকৃষ্ট এবং স্থায়ী। আর এই পুরষ্কার আল্লাহ বরাদ্দ রেখেছেন তাদের জন্যই যারা আল্লাহর উপর প্রকৃতই ভরসা করে, তার প্রতি বিশ্বাস রাখে এবং ব্যক্তিগত ক্ষতিতে রেগে না গিয়ে ক্ষমা করে দেয়। সেই পুরষ্কার তো শ্রেষ্ঠ পুরষ্কার!!
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদেরকে তার নির্দেশিত পথে জীবন পরিচালনা করার যোগ্যতা এবং তাওফিক দান করুন। আমাদেরকে সেই দলের অন্তর্ভুক্ত করে নিন, যাদের তিনি ভালোবাসেন, পছন্দ করেন। আল্লাহ আমাদের রেগে গেলেও ক্ষমা করার যোগ্যতা দান করুন যেন এই কাজের মাধ্যমে তার সন্তুষ্টি আমরা অর্জন করতে পারি, তার পুরষ্কার লাভ করতে পারি। আমিন।
নির্ঘন্টঃ
[১] [২] আল কুরআন — সূরা আশ-শুরাঃ ৩৬
[৩] আল কুরআন — সূরা আশ-শুরাঃ ৩৭
[৪] আল কুরআন — সূরা আশ-শুরাঃ ৪০
নুমান আলী খানের ১০ মিনিটের লেকচার, ইউটিউব ভিডিও

0 comments
Labels: , ,

উপাসনা না দাসত্ব ? : নুমান আলী খান

আমি আপনাদেরকে আরবি শব্দ ইবাদাহ বা এর মাছদার উবুদিয়া এর অর্থ বোঝাতে চাই। শব্দটি দ্বারা দুটি জিনিস বোঝায়, যদি আমি এর যেকোনো একটি অর্থ ব্যবহার করে অনুবাদ করি তাহলে অনুবাদটি হবে অসম্পূর্ণ। এটা ক্লাসিকাল আরবির বিপরীতে ইংরেজি বা বাংলার সীমাবদ্বতা। ক্লাসিকাল আরবির একটি শব্দ দিয়ে একই সময়ে অনেকগুলো অর্থ প্রকাশ করা হত। যদি আমরা এই ধারনাটি (ইবাদা শব্দটি ) আংশিক বাংলা অর্থ দিয়ে অনুবাদ করি , তাহলে বিভ্রান্তিতে পড়ে যাই। যে দুটি পদ আরবি শব্দ ইবাদার পরিপূর্ণ অর্থ প্রকাশ করে তাহলো - উপাসনা এবং দাসত্ব। অধিকাংশ সময় আমরা যেকোনো একটি অর্থ গ্রহণ করি। বাংলায় দুটি আলাদা বিষয়, কিন্তু আরবি একটি শব্দ ইবাদা দ্বারাই উভয়টি বেঝায়। সুতরাং যখন রাসুল (স) বলেন -' লা আ'বুদু মা তা'বুদুন ' - এর অর্থ শুধু এটা নয় যে, আমি উপাসনা করব না বরং এর অর্থ এটাও যে, আমি গোলাম হব না , আমি দাস হব না।

সংক্ষিপ্তভাবে আমি আপনাদেরকে উপাসনা এবং দাসত্বের পার্থক্য স্মরণ করিয়ে দেয়ার চেষ্টা করব। যখন মাগরিবের নামাজের সময় হয়, আমরা আল্লাহর উপাসনা করি। আবার যখন এশার নামাজের সময় হবে, আমরা উপাসনা করব। কিন্তু এই দুই নামাজের মধ্যবর্তী সময়ে আমরা কি ? আল্লাহর দাস। যখন আপনি ঘুমাচ্ছেন আপনি উপাসনা করছেন না, কিন্তু তখনও আপনি আল্লাহর একজন দাস। যখন আপনি ঘুম থেকে জাগ্রত হলেন , গাড়ি চালিয়ে কাজে যাচ্ছেন , দাত ব্রাশ করছেন , নাস্তা খাচ্ছেন , গাড়ি পার্ক করছেন - যদিও এই সময় আপনি কুরআন তিলাওয়াত করছেন না বা কোনো উপাসনার কাজ করছেন না - কিন্তু এই সময়েও আপনি আল্লাহর একজন দাস।

অন্য কথায় উপাসনা হলো - কিছু সুনিদৃষ্ট কাজের নাম। রোজা রাখা, নামাজ পড়া , হজ্জ পালন করা , কুরআন তিলাওয়াত করা , দান করা এইসব কাজ হলো উপাসনা। কিন্তু একজন দাস সবসময়-ই একজন দাস। সে এই কাজগুলো পালন করুক আর নাই করুক। এই ধারনাটি খুবই শক্তিশালী। এর মানে হলো - আমাদেরকে জীবন যাপন করতে হবে সেভাবে- যেভাবে আল্লাহ জীবন যাপন করতে বলেছেন। শুধু মাত্র জুমার নামাজ পড়া বা খুতবা শোনার সময়-ই নয়।

আমরা দুই নামাজের মধ্যবর্তী সময়েও আল্লাহর বান্দাহ। আল্লাহ বলেন :

حَافِظُوا عَلَى الصَّلَوَاتِ وَالصَّلَاةِ الْوُسْطَىٰ وَقُومُوا لِلَّهِ قَانِتِينَ
(2:238)

''সমস্ত নামাযের প্রতি যত্নবান হও, বিশেষ করে মধ্যবর্তী নামাযের ব্যাপারে। আর আল্লাহর সামনে একান্ত আদবের সাথে দাঁড়াও।

কোনো কোনো তাফসীর কারকের মতে الصَّلَاةِ الْوُسْطَىٰ মানে হলো ---দুই নামাজের মধ্যবর্তী সময় আল্লাহর সাথে সম্পর্ক যুক্ত থাকা।

আপনারা জানেন , অধিকাংশ সময় লোকজনের কি হয় ? লোকজন আল্লাহর উপাসনা করে কিন্তু তার দাসের মত আচরণ করে না। কারো কারো মদের দোকান আছে , আবার প্রত্যহ পাচবার নামাজ পড়তে আসে। সে আল্লাহর উপাসনা করে কিন্তু সুস্পষ্টরূপে সে কার মত আচরণ করে না ? আল্লাহর দাস। সে আল্লাহর নির্দেশ পালন করছে না। যেহেতু আমাদের কাছে ইবাদতের এই আংশিক অনুবাদ আছে এতে কি ঘটে আপনারা জানেন , আমরা নিজেদেরকে এই বলে স্বান্তনা দেই যে , অন্তত:পক্ষে আমিতো আল্লাহর উপাসনা করছি। সুতরাং কাজ শেষ। না, আপনি আল্লাহর উপাসনা করেন কিন্তু এখনো আপনি আল্লাহর বান্দাহ নন। উপাসনা হলো একটি অংশ আর দাসত্ব হলো অন্য অংশ। উপাসনা এবং দাসত্ব উভয়ই ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত।

এখন আরবদের দুটো সমস্যা ছিল। (এক.) তারা আল্লাহর উপাসনা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। কিন্তু আপনারা জানেন তাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা কি ছিল ? (দুই.) তারা আল্লাহর দাস হতে অস্বীকার করেছিল। এই সুরায় দুটো সমস্যার কথা বলা হয়েছে।


আমাদেরকে তা সুস্পষ্ট করে তুলে ধরতে হবে। যখন তারা শুধুমাত্র আল্লাহকে সিজদা করতে এবং সকল প্রকার প্রতিমা- মূর্তি পূজা ত্যাগ করতে অস্বীকার করলো, তখন এটা কোন প্রকারের সমস্যা ছিল ? উপাসনাগত না দাসত্তসম্পর্কিত ? এটা একটা উপাসনা কেন্দ্রিক সমস্যা। কিন্তু যখন তারা এতিমকে দান করতে অস্বীকার করলো , যখন তারা কন্যা সন্তানকে হত্যা করা থেকে বিরত থাকতে প্রত্যাখ্যান করলো, যখন তারা অভাবীদের অন্ন দিতে অস্বীকার করলো, যখন তারা ন্যায় বিচার করতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করলো , যখন তারা বিনা বিচারে খুন করা থেকে বিরত থাকতে অসম্মত হলো, যখন তারা দাসদেরকে নির্যাতন করতে থাকলো, যখন তারা এইসব কিছু করতে থাকলো তখন তারা মূলত কি করতে অস্বীকার করলো ? তারা আল্লাহর গোলামের মত আচরণ করতে অস্বীকার করলো।

আল্লাহর দাস হওয়া - উপাসনা এবং দাসত্ব - দুটোই অন্তর্ভুক্ত করে। এখন আয়াতটি বুঝতে চেষ্টা করুন। لَا أَعْبُدُ مَا تَعْبُدُونَ আমি গোলাম হব না এবং আমি পূজা করব না -তার -তোমরা যার উপাসনা এবং গোলামী করছ। এই আয়াতে রাসুল (স) কে তাদের সম্পর্কে কথা বলতে বলা হয়েছে , মুশরিকরা যার পূজা করে এবং যার গোলামী করে। এখন তারা কার উপাসনা করত এবং কার গোলামী করত ? তারা একদিকে ছিল মূর্তি পূজারী, মিথ্যা খোদার পূজারী। আর অন্যদিকে তারা ছিল তাদের প্রবৃত্তির দাস। দুটো বিষয় -১. তারা মূর্তি পূজা করত এবং ২. তারা নিজেরা নিজেদের গোলাম ছিল। তারা নিজেদের নফস এর দাস ছিল। আর রাসুল (স) বলেন - আমি তোমাদের মূর্তির পূজা করতে অস্বীকার করছি। এবং আমি একই সাথে আমার নিজের প্রবৃত্তির দাসত্ব করতেও অস্বীকার করছি। আমি উভয়টাই প্রত্যাখ্যান করছি।

মুশরিকরা বলছে - তিনি প্রায় এক দশক যাবত আমাদের ধর্ম অস্বীকার করছেন। চল তার সাথে একটা সমঝোতায় আসি, ভবিষ্যত এতে ভালো হবে আশা করি। সবসময় মুসলিম-অমুসলিম দ্বন্দে মক্কা হয়ে গিয়েছিল তখন অশান্তিময়। চল একটা সমঝোতায় আসি, এতে জীবন-যাপন শান্তিময় হয়ে উঠবে। আমরা একবছরের জন্য আপনার ধর্ম গ্রহণ করতে প্রস্তুত। তারপর পরবর্তী বছর আপনি আমাদের ধর্ম গ্রহণ করবেন। তারপর আমরা আবার আপনার ধর্ম গ্রহণ করব এবং পরের বছর আপনি আবার আমাদের। অন্য কথায়, আমরা সবাই এক সময়ের জন্য ইসলাম পালন করব, আবার অন্য সময়ের জন্য শিরক পালন করব। যদি আমরা সমঝোতা করি , তাহলে মক্কায় আর কোনো অশান্তি থাকবে না। আমাদের ভবিষ্যত হবে উন্নত।

লা আ'বুদু --অধিকাংশ ব্যাকরণবিদ এর মতে -- যেটা মুদারে --মুদারে বর্তমানের চেয়েও ভবিষ্যতের উপর গুরুত্বারোপ করে বেশি। অন্য কথায় , রাসুল (স) বলেন , তোমরা এত বেশি আশা করো না। আমি এটা করতে যাচ্ছি না , এটা কখনোই ঘটবে না। তোমরা যদি মনে কর এতে ভবিষ্যত ভালো হবে তবুও-- তোমরা যার গোলাম এবং উপাসক, আমি কখনই তার গোলাম এবং উপাসক হব না।


Lecture link : https://www.youtube.com/watch?v=ee03TxZIlDM

0 comments
Labels: , , ,

কেমন আছ তুমি :: নুমান আলী খান

কেমন আছ তুমি :: নুমান আলী খান 

কেমন আছ” — আমি বোধহয় জীবনে এই প্রশ্নটা সবচেয়ে বেশি শুনেছি। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব, চাকুরিক্ষেত্রের সহকর্মীরা — সবাইই প্রতিদিন অজস্রবার এই প্রশ্ন করে। প্রতিটি মানুষেরই কুশল বিনিময়ের প্রথম প্রশ্ন “কেমন আছেন”? ইদানিং পরিচিতজনরা বেশিরভাগই একটা উত্তর দেয় — “এইতো”… কী অদ্ভূত !! এইতো মানে আবার কী? ভালো নাকি খারাপ?

খারাপ বলতেও ‘এইতো বলা’ লোকদের বাঁধে — কেননা তারা সবাইই আসলে অনেক ভালো আছেন। জীবনে প্রাপ্তি তাদের প্রচুর। “খারাপ আছি” — বললেই তাকে জিজ্ঞেস করা হবে — কী হয়েছে? যার উত্তর দিতে পারবেন না। আবার “ভালো আছি” সেটা স্বীকার করলে সম্ভবত নিজের উচ্চাকাংখা প্রকাশ করা হবেনা, তাই সবাইই বলেন — “এইতো”.. ভালো আছি বললে তার আরো অনেক কিছু পেতে হবে, সেইটা আবার প্রশ্নদাতা হয়ত খেয়াল করবেন না, তাকে আরো বেশি মূল্যায়ণ করবেন না, তাই হয়ত বলে — “এইতো”। “ভালো আছি” বলার মানুষ কেন যে এত কম সেটা ভেবেই পাইনা!

ছোটবেলায় আব্বুকে দেখতাম এই প্রশ্নের উত্তরে সবসময়ে “আলহামদুলিল্লাহ” বলতে। অনেকটা ট্রেডিশান হিসেবেই এটা আয়ত্ব করেছিলাম। তারপর একসময় ভুলেও গিয়েছিলাম কৈশোরে। আবার প্রতিদিনের এই নিত্য প্রশ্নের উত্তরটিকে আত্মস্থ করতে চেষ্টা করছিলাম যখন ভার্সিটির হলে থাকতাম। তখন প্রচন্ড বাজে পরীক্ষা হতো হঠাৎ হঠাৎ। পরীক্ষা দিয়ে বেরিয়ে দুনিয়ার সব বন্ধু মহলের মতন আমাদেরও কমন প্রশ্ন ছিলো — “কেমন হলো”? আমার রুমমেট ছিলো অসাধারণ চমৎকার একটা ছেলে মাশাআল্লাহ। কেবলমাত্র ওকেই সবাই “কেমন হলো পরীক্ষা” বলে উত্তর পেতো “আলহামদুলিল্লাহ”; একবার তো এক বন্ধু বলেই বসেছিলো — “ওদের দুইজনকে প্রশ্ন করে লাভ নেই, ভালো খারাপ যা-ই হোক, উত্তর হবে একটাই” ; সেদিন যদিও মজা পেয়েছিলাম, কিন্তু আমি জানতাম — অভ্যাস করে ফেলেও আমি একদম হৃদয়ের ভিতর থেকে ফিল করতে পারতাম না সবসময়ে সেই “আলহামদুলিল্লাহ” কথাটা। খচখচ করতো মনটা একটা প্রশ্নের উত্তরের অভাবে।

আলহামদুলিল্লাহ কথাটার অর্থ সেদিন নুমান আলী খানের সূরা ফাতিহার উপরের আলোচনাতে শুনছিলাম।

আরবিতে একটা শব্দ আছে — ‘মাদহু’, যার অর্থ প্রশংসা।
আরেকটা শব্দ আছে — ‘শুকরু’ — যার অর্থ কৃতজ্ঞতা।
আমাদের এই জীবনে এমন অনেককিছু আছে, যেগুলোর আমরা প্রশংসা করি, এমন অনেক মানবীয় গুণাবলী আছে — যা দেখে আমরা মোহিত হয়ে প্রশংসা করি। যেমন ফুলের সৌন্দর্য্য, খেলোয়াড়ের দারুণ নৈপুণ্য। এইসব মুগ্ধতা আর মোহনীয়তা আমাদের প্রশংসা কুড়ায়, কিন্তু আমরা সেগুলোর প্রতি কৃতজ্ঞ হইনা।
আমার এমনঅনেক মানুষ আছে, যারা আমাদের উপকার করার পর আমরা তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ হই, কিন্তু কৃতজ্ঞ হলেই তার প্রশংসা করিনা, বরং তাদের প্রতি শুধুই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি।

কিন্তু এই ‘হামদ’ শব্দটিতে কৃতজ্ঞতা আর প্রশংসা দুটোই একসাথে প্রকাশিত হয়। হামদ শব্দটি ব্যবহার করে জুমুআর দিন খতীবরা বলেন — “নাহমাদুহু ওয়া নাসতা’ইনুহু…” এই শব্দ দিয়ে তিনি বলেন যে আমি প্রশংসা করছি… কিন্তু যখন শব্দটির সাথে যখন “আল” যুক্ত হয়ে “আলহামদু” হয়, তখন সেটা যে অর্থ বুঝায় তা হলো সমস্ত প্রশংসা আর কৃতজ্ঞতার প্রকাশ। আর তাই “আলহামদুলিল্লাহ” শব্দটি দাঁড়ায় সমস্ত প্রশংসা আর কৃতজ্ঞতা কেবলমাত্র আল্লাহর, আর কারো না; এইটা আমার বলা বা না বলার উপর নির্ভর করছেনা বরং সমস্ত প্রশংসা আর কৃতজ্ঞতা পাওয়ার পরম যোগ্যতা কেবলই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার।

কী অদ্ভুত সুন্দর এই কৃতজ্ঞতা ! আমার জীবনের প্রতিটি অনুক্ষণের জন্যই আমি আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ। তাঁর অনুপম ভালোবাসায় আমি সিক্ত, আমার প্রতিটি নিঃশ্বাস আল্লাহ আমার প্রতি কতটা দয়াময় তারই প্রতিচ্ছবি। এই “আলহামদুলিল্লাহ” বলতে কেন আমাদের সংকোচ হবে? হ্যাঁ, নিঃসন্দেহে আমাদের জীবনে আল্লাহ পরীক্ষা নিয়ে থাকেন, কঠিন সময় আসে। সে তো পরীক্ষা বলেই। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তো আমাদেরকে বলেই দিয়েছেন যে তিনি ক্ষুধা, ভয়, দারিদ্র্য দিয়ে আমাদের পরীক্ষা নিবেন, আর ধৈর্য্যধারণকারীরা সেই পরীক্ষার ফলাফলের সুসংবাদ পাবে। ক’দিন আগে একটা লেখায় পড়েছিলাম যেই চিন্তাটা আমার পছন্দ হয়েছিলো — ধৈর্য্য বা সবর অর্থ এমন নয় যে কতখানি সময় আমি কষ্টের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করলাম, বরং কষ্ট করার সময়টা আমি কেমন করে পার করেছিলাম — সেটাই সবর। আমি আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্টচিত্তে, আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনে অতিক্রম করলাম, নাকি বিরক্ত হয়ে আর “কেন সব বিপদ আমার উপরেই আসে” টাইপের মূর্খ আচরণে দিনাতিপাত করলাম।

সূরা ফাতিহাতে শিখেছি “আর রাহমানুর রাহিম”.. পরম দয়াময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহ আমাকে নিঃসন্দেহে আমার মা-বাবার চাইতেও আমাকে বেশি ভালোবাসেন। তিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন এক অপার ভালোবাসায়। তিনি আমার জন্য বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাতে এই বসবাসের জায়গাটা ঠিক করে রেখেছিলেন অনেক আগেই। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমার প্রতিদিনের রিযিক ঠিক করে রেখেছেন, আমার প্রতি আমার বাবা-মা,ভাই-বোনের যেই ভালোবাসা — সেটাও তারই ঠিক করে রাখা রাহমাতের নিদর্শন হিসেবে পাই প্রতিদিন। এই কীবোর্ডের উপর প্রতিটি আঙ্গুলের স্পর্শ দেয়ার সক্ষমতা, সেও তো আল্লাহর দেয়া অপার রাহমাতেরই নিদর্শন। ঠিক এই মূহুর্তে পৃথিবীতে লক্ষ লক্ষ মানুষ আইসিইউতে শুয়ে আছেন, তাদের চাইতে আমি কতনা ভালো আছি! এখন অনেক যুদ্ধপীড়িত দেশে দারিদ্র্য আর ভয়ে কাটাচ্ছে আমাদেরই ভাইবোনেরা। তাদের তুলনায় আমরা কতই না ভালো আছি। যারা পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, তারাও তার ভালোবাসাই পেয়ে যাচ্ছি ক্রমশঃ। আর তো মাত্র ক’টা দিন — তারপরে ইনশাআল্লাহ আমরা সবাই আবার তাঁর কাছেই চলে যাবো। তিনিই তো আমাদের অন্তরতম, প্রেমময় আপনজন।

আমাদের আল্লাহ আমাকে যেমন করে আপন ভালোবাসায় এই জীবন দান করেছেন, তিনিই আমাদের অন্য প্রতিটি ভাইবোনের জীবনেরই অধিকর্তা। এই পৃথিবী-আকাশ-নক্ষত্র — এসব তো কেবলই আমাদের জানা জগত। আল্লাহ আমাদের জানা এবং অজানা সমস্ত জগতেরই ক্ষমতাবান। আমাদের অজানা যে জগত – সেও আল্লাহরই এক সৃষ্টি। আল্লাহ হলেন শ্রেষ্ঠতম বিচারক — যার পৃথিবীর জীবনে একটু বেশি কষ্ট হচ্ছে অন্য সবার তুলনায় — সেই অজানা জগতটায় তার জীবনটা যে দয়াময় আল্লাহ অনেক সহজ করে দেবেন না — সেটা কেউ বলতে পারে না। আল্লাহ হলেন সর্বশ্রেষ্ঠ ন্যায়বিচারক যিনি প্রতিটি অণু পরিমাণ কাজের উপর নির্ভর করেই আমাদের ফলাফল দেবেনঃ জান্নাত আর জাহান্নাম।

কিন্তু আমাদের এই একটাই জীবন, সেখানে আমার কৃতজ্ঞ বান্দা হবার জন্য প্রয়োজন এই “আলহামদুলিল্লাহ” নিঃসঙ্কোচে, নির্দ্বিধায় বলে ফেলা। এই কথাটাকে বলে ফেলার অভ্যাস করে ফেলা। যেন প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দেয়ার সময় উৎফুল্ল হয়ে আমরা বলতে পারি — “আলহামদুলিল্লাহ”.. আমি যে দেখতে পারছি, কানে শুনতে পাচ্ছি, আমার সুস্থ স্বাভাবিক শরীর আছে, আমার আত্মীয়স্বজন আমার চারপাশে, আমার সামাজিকভাবে সম্মান বজায় আছে — এমন অজস্র রাহমাত আমাদের জীবনে আছে যার যেকোন একটি না থাকতে পারতো, আর না থাকলে আমাদের কিছুই করার থাকতো না।

আমার আল্লাহকে স্মরণ করার একটা আত্মা আছে সবকিছুর জন্যই আমি কৃতজ্ঞ আমার আল্লাহর প্রতি। এই আত্মাটা হিদায়াতের খানিক স্পর্শ পেয়েছে বলেই আল্লাহর দেয়া রাহমাতের কথা ভেবে তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের কথা চিন্তা করতে পারছি। কিন্তু আল্লাহ যেন এই অপার রাহমাতগুলো আমাকে আরো বাড়িয়ে দেন, তিনি যেন আমার উপরে আরো সন্তুষ্ট থাকেন সে আশায় তো আরো চাইতে হবে, আরো কৃতজ্ঞ হতে হবে! কৃতজ্ঞ বান্দাদেরকে আল্লাহ আরো বেশি বেশি করে দান করেন। রাত জেগে তাহাজ্জুদ আদায় করে পা ফুলিয়ে ফেলার কারণে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে একজন সাহাবা প্রশ্ন করলে তিনি বলেছিলেন আমি কি আল্লাহর কৃতজ্ঞ বান্দা হবো না? আমাদের প্রিয় নেতা, সুন্দরতম চরিত্রের শ্রেষ্ঠ এই মানুষটিও চাইতেন তাঁর রব আল্লাহর প্রতি আরো আরো কৃতজ্ঞ হতে। তার অনুসারী হিসেবে আমাদের শিক্ষাও তো সেই অনুপম শিক্ষা — মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কৃতজ্ঞ বান্দা হতে চাওয়া।

আল্লাহ যেন আমাদের সবাইকে আরো আরো কৃতজ্ঞ বান্দা হবার তাওফিক দান করেন। আল্লাহ যেন আমাদের কথার, লেখার ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে কবুল করে নেন। আল্লাহ যেন আমাদেরকে এমন বান্দাদের দলে অন্তর্ভুক্ত হবার করে নেন যারা পৃথিবী থেকে বিদায়ের কালে তাঁর উপর সন্তুষ্ট থাকবে এবং তিনিও আমাদের উপরে সন্তুষ্ট থাকবেন।





— লিখেছেনঃ স্বপ্নচারী আব্দুল্লাহ




রেফারেন্স

– [অডিও- MP3] সূরা ফাতিহার উপরে আলোচনা :: উস্তাদ নুমান আলী খান
– [ভিডিও - ইউটিউব] সূরা ফাতিহা — Points To Ponder [প্রথম অংশ] :: নুমান আলী খান

http://alorpothe.wordpress.com/2012/04/07/alhamdulilah/

0 comments
Labels: ,

সুরা আবু লাহাব- কঠোর শাস্তির আড়ালে লুকানো বেদনা গুলো

অনেক বছর আগের কথা । সূর্যের খরতাপে ক্লান্ত মরু প্রান্তর ঘেরা মক্কা নগরী । লোকালয়ের বাগানের খেজুর গরমে লাল হয়ে উঠছে । বাতাসে পাকা খেজুরের মিষ্টি গন্ধ ।
আব্দুল উযযার সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে তার দুই ছেলে উতবা আর উতাইবা

“বউ দের তালাক দিবে কিনা বল ? “
মক্কার অন্যতম ধনী প্রভাবশালী আবদুল উযযার ফর্সা মুখ রাগে গনগনে আগুনের মত হয়ে গেছে রাগে । অল্পতেই তার চেহারা এমন হয়ে যায় । লোকে তার নাম দিয়েছে আগুন বরণ মুখ বা আবু লাহাব ।আবু লাহাব বললো , এই তোমরা মাথা নিচু করে থেকো না , কথার জবাব দাও ।

আবু লাহাবের অত্যন্ত রূপবতী স্ত্রী উম্মে জামিল ও উপস্থিত আছে এই পারিবারিক সভায় । সে অভিজাত বংশীয় নারী । হারব বিন উমাইয়ার কন্যা । আবু সুফিয়ানের বোন । তার একটা ভাল নাম ছিল “ আরদা “ কিন্তু বিখ্যাত সৌন্দর্যের কারণে তাকে উম্মে জামিল বলে সবাই । মক্কার কুরাইশ বংশীয় নারীদের মধ্যে আছে তার বিশাল আধিপত্য । তার গলার অত্যন্ত মূল্যবান সোনার হারের উজ্জ্বলতা তার আভিজাত্য ঘোষণা করছে । আবু লাহাবের যোগ্য স্ত্রী সে । উম্মে জামিল ছেলের বউদের এ সংসারে আর এলাউ করতে পারছেন না ।

তাঁর ছেলেদের বউ এর নাম রুকাইয়া ও কুলসুম । তারা মোহাম্মাদ ( সাঃ ) এর আদরের দুই কন্যা ।

কাউকে চূড়ান্ত আঘাত করতে চাইলে তার আদরের সন্তানদের আঘাত করতে হয় । এটা অতি সাধারণ হিসেব । সদ্য তালাকপ্রাপ্তা দুই কন্যার কান্না মোহাম্মদের ( সাঃ ) বুকে কতটা শেল হয়ে বিঁধবে এটা ভাবতেও উম্মে জামিলের মনটা নিষ্ঠুর আনন্দে ভরে যাচ্ছে ।

কিন্তু উতবা কেন রাজি হতে পারছেনা । দীর্ঘদিনের দাম্পত্যজীবনের সুখ দুঃখের ছবি তার মনে এসে আছড়ে পড়েছে । আমৃত্যু যে বাঁধন অটুট রাখবে বলে সে কথা দিয়েছে তার উপর এ কি কঠিন মরু ঝড়ের আঘাত ? তার চোখ ছল ছল করে উঠছে , চোখের জল না হয় দেখানো যায় , অন্তর ভেংগে খান খান হয়ে যাচ্ছে সেটা কিভাবে দেখাবে বাবা মাকে ।


(২) সেই সময়টা

সময়টা ছিল তখন দলাদলি, হানাহানি ও রক্তারক্তির
পৌত্তলিকতার নিকষ কালো অন্ধকারে ম্লান । চারিদিকে অজ্ঞতা , অশ্লীলতা , স্বেচ্ছাচারিতা , কুসংস্কার । এক গোত্রের সাথে আরেক গোত্রের মারামারি , কাটাকাটি । মানুষেরা ছিল হয় মনিব না হয় দাস ।
আল্লাহকে ভুলে গিয়ে প্রায় সকলেই মূর্তিপূজা করতো । পবিত্র কাবা শরীফে ছিল ৩৬০ টি মূর্তি । এমন কি হযরত ইব্রাহীম আর ইসমাইল ( আঃ ) ছবিও টাঙ্গানো ছিল । সেই ছবি তে ভাগ্য নির্ণয়ের জন্য তীর ছোঁড়া হত । মানুষ দেবতাকে খুশি করার জন্য কুরবানি দিত , মানত করতো । ভাবা যায় কি পুরুষ ও মহিলারা উলঙ্গ অবস্থায় কাবা শরীফ তওয়াফ করতো ।

অভিজাত শ্রেণীর পুরুষ আর মহিলাদের মর্যাদা ছিল সমাজে । কিন্তু বাকি সব মহিলার অবস্থা ছিল ভয়াবহ । নারী পুরুষের সম্পর্ক তলোয়ারের ধার আর বল্লমের ফলা দিয়ে প্রতিষ্ঠা লাভ করতো । অসংখ্য স্ত্রী ছিল সকলের । একসাথে দুবোনকে বিয়ে করা যেত । বাবা তালাক দিয়ে দিলে সৎ মা কে বিয়ে করতে পারতো ।অবাধ যৌনসংসর্গ ছিল প্রতিষ্ঠিত ।

তখন স্বাধীন নারীর তুলনায় দাসী দের অবস্থা ছিল ভয়াবহ । কন্যা শিশু দের দেয়া হত জীবন্ত কবর । সমাজের লোকলজ্জা , নিন্দা , তাদের জন্য টাকা খরচ হয়ে যাবার ভয়ে তাদের কে হত্যা করতে দ্বিধা বোধ করতোনা। অসত্য ও অন্যায়ের কাছে সত্য ও ন্যায় ছিল পর্যুদস্ত ।
এখানে এতিম দের কোন ঠাঁই নাই
আখিরাতের কোন ভয় নাই
শিরক আর কুফরিতে ঢেকে গেছে সব ।

এসময় বিশ্ব জগতের রহমত নবুওয়াতের আলোক ধারায় স্নাত হলো হেরা গুহা । নবুওয়ত লাভ করেন মহানবী (সাঃ ) । রহমত স্বরূপ কোরআন নাজিল হয় । মানুষ কে ফিরিয়ে নিতে একেশ্বরবাদের দিকে ।

আল্লাহর নির্দেশে নবীজী ( সাঃ ) ইসলাম প্রচার শুরু করেন ।দীর্ঘ ২৩ বছরে অল্প অল্প করে নাযিল হয় আল কুরআন । আস্তে আস্তে অল্প অল্প করে এসব অমানবিকতা সমাজ তুলে দেয়ার জন্য নির্দেশ আসতে থাকে । বহু বাঁধার সম্মুখীন হতে হয়েছে । কিন্তু কিছু কিছু আঘাত আছে যা শরীর থেকে মনেই আঘাত করে বেশি । তেমনি এক সম্পর্ক আবু লাহাবের সাথে নবীজী (সাঃ ) এর ।

(৩) চাচা ভাতিজার সম্পর্ক -



ইসলাম ধর্ম প্রচার করতে গিয়েই মোহাম্মদ (সাঃ ) এর সাথে আবু লাহাবের সম্পর্কের অবনতি ঘটে । আইয়ামে জাহেলিয়াত বলা হয় যে সময়ের বর্ণনা দিতে গেলে তখন নিজেদের গোত্র কে রক্ষা করার একটাই উপায় ছিল সেটা হল, নিজের গোত্রের প্রতি একনিষ্ঠ ভাবে সমর্থন দিয়ে যাওয়া ।সহোদর ভাই , চাচাতো ভাই , গোষ্ঠী ও গোত্রের লোকজন অত্যন্ত শক্ত মজবুত ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল । আত্মীয়তার বন্ধন ছিল বেশ দৃঢ় । তা না হলে কারো বেঁচে থাকার আর কোন উপায় নাই । গোত্রের মান মর্যাদা ও নিরাপত্তা রক্ষায় জীবন উৎসর্গ করতে কোন দ্বিধা বোধ ছিলনা । সাম্প্রদায়িকতা আর আত্মীয়তা ছিল গোত্রের নিয়ম শৃঙ্খলার উৎস । নিয়ম ছিল ,
“ নিজ ভাইকে সাহায্য কর সে অত্যাচারিত হোক বা অত্যাচারী হোক । “

নবীজীর চাচা হলেন আবু লাহাব । আবু লাহাবের সাথে নবীজীর সুসম্পর্ক ছিল বরাবরই । । পিতৃহীন এই এতিম কে আবু লাহাব অত্যন্ত স্নেহ করতো । মোহাম্মদের (সাঃ ) জন্মের সময় খুশিতে সে ক্রীতদাসীকে আজাদ করে দিয়ে ছিল । সে ক্রীত দাসীর নাম সুয়াইবা ।কারণ সুয়াইবা র বুকের দুধ মহানবী (সাঃ ) প্রথম পান করেছিলেন । আবু লাহাবের এ কৃতদাসী মহানবী( সাঃ ) প্রথম দুধ মা হবার সম্মানে কৃতজ্ঞ চিত্তে খুশি মনে আবু লাহাব তাঁকে মুক্তি দেন । আত্মীয়তার সম্পর্ক আরো মজবুত করতে রোকাইয়া আর কুলসুম কে আবু লাহাবের দুই পুত্র উতবা আর উতাইবার বউ করে নিয়ে এসেছিল ।কিন্তু ইসলাম প্রচার কে আবু লাহাব কিছুতেই মেনে নিতে পারেনি । প্রথমে হালকা প্রতিবাদ এর পর একরোখা জিদ দিয়ে ইসলামের আর নবীজীর শত্রুতে পরিনত হয়েছে ।

যখন নবুওয়তের গুরু দায়িত্ব নিয়ে ধীর যাত্রা শুরু হয়েছিল মহানবীর ( সাঃ ) , নিজের আত্মীয় দের কাছে ইসলামের আলো বিতরণের নির্দেশ ছিল মহান আল্লাহ তায়ালার কাছ থেকে । প্রকাশ্যে দাওয়াতের প্রথম সম্মেলন মহানবী (সাঃ ) ডাকলেন তাঁর বাড়িতেই । নবীজী একদিন তার চাচা , চাচাতো ভাই এরকম ৪০ -৪৫ জন আত্মীয়কে দাওয়াত করলেন ।খাওয়াদাওয়ার পর ইসলাম সম্পর্কে সবাই জানাবেন এমন ইচ্ছা ছিল ।তাঁর গোপন ধর্ম প্রচারের কথা আবু লাহাব ঠিক ই জানতো । তাই সে এ মজলিসের উদ্দেশ্য আগেই ধরতে পেরেছিল । সে নবীজীকে কোন কথা তুলতেই দিল না ।

সে বলল , দেখো মুহাম্মাদ , তোমার মধ্যে কোন অস্থিরতা থাকলে তা বাদ দাও ।তোমার জন্য আমাদের বংশ আরবের সবার শত্রু হয়ে যাচ্ছে । আর আমাদের এমন কোন শক্তি নেই যে আমরা এসবের মোকাবেলা করতে পারবো । তোমার মত এভাবে বংশের ক্ষতি আর কেউ করেনি । তোমার চাচা রা , চাচাতো ভাই এরা এখানে উপস্থিত আছে । সব আত্মীয় স্বজনের উচিত তোমাকে শিকল দিয়ে আটকে রাখা । “

সেদিন আর কথা তোলা গেলনা ।নবীজী (সাঃ ) নীরব রইলেন । এই অপমানে নবীজী বেদনাহত হলেও আশা হত হলেন না । আবার বনু হাসিম গোত্রের সবাই কে ডাকলেন । নবীজী এই গোত্রেরই সন্তান । চাচা আবু তালিব , আবু লাহাব এরা আবার এলেন ।

আজ আবু লাহাবকে কোন সুযোগ না দিয়েই নবীজী ইসলামের দাওয়াত পেশ করলেন ।আমি আল্লাহর আদেশে কল্যাণের পথে আপনাদের আহ্বান করছি । এই কঠোর পরীক্ষায় কে কে আমার সাথী হবেন ?মজলিসে কারো মুখে কোন কথা নেই । সত্যের বানী যেন বজ্র কণ্ঠে সবার অন্তরে আছাড়ে গিয়ে পড়লো । বাচাল আবু লাহাব ও পারলো না সে মৌনতা ভেঙ্গে দিতে ।

নীরবতা ভেঙ্গে নবীজীর চাচা আবু তালিবের ছেলে , নবীজীর চাচাতো ভাই আলী বললেন , আমি সাথী হব । আমি সত্য কে গ্রহণ করে নিলাম ।ঘটনার আকস্মিকতায় আবারো সবাই স্তব্ধ । কিন্তু নিজ গোত্রের বিরোধিতা আবু লাহাব ই করল ।

সে ভাই আবু তালিব কে দু কথা শুনিয়ে দিয়ে বলল , আপনার ভাতিজা মোহাম্মদের কারণে আপানার বাচ্চা ছেলেটা উচ্ছন্নে গেলো । এখন তার কথা শুনেই আপনাকে চলতে হবে ।

(৪ ) সাফা পাহাড়ের পাদদেশে আবু লাহাবের প্রতিক্রিয়া -

নবীজীর আলোর কাফিলায় যোগ দিলেন খাদিজা , আলী , যায়েদ , উম্মে আয়মান , আবু বকর সিদ্দিক , উসমান , জোবায়ের , তালহা , আবু ওবাইদা , আব্দুল্লাহ ইবনে মাসুদ ( রাঃ ) প্রমুখ । কিন্তু প্রকাশের জন্য যে আলোর আগমন তার আত্মগোপন আর কত ? বাঁধার পাহাড় ডিঙ্গানো যে পথের ধর্ম তা কি আত্ম প্রকাশ না করে পারে ?
দীর্ঘ ৩ বছর গোপনে নিজের আত্মীয় দের কাছে ইসলাম প্রচারের পর আল্লাহর নির্দেশ এলো আরবের অন্যদের মাঝেও ইসলামের আলো ছড়িয়ে দেয়ার জন্য ।

আরবের একটা নিয়ম ছিল । কোন বিপদের আশংকা করলে বা গুরুত্বপূর্ণ কোন খবর দিতে হলে পাহাড়ের উপর উঠে বিশেষ কতগুলো শব্দ উচ্চারণ করতে হবে । নবীজী (সাঃ ) মক্কাবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য এই পথ অনুসরণ করলেন । সকালে সাফা পাহাড় থেকে ডাক দিলেন “ হে সকাল বেলার বিপদ “ হে সকাল বেলার বিপদ “

এই বিশেষ শব্দ গুলো ভোরের নীরবতা ভেঙ্গে ছড়িয়ে পড়লো মক্কার ঘরে ঘরে । মানুষ সমবেত হল সাফা পাহাড়ে ।
নবীজীর (সঃ ) প্রত্যেক গোত্রের নাম ধরে বলতে লাগলেন , হে কোরাইশ বংশীয়রা , আজ যদি আমি তোমাদের বলি পাহাড়ের অপর পাশে প্রবল এক শত্রু বাহিনী তোমাদের সব লুটে নেওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে , তাহলে কি তোমরা আমার কথা বিশ্বাস করবে?

বিনয় , নম্র আচরন , সত্যবাদীতা , সহনশীলতা , আমানতদারীর জন্য যার নাম তারা নিজেরাই আল আমিন দিয়েছে ,শুধু বন্ধু নয় , শত্রুরাও যাকে পরম শ্রদ্ধা করতো, তাঁর কথা তারা অবশ্যই বিশ্বাস করবে ।এ কথা শুনে নবী বললেন , তাহলে শুন , তোমাদের জন্য অবশ্যই কঠিন বিপদ আসছে পাপ আর খোদা দ্রোহিতার জন্য । আমি উপদেশ নিয়ে এসেছি আল্লাহর পক্ষ থেকে , তোমাদের মঙ্গল হবেনা যখন না তোমরা ‘ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ না বল । ““ আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই “


যুগ যুগান্তরের নীরবতা ভেঙ্গে ইথারের কণায় কণায় কাঁপন জাগিয়ে ছড়িয়ে পড়লো চারিদিকে । নবীজীর ভরাট কণ্ঠের এ আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হল পাহাড় থেকে পাহাড়ে । পৃথিবী ব্যাপী জাহেলিয়াতের জমাট অন্ধকারের এ আলোর বিস্ফোরণে সাফা পাহাড়ের পাদদেশে দাঁড়িয়ে মক্কা বাসী ছিল নীরব নিস্পন্দ ।

নীরবতা ভেঙ্গে প্রতিক্রিয়ার কণ্ঠ জাগ্রত হল । কেউ কিছু বলার আগেই নবী করিমের আপন চাচা আবু লাহাব বলে উঠলো , “ তোমার সর্বনাশ হোক ! এ কথা বলার জন্যই কি তুমি ডেকেছ ?

তার আপন ভাতিজা , অতি আদরের সন্তান সম মোহাম্মদ কে আঘাত করার জন্য নিষ্ঠুর আবু লাহাব একটা পাথর ও তুলে নিয়েছিলো । অথচ তার আগে কোনদিন ও অবিশ্বাস করেনি ।বরং সেও আল আমীন “ বা বিশ্বাসী বলে ডাকতো । নাজিল হয় সুরা আবু লাহাবের আয়াত , আবু লাহাবের হাত দুটি ধ্বংস হোক ১১১:১

(৫ ) সুরা আবু লাহাব আর উম্মে জামিল -
কিন্তু এই দিন দিন নয় আরো দিন আছে । সামনে পড়ে আছে আরো অত্যাচারের ক্লান্ত ক্লিষ্ট হয়ে যাবার দিন । মহানবীকে তাই সেন্সিটাইজ করার দরকার মনে করেছেন আল্লাহ । এই আবু লাহাব পরিবার আরো অত্যাচার করবে , যাতে প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে যাবে । আর আল্লাহ ও জানেন এত কাছের আত্মীয় হওয়াতে তাদের অত্যাচারে নবীজী শরীরে আঘাতের চেয়ে মনেই বেশি আঘাত পাবেন । নাজিল হয় সুরা আবু লাহাব । যেটা ছিল ভবিষ্যৎ বানী ।

আবু লাহাবের স্ত্রী উম্মে জমিল কিন্তু ছিল একজন কবি । হযরত আবু বকরের মেয়ে অসমা ( রা: ) বর্ণনা করেন , এ সুরা নাজিল হবার খবর উম্মে জামিলের কানে আসা মাত্র ই রেগে আগুন হয়ে যায় । (এইটা কিন্তু স্বাভাবিক :P )
"আজ দেখে নিব মোহাম্মদ ( সাঃ ) আর তার দ্বীনকে" , এটা বলে সে গালাগালি সম্বলিত কবিতা আওড়াতে আওড়াতে কাবার দিকে ছুটে যায় । আর হাতে তুলে নেয় কয়েকটি পাথর ।

কাবা শরীফে তখন নবীজী আবু বকরের সাথে বসে ছিলেন । আবু বকরের প্রথম নজরে পড়ে যে উম্মে জামিল আসছে রেগে মেগে । আবু বকর নবীজীকে বললেন , হে আল্লাহর রাসুল । দেখুন উম্মে জামিল আসছে । না জানি আজ সে আপনার সাথে কি অভদ্র আচরণ করে ।নবীজী বললেন , সে আমাকে দেখতে পাবে না ।

তা-ই হল , রাগে অন্ধ উম্মে জামিল নবীজীকে দেখতে পেলনা । নবীজীকে দেখার ক্ষেত্রে আল্লাহ তার দৃষ্টিশক্তিকে সীমিত করে দেন । আবু বকরকে সামনে পেয়ে বলল , শুনলাম তোমার সাথী আমার নিন্দা করেছে ?আবু বকর ভেবে দেখলেন , নবীজী (সাঃ ) তো আসলে নিন্দা করেন নি । নিন্দা যদি করতেই হয় সে আল্লাহ করেছেন । নবীজীর (সাঃ ) দোষ কোথায় ?আবু বকর তাই জবাব দিলেন , এ ঘর এর কসম , তিনি তো তোমার কোন নিন্দা করেন নি ।এ কথা শুনে উম্মে জামিল বলল , তার সাথে দেখা হলে আজ তার খবর ছিল । এই পাথর গুলো ছঁড়ে মারতাম । জানতো আমি যে একজন কবি ।

তারপর সে কবিতা আওড়াতে আওড়াতে ফিরে গিয়েছিলো ।
আমরা তার নির্দেশ অমান্য করেছি
তার দ্বীনকে ঘৃণা আর অবজ্ঞা করে ছুঁড়ে ফেলেছি ।



(৬ ) সংশয়বাদী আবু লাহাব - ইসলামের শত্রু বলেই আবু লাহাবের সতর্ক দৃষ্টি পড়ে থাকে ভাতিজার দিকে ।
নবীজী প্রচার করেন শান্তির ধর্ম । প্রচার করেন মানবতা । তার মনও চায় অনেক তপ্ততার পরে শান্তির ছোঁয়া । এতিমদের নিয়ে ইসলাম বলে ,আখিরাতের পুরষ্কার ও শাস্তিকে মিথ্যা বলেছে যে । সে-ই এতিম কে ধাক্কা দেয় এবং মিসকিনকে খাবার দেয়না , ( সুরা মাউন )

ধনীদের ধনে আছে গরীবের অধিকার । এটাকা শুধু গুনে গুনে রেখে দেয়ার জন্য নয় । গরীবদের ধিক্কার আর নিন্দা করা যাবেনা ।ধ্বংস এমন প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য যে লোকদের ধিক্কার দেয় ও নিন্দা করতে অভ্যস্ত । যে অর্থ জমায় ও গুনে গুনে রাখে । সে মনে করে তার অর্থ সম্পদ চিরকাল থাকবে । ( সূরা হুমাযাহ )

ইসলাম ধর্মের অনুসারীরা আর মেয়ে শিশুদের জ্যান্ত মাটিতে পুঁতে ফেলবে না । কারণ আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশ এসেছে যখন সূর্য প্রভা হারাবে , তারা গুলো এদিক সেদিক বিক্ষিপ্ত হয়ে যাবে ।পর্বত গুলো সরে যাবে , দশমাসের গর্ভবতী উট উপেক্ষিত হবে , বন্য পশুরাও একত্রিত হবে , সমুদ্র জ্বলতে থাকবে আর যখন প্রাণ কে শরীরের সাথে জুড়ে দেয়া হবে তখন জীবন্ত সমাধিস্থ কন্যাকে জিজ্ঞেস করা হবে , কি অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিলো ? ( সুরা তাকবীর )


আবু লাহাব ও হয়তো বুঝতে পারে সমাজে এগুলি দূর হয়ে গেলে মন্দ হয় না । কিন্তু আভিজাত্যের অহংকার তার বুকে বাজে । মোহাম্মাদ তার চাচার সম্মানের দিকে খেয়াল রাখতে পারতো । সে এমন ধর্ম প্রচার করতে পারতো যেখানে কুরাইশদের মধ্যে আবু লাহাবের মান মর্যাদা , প্রভাব প্রতিপত্তি আরো বাড়ে । আবু লাহাব নবী করিম ( সাঃ ) কে একদিন জিজ্ঞাসা করলো , আমি যদি তোমার প্রচারিত দ্বীন কবুল করি তাহলে আমি কি পাব ? উত্তরে নবীজী (সাঃ ) বলেছিলেন , সব ইমানদার লোক যা পাবে , আপনিও তাই পাবেন ।সে বললো , বাড়তি কোন সম্মান , বাড়তি কোন মর্যাদা আমার জন্য থাকবেনা ?নবীজী বললেন , আপনি আর কি চান ?

আবু লাহাব চরম ক্ষেপে গিয়ে গিয়েছিলো। সে বুঝে নিয়েছিলো দুনিয়াদারীর টাকা পয়সা মান ইজ্জতের সাথে ইসলাম যায়না । সে রকম হলে এটা আবু লাহাবের স্বার্থ পরিপন্থী হয়ে যায় । ইসলামে মোমিন হলেই সেটা ধনী আর দরিদ্র দিয়ে মান মর্যাদা নির্ধারিত হয়না । এক কাতারে দাঁড়িয়ে তারা প্রার্থনা করে ।, আবু লাহাবের মত ধনী মক্কায় আর মাত্র চার জন । আর ইসলাম মিশিয়ে দিবে তাকে এতিম , মিসকিনদের সাথে । “ তোমার দ্বীনের সর্বনাশ হোক , যাতে আমি অন্য লোকের সমান হয়ে যাব । (ইবনে জরীর )


মাঝে মাঝে সে সংশয়ে পড়ে বলতো , মোহাম্মদের ধর্ম সত্য হতে পারে । তাহলে তো আমার অন্যায়ের জন্য আমাকে শাস্তি দিবেন আল্লাহ । আমি আমার এত ধন সম্পদ থেকে কিছুটা আল্লাহ কে দিয়ে মাফ চেয়ে নিবো না হয় ।

আহারে বোকা আবু লাহাব : আবু লাহাব মানুষিক ভাবে বিকারগ্রস্তের মত ইসলামের ক্ষতি করেছে । যদি ফয়সালা তার অনুকূলে হতো তাহলে সে কি করতো ? এ ধরনের লোক নিয়ে সুরা নূরের ৫০-৫১ আয়াতে আছে , " আর যদি ফয়সালা তাদের অনুকূলে হত তাহলে তারা বিনীত ভাবে ছুটে আসে । তাদের মনে কি কোন ব্যাধি আছে ? নাকি তারা সংশয়বাদী ? তারা কি এ ভয় করে আল্লাহ ও তার রসুল তাদের উপরে জুলুম করবে ? তার নিজেরাইতো জালিম ।

(৭) পুরষ্কারের লোভ অথবা মধ্যপন্থা


বাপ দাদাদের মূর্তিপূজার বিরুদ্ধে ইসলাম ধর্ম কথা তুলেছে বলে মক্কার লোকেরা নবীজীর উপর অত্যন্ত বিরক্ত হল । তারা এটাকে নিজেদের ধর্মের অবমাননানা বলে ধরে নিল । তারা বলতে লাগল মুহাম্মদ ( সাঃ ) যতদিন যুবক ছিল ততদিন সবার প্রিয় পাত্র ছিল । সবচেয়ে সত্যবাদী আর বিশ্বাসী ছিল । আর যখন তার মাথার চুল সাদা হতে শুরু করেছে সে পাগলের মত কথা বলছে । “ তারা আরো বলে এ কেমন রাসুল যে খাবার খায় , হাটে বাজারে চলাফেরা করে , তার কাছে ফেরেশতা আসেনা কেন , তার জন্য একটা বাগান আসেনা কেন ,যা থেকে সে আহার করতে পারে । যালিমরা বলে তোমরাতো যাদুগ্রস্থ লোকের অনুসরন করছো । ( সুরা আলফুরকান ২৫/৭ ) 

কুরাইশদের দূত গেলো নবীজীর কাছে , আবার নবীজীকে নিয়ে একসাথে তারা মিটিং ও করলো “ দেখো বাবা তুমি তো আমাদের পর নও , কিন্তু তুমি আমাদের বাপ দাদাদের মূর্তি পূজার ধর্ম বাদ দিয়ে এসব কি প্রচার করছো ? বল তুমি কি চাও ? যা চাও তাই দেব । সোনা দানা , টাকা পয়সা সব । নাকি নেতা হতে চাও? যাও নেতা হিসেবেও মেনে নেব । তবুও ইসলাম প্রচার বন্ধ কর ।" এ বিষয়ে আরেকটি পোস্ট
http://ummosque.blogspot.com.au/2012/07/blog-post_9.html

নবীজী বললেন দুদিনের দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী মোহে তিনি চির সত্য ইসলাম প্রচার থেকে বিরত হবেন না । কিছু লোক সমযোতার প্রস্তাব নিয়ে এসেছিল । এমন কিছু কি করা যায় না যাতে দেবদেবীর পূজা বন্ধ না হয় । মোহাম্মদের ধর্মের কিছু কিছু অংশ বাদ দিয়ে মধ্যপন্থা অবলম্বন করলে ও তো হয় ।
কুরআনের আয়াত নাযিল হয় ,বলে দাও , হে কাফেররা ! আমি তোমাদের ইবাদত করিনা যাদের ইবাদত তোমরা কর । আর না তোমরা তার ইবাদত করো যার ইবাদত আমি করি । ( সুরা আল কাফিরুন )

কুরাইশরাও বললো , “ আমরাও তোমাকে দেখে নেবো । “ ভাতিজার এই এক রোখা আচরণে খুব বিরক্ত হল আবু লাহাব । আমাদের কথা যেহেতু শুনবেই না আজ থেকে তোমার সাথে সব সম্পর্ক শেষ ।

(৮ ) নবীজীর পুত্রশোকে আবু লহাবের উল্লাস -

নবীজীর পুত্র কাশিম এর মৃত্যুর পর তাঁর ২য় পুত্র আব্দুল্লাহও মারা যান । নবীজীর শোক মুগ্ধ করে আবু লাহাব কে । মনে সে বিপুল আনন্দ ও প্রশান্তি লাভ করে । এই উৎসব মুখর খবর টি সে কুরাইশ সর্দারদের মাঝে , নাও আজ তো মোহাম্মদের (সাঃ) নাম নিশানাও মুছে গেলো দুনিয়া থেকে ।
আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দা মহানবীর পাশে তখনো ছিলেন সান্ত্বনার বানী নিয়ে ।


আল্লাহ বলেন , “ ( হে নবী !) আমি তোমাকে কাউসার দান করেছি । কাজেই তুমি নিজের রবের জন্য নামাজ পড় ও কুরবানি করো । তোমার দুশমন ই শিকড় কাটা নির্বংশ । “ সুরা আল কাউসার ।

মানুষ মোহাম্মাদ ( সাঃ ) কে অনেক রকম দুঃখই সহ্য করতে হয় । এর মধ্যে সন্তান হারানো কি কষ্টের তা অনেকেই অনুধাবন করতে পারবেন । আর একজনের দুঃখ নিয়ে যে উল্লাস করতে পারে তাকে মানুষের পর্যায়ে ফেলা যায় না ।

(৯) সন্তানদের কষ্ট দিয়েই কষ্ট দিতে হবে মোহাম্মদকে -

কোন ভাবেই মোহাম্মদ ( সাঃ ) কে ফেরাতে ব্যর্থ হয়ে তারা আরেক বুদ্ধি বের করলো । আবু লাহাব , উম্মে জামিলের নজর পড়লো রুকাইয়া আর কুলসুম ( রাঃ ) দিকে ।নিরপরাধ দুই মেয়ের ম্লান মুখই পারবে তাদের বাবাকে এই ধর্ম প্রচার থেকে বিরত রাখতে । আল্লাহর প্রতি ভালবাসা ধুয়ে মুছে দূরে সরে যাবে । উতবা , উতাইবা কে নিয়ে মিটিং বসালো আবু লাহাব আর তার স্ত্রী উম্মে জামিল ।

“বউ দের তালাক দিবে কিনা বল ? “
মনের মধ্যে বয়ে যাওয়া কষ্টের মরু ঝড়কে চেপে রেখে উতবা সাহস করে বললো , " বাবা , আমাদের কি দরকার মোহাম্মদ ( সাঃ ) এর শত্রুদের সাথে হাত মিলানোর ? উনি আপনার ভাতিজা । এই আওয়ামে জাহেলিয়াতের যুগে নিকট আত্মীয় লোকদের সাথে ভাল আচরণ করা আরবের ঐতিহ্য । বনী হাসিম , বনী মুত্তালিবের লোকদের অনেকেই তো ইসলাম গ্রহণ করেনি অনেকে , তবুও তারা তো মোহাম্মদ (সাঃ ) সমর্থন দিচ্ছে , তার তো বাকী কুরাইশদের সাথে হাত মিলায় নি ।

আবু লাহাব হুংকার দিয়ে বললো , “নীচু লোকেরা মেয়েদের যেমন জ্যান্ত কবর দিয়ে দেয় , আমি কেন তোমাদের কে তাই করলাম না । কুলাঙ্গার ছেলে । তোমাদের বাপের মান ইজ্জত তোমাদের কাছে কিছুই না তাহলে ?
আমি অত কথা শুনতে চাইনা ,তোমাদের সাথে আমার মেলামেশা হারাম হয়ে যাবে যদি তোমরা মোহম্মদ (সা: ) এর মেয়ে দুটোকে তালাক না দাও । তালাক দিবে কিনা বল , হ্যাঁ নাকি না ?উতাইবা বললো , " হ্যাঁ , বাবা আপনাকে ছোট করা আমি সহ্য করবোনা । মেয়েকে দিয়ে আসার সময় থুথু ছিটিয়ে দিয়ে আসবো আমি ।উতবা আর কোন কথা বললনা, সে চুপ করে রইলো ।রোকাইয়া আর কুলসুম দুজনেরই তালাক হয়ে গেলো ।

আর উতাইবা ঠিক বর্বরতার সীমা লঙ্ঘন করে গেলো । নবীজির সামনে এসে থু থু ছিটিয়ে দিল । যদিও নবীজীর গায়ে লাগেনি । কতটা আঘাত প্রাপ্ত হয়েছিলেন তিনি নিজের এত ঘনিষ্ঠ আত্মীয় দের এ আঘাত পেয়ে ?

তিনি তো একজন মানুষ । ফেরেশতা তো আর নন । তাঁর মনেও দুঃখ বেদনা লাগে । যতটা আঘাত তারা দিতে চেয়েছে ঠিক ততটাই বুকে এসে লাগলো ।তিলে তিলে সুখ দিয়ে সাজিয়ে তোলা সংসার ভেংগে যাওয়ায় কন্যাদের চোখ অশ্রুসজল । নিজের আদরের কন্যাদের উপর এ নিষ্ঠুর আঘাত , পিতা হয়ে এটা সহ্য করা অনেক বেদনা দায়ক । একই সাথে দুই মেয়ের কান্না , নবীজীর মন বিদীর্ন করে দেয় । তার উপর উতাইবার এ বেয়াদবী , নবিজীর সহ্যের সীমা ভেদ করে চলে যায় ।অত্যন্ত বেদনা হত হয়ে নবীজীর বদ দোয়া বেরিয়ে এলো । “ হে আল্লাহ ! তোমার কুকুরদের থেকে একটি কুকুরকে এর ব্যবস্থা নিতে পাঠাও ।“

(১০) উম্মে জামিলের সাধ্যাতীত শত্রুতা -


উম্মে জামিল ছিল একজন প্রতিহিংসা পরায়ণা নারী । নবীজীকে (সাঃ ) সে নানা ভাবে কষ্ট দিত । অকথ্য ভাষায় গালিগালজ করতো । কটুক্তি করতো , মিথ্যা অপবাদ দিত ।মোহাম্মদের প্রতি বিন্দু মাত্র মমতা যেন আবু লাহাবের মনে কাজ না করে সে জন্য যতটা কুটনামী করা লাগে করেছে । ক্রমাগত কুটনামী করে করে রোকাইয়া , কুলসুম আর মোহাম্মদের প্রতি মন বিষিয়ে দিতে তার ভূমিকা অগ্রগন্য । রোকাইয়া ও কুলসুম (রাঃ ) এর ঘর ভেংগে দিয়েছে । প্রিয় দুই কন্যার অপমান পিতার মনকে ভেংগে দেয়ার জন্য যথেষ্ট ।

শুধু কি তাই ? সামান্য দেয়ালের ওপাশেই মোহাম্মদ পরিবারের রান্না ঘর । রান্না প্রায় হয়ে এলে উম্মে জামিল রান্নায় বালি ছুঁড়ে দেন নির্বিকার ভাবে । সে আর অন্যান্য প্রতিবেশী মিলে মোহাম্মদ ( সাঃ )নামাজে দাঁড়ালে ময়লা নাড়িভুঁড়ি , গোবর , মলমূত্র ছুঁড়ে মারতো । নবীজীর নামাজ পড়ার ধরন তাদের কাছে বেশ হাস্যকর লাগতো । তার উতসাহে পাড়ার ছেলেরা নবীজী সিজদায় গেলে উটের নাড়িভুঁড়ি তার পিঠে চাপিয়ে দিত । আর তাদের এ কাজে নিজেরাই একে অপরের গায়ে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়তো ।

ঘরে থেকে বের হয়ে পা দিলেই মরুর ক্যাকটাসের ধারালো কাঁটা যেন ফুটে যায় উম্মে জামিল পথে বিছিয়ে রাখতো কাঁটা । বড় বড় ধারালো কাঁটা যুক্ত ডাল পালা সে নিজে বহন করে আনতো ।নবীজীকে একটু কষ্ট পেতে দেখলেও তার আত্মা ঠাণ্ডা হয় ।

উম্মে জামিল সবসময় বলতো , লাত ও উযযার কসম আমার এই মহামূল্যবান গলার নেকলেসটি বিক্রি করে দিব যদি মোহাম্মদকে ধ্বংস করার জন্য তোমাদের টাকার ঘাটতি হয় । মুসলমানদের মধ্যে নানা রকমের ফিতনা ফ্যাসাদের অগুন জ্বালিয়ে রাখতো । উস্কানি দিতে দিতে বিভীষিকাময় যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরী করা ছিল তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট ।


আবু লাহাব আর তার স্ত্রী উম্মে জামিলের মধ্যে এত মিল দেখে মনে পড়ে সুরা নূরে ২৭ নং আয়াত , " আর দুশ্চরিত্র রমণী দুশ্চরিত্র পুরুষের জন্য আর সৎ নারীরা উত্তম পুরুষের জন্য । "

মহিলাদের পক্ষে যতটা কুটনামী করা সম্ভব তার সবটাই উম্মে জামিল করেছে । অহংকার তাকে অন্ধ করে দিয়েছে । তার পাপের বোঝা পূর্ণ হয়ে যাবে । তওবা করার মত যতটুকু নিরহংকার হতে হয় তা সে কোন দিন হতে পারেনি । কোনদিন ক্ষমা চায় নি । বরং আবু লাহাবকে ক্রমাগত উস্কানি দিয়ে গেছে । আবু লাহাব তো জাহান্নামের আগুন কে নিজের ঠিকানা করে নিয়েছে । যোগ্য স্ত্রী হিসেবে সেও সেখানে থাকবে । যে সোনার হার তার গলার অহংকার সেখানে থাকবে খেজুর গাছের পাকানো রশি ।

মহিলা বলে মাফ পেয়ে যাবার কোন কারন নাই । মহিলাদের জন্য আলাদা ভাবে কম বা বেশি শাস্তির ব্যবস্থাও নাই ।

“ যারা না জেনে মন্দ কর্মে লিপ্ত হয় তার যদি তওবা করে ও সংশোধিত হয় , তবে নিঃসন্দেহে আপনার প্রতিপালক তাদের জন্য অতীব ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু । “ সূরা নাহল ১২০ ।


পাপের পথ দিয়ে দূরে যেতে যেতে বহু দূর চলে গেলে অন্তরে যদি সিল পড়ে যায় , ফিরে আসার পথ ও কিন্তু খুঁজে পাওয়া যায় না । নিশ্চয় বিপথগামীদের আপনার রব ভালভাবে চেনেন এবং পথপ্রান্তদের ও ভালভাবে জানেন । ( সূরা নাহল ১২৬)


(১১) আবু লাহাবের অভিশপ্ত হাত দুটি ভেঙ্গে যাক




আবু লাহাব সবসময় নবীজীর পিছনে লেগে থাকতো । হজ্জ্বের সময়ে নবীজী বাহিরের মানুষের কাছে ইসলাম প্রচার করতেন । আবু লাহাব ও নিজের সাধ্যমত অপপ্রচার চালাতো । মহানবী হেঁটে হেঁটে প্রচার করছিলেন , " বল আল্লাহ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই । " কিন্তু স্যান্ডেল ভিজে যাচ্ছে রক্তে । পাথর ছুঁড়ে মারা হচ্ছে তাঁকে । তাও কে মারছে ?? লোকজন হতভম্ব । কে এই লোক ? যে আল আমিন কে এভাবে রক্তাক্ত করে দিচ্ছে । রক্ত এসে পায়ের স্যান্ডেলে জমাট বেঁধে যাচ্ছে । কে এই পাষাণ ?হায় সুঠাম দেহী সুন্দর এ পুরুষ এ তার ই আপন চাচা । তাঁর ই দাদা জানের আবদুল মুত্তালিবের ছেলে আবু লাহাব ।

ও আবু লাহাব তুমি সমস্ত আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করেছো , সীমা অতিক্রম করে গেছো । কিভাবে তুমি হাত তুলতে পার এই পবিত্র গায়ে ? আমার নবীজীর গায়ে হাত তুলেছে আবু লাহাব ? কি তাঁর অপরাধ ?

ভেঙ্গে যাক তোমার হাত । তুমি ব্যর্থ মনরথ হয়ে ফিরে যাও । নবীজীর আত্মীয়রা আর সাহাবীরা কান্না ধরে রাখতে পারেন না নবীজীর পবিত্র রক্ত দেখে , আঘাত গুলো দেখে ।

নবীজী অনেক মানুষের কাছে অনেক অত্যাচারের শিকার হয়েছেন । আরো বড় বড় শত্রু তাঁর আছে । কিন্তু নিজের রক্ত আবু লাহাবের বেঈমানিতে আল্লাহর আরসও কেঁপে উঠেছে ।

ভবিষ্যৎ বানী আবু লাহাবের য সেটাই ছিল সান্ত্বনা ।আবু লাহাবের হাতদুটো ধ্বংস হোক এবং ধ্বংস হোক সে নিজে । কোন কাজে আসেনি তার ধন-সম্পদ ও যা সে উপার্জন করেছে। সত্বরই সে প্রবেশ করবে লেলিহান অগ্নিতে । এবং তার স্ত্রীও-যে ইন্ধন বহন করে । তার গলদেশে খেজুর গাছের রশি নিয়ে। সুরা আবু লাহাব

নবুওয়তের সপ্তম বছরে কুরাইশদের সমস্ত পরিবার মিলে যখন বনি হাশেম ও বনি মুত্তালিবকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভাবে বয়কট করলো ।তারা নিজেরা একটি লিখিত চুক্তি করলো । দলীলে বলা হল , “ ,মক্কার কোন ব্যক্তি বনু হাসিম গোত্রের সাথে আত্মীয়তা করবেনা । তাদের কাছে কোন কিছু ক্রয় বিক্রয় করবেনা । তাদের কাছে খাদ্য প্রেরণ করবেনা । যতদিন না পর্যন্ত বনু হাসিম গোত্র রসুল ( সাঃ ) হত্যার জন্য কুরাইশদের হাতে তুলে না দেয় ততদিন পর্যন্ত চুক্তি বলবত থাকবে । “ কাবার দেয়ালে ঝুলিয়ে দেয়া হল এই চুক্তি । নবীজীর প্রতি অবিচল সমর্থনের জন্য আবু তালেব গিরিপথে মোহাররম মাসের প্রথম চাঁদ রাতে অন্তরীন হয়ে গিয়েছিলেন মুসলিম রা ।

নিজের পরিবার আর বংশের লোকদের পক্ষে না গিয়ে কাফেরদের পক্ষ নিয়েছিল আবু লাহাব । দীর্ঘ ৩ বছর এ বয়কট অব্যাহত ছিল । অনাহারের ছোবল এ ক্লান্ত বনি হাসিম পরিবার ।বাহিরের কোন বাণিজ্য কাফেলা এই গিরি পথে এলেও যাতে অন্তরিন লোকেরা খাবার কিনতে না পারে সে জন্য আবু লাহাব শকুনের দৃষ্টি ফেলে রেখেছিল ।

বাহিরের বনিকদের সে পূর্ণ আশ্বাস দিয়ে রেখেছিল , তোমাদের যত টাকা ক্ষতি হোক সে আমি পুষিয়ে দেবো কিন্তু তোমরা ওদের কাছে এত বেশি দাম চাও যাতে ওরা কোন খাবরই কিনতে না পারে ।

নাহ , কিনতে পারতোনা হাশিম আর মুত্তালিব পরিবার । বিরাট ভাবে হাঁকানো দামের কাছে কাছে তাদের চেহারায় শুধু অসহায়ত্বের ফুটে উঠত । শেষে নিজের অনাহারের কষ্ট বুকে পুষে রেখে খালি হাতে পাহাড়ে ফিরে যেতো ক্ষুধা কাতর সন্তান দের কাছে ।

গাছের পাতা পর্যন্ত খেয়ে থাকতে হয়েছে মোমিন দের ।ক্ষুধার্ত শিশুদের কান্না য় উল্লাস করেছিলো কুরাইশরা । সেই সাথে আবু লাহাব ও ।



এই সুরা নাযিল হবার পর ও আরও প্রায় ১০ বছর মুসলমানদের আবু লাহাবের শত্রুতা সহ্য করে যেতে হয় । ১০ বছর দীর্ঘ সময় ।আবু লাহাবের অত্যাচার সহ্য করার জন্য সুরা আবু লাহাব আর বাকি বিধর্মীদের অত্যাচার সহ্য করার জন্য ও আয়াত নাজিল হয় । আর আপনি ধৈর্য ধরুন , আপনার ধৈর্য তো আল্লাহর সংগে । তাদের কারণে দুঃখ পাবেন না এবং তাদের চক্রান্তে মনঃক্ষুন্ন হবেন না ,। নিঃসন্দেহে আল্লাহ মুত্তাকী ও পুণ্যবানদের সংগে আছেন । ১২৭ , ১২৮ সূরা নাহল।


আবু লাহাব সুরায় আবু লাহাব ও তার স্ত্রীর কথাই বলা আছে । ছেলেদের কথা কিন্তু বলা নাই । কারণ আল্লাহ জানেন শেষ পর্যন্ত কি ঘটবে ।আমরাও ইতিহাস ঘেঁটে তা দেখে নিব ।

(১২ ) হিসাব মিলানোর পালা



কিছুদিন পর ই উতাইবা আবু লাহাবের সাথে সিরিয়া যায় । সেই সফরে তারা রাত কাটানোর জন্য একটি জায়গায় তাঁবু ফেলে । স্থানীয় লোকেরা এই জায়গায় তাঁবু দেখে ছুটে এসে সাবধান করে দিয়ে যায় । তোমরা এখানে খুব সাবধানে থাকবে । এখানে রাতে কিন্তু হিংস্র প্রাণীরা ঘোরা ফেরা করে ।

আবু লাহাবের মন কেঁপে ওঠে । মোহাম্মাদ ( সাঃ ) এর বদদোয়ার কথা তার মনে পড়ে যায় । উতাইবা নবীজীকে থুথু নিক্ষেপ করার পরের বদদোয়া ।সে কোরাইশের লোকদের আদেশ দেয় উতাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে । ওরা উট দিয়ে নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরির পরিকল্পনা করে ।উতাইবার তাবুর চারপাশ ঘিরে থাকবে উট । উট গুলো শুয়ে থেকে একটা উটের প্রাচীর তৈরি করবে ।নিরাপত্তা ব্যবস্থা তদারকি করে তারা বেশ সন্তুষ্ট হয়ে ঘুমাতে গেলো আর গভীর ঘুমে অচেতন হয়ে গেল ।গভীর রাতের বেলা একটি বাঘ উটের দিকে কোন নজর না দিয়ে , উটের বেষ্টনী ভেদ করে ভিতরে প্রবেশ করে উতাইবা কে ছিন্ন ভিন্ন করে খেয়ে গেলো ।


আসলেই আবু লাহাব যা কিছু উপার্জন করেছে , যা কিছু ব্যয় করেছে ইসলামের ধ্বংসের পেছনে তা সফল হয় নি । সুরা আবু লাহাব নাযিলের ৭ – ৮ বছর পরেই বদরের যুদ্ধে কুরাইশদের বেশির ভাগ বড় বড় সর্দার নিহত হয় । ভেঙ্গে পড়ে আবু লাহাবের মনোবল । ইসলাম বিরোধিতা আর ইসলামের প্রতি শত্রুতায় তারা ছিল আবু লাহাবের সহযোগী ।

তখনো কিন্তু সে ইসলাম গ্রহণ করতে পারতো কিন্তু সে করেনি । এর পর আবু লাহাব আর বেশি দিন বেঁচেছিল না । তার মৃত্যু ও ছিল বড় ভয়াবহ ও শিক্ষণীয় । তার সমস্ত শরীর ভরে যায় সাংঘাতিক ধরনের ফুসকুড়িতে ।
পরিবারের সবাই সংক্রমণের ভয়ে তাকে মৃত্যু শয্যায় রেখেই পালিয়ে যায় । তার মৃত্যুর তিন দিন পর্যন্ত কেউ ধারে কাছে ঘেঁষেনি । লাসে পচন ধরে দুর্গন্ধ ছড়াতে থাকে । পচা গন্ধে টিকতে না পেরে সবাই ছেলেদের ধিক্কার দিতে থাকে । শেষে ছেলেরা হাবশী কৃতদাস ভাড়া করে । তারা একটি গর্ত খুঁড়ে দূর থেকে লম্বা লাঠি দিয়ে লাশ গর্তে ফেলে দেয় । আর উপর দিয়ে মাটি চাপা দেয় ।


যে ইসলামের পথ স্তব্ধ করে দেয়ার জন্য সে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিলো তার সন্তানদের ইসলাম গ্রহণের মধ্যে দিয়ে তার চূড়ান্ত বিজয় রচিত হয় ( সবাই বাবা মায়ের মত সাইকো হয়নি )তাঁর মেয়ে দাররা হিজরত করে মদিনা গিয়ে আগেই ইসলাম গ্রহণ করে । আর মক্কা বিজয়ের পর তার দুই ছেলে উতবা আর মুয়াত্তাব হযরত আব্বাস (রাঃ ) এর সাথে রসুল (সা: ) এর সামনে হাজির হন আর ইসলাম গ্রহণ করেন ।

(১৩ ) আত্ম উপলব্ধি


আবু লাহাব ও তার স্ত্রীর পরিণতি দেখে অত্যাচারিত মন খুশি হয়ে উঠতে পারে । কিন্তু আমাদের বেশি খুশি হওয়ার প্রয়োজন আছে বলে মনে করিনা । কুরআনের মাত্র ৫ টি আয়াতে আবু লাহাবের কথা বলা আছে । যারা পূর্ব পুরুষদের ইতিহাস দেখে শিক্ষা নিতে চায় তাদের জন্য আবু লাহাব ও তার স্ত্রীর পরিণতি শুধু একটি উদাহরণ । এরকম আরো উদাহরণ আছে ," আর স্মরণ কর আদ, ছামূদ , কূপ বাসী ও তাদের মধ্যবর্তী কালের বহু জনপদের কথা যাদেরকে আমি ধ্বংস করেছি । আমি এদের প্রত্যেকের জন্য দৃষ্টান্ত রাখলাম , তাদের প্রত্যেককে পূর্ণ ধ্বংস করলাম ।( সুরা ফুরকান ৩৯ -৪০)

( ফেরাউনের দলকে ) অন্য দলকে নিমজ্জিত করলাম এতে রয়েছে নিদর্শন । ( সুরা শু আরা ৬৭/ ৬৮ )

নূহ ( আঃ ) এর সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে বলা আছে , অতঃপর আমি তাকে ও তার সঙ্গীদের বোঝাই নৌকায় রক্ষা করলাম । পরে অবশিষ্ট সবাইকে ডুবিয়ে মারলাম । অবশ্যই এতে নিদর্শন আছে । ( সুরা শু আরা ১২০ / ১২১ )

কুরআনে আছে সমস্ত জীবন ব্যবস্থা । আর আদেশ অমান্য কারীদের জন্য ভয়াবহ শাস্তির কথা ও বলা আছে ।


আবু লাহাব ও তার স্ত্রী যে পাপ গুলো করেছে সেগুলি কি আর হয় না ? হয় । আরো বেশিও হয় । কূটচালের কারণে কত সংসার ভেঙ্গে যায় । এখনো প্রতিবেশীরা পরস্পর পরস্পরকে কষ্ট দেয় । গীবত আজকাল জাতীয় সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে । কন্যা শিশুদের দেয়া হত জীবন্ত কবর ( এখন মানুষ এক ধাপ এগিয়ে , আল্ট্রাসনোতে কন্যা শিশু দেখেই এবরশন করিয়ে নেয় , বিশেষত ইন্ডিয়ায় , তখন তো আর আল্ট্রাসনো করার ব্যবস্থা ছিল না , কন্যা শিশু জন্ম গ্রহণ করার পর দেখতো কন্যা হয়েছে , তারপর দিয়ে দিত জীবন্ত কবর )

তাহলে যারা পাপী তাদের জন্য সে শাস্তি অপেক্ষা করে আছে ।আর ইসলাম আর তার মূল্যবোধকে ভূলুণ্ঠিত করার জন্য কাজ করে যাচ্ছে কত আবু লাহাব , কত উম্মে জামিল । সবার জন্য একই শাস্তি । মুমিন নরনারীকে কষ্ট দেয়া , প্রতিবেশিকে কষ্ট দেয়া , আত্মীয়তার সম্পর্ক নষ্ট করা , সব কিছুর জন্য শাস্তি দো্যখের আগুন ।

“ যারা মুমিন পুরুষ আর নারীকে নিপীড়ন করেছে , অতঃপর তওবা করেনি , তাদের জন্য আছে জাহান্নামের শাস্তি ,আর আছে দহন যন্ত্রণা । “ আল বুরুজ ১০
আত্মীয়তার সম্পর্ক নষ্টকারী বেহেসতে প্রবেশ করবেনা ।
প্রতিবেশির হক নষ্ট কারীরা ও বেহেশতে প্রবেশ করবেনা ।


আমাদের আল্লাহ হিদায়াত দান করুক । এই সব পাপ হতে আমাদের দূরে রাখুক ।

হে আল্লাহ আমাদের সরল পথ সিরাতুল মুস্তাকিম দেখিয়ে দাও । তাদের পথ যাদের তুমি অনুগ্রহ করেছো । তাদের পথ নয় যারা অভিশপ্ত ও পথভ্রষ্ট হয়ে গেছে । ( সুরা ফাতিহা )


পোস্ট শেষ ।

Written by ডাঃ নার্গিস পারভীন

প্রাণ ঢালা কৃতজ্ঞতা :
* সকল প্রশংসা আল্লাহর আর প্রানের চেয়ে প্রিয় নবীজির উপর অসংখ্য দুরুদ আর সালাম । অনিচ্ছা কৃত ভুল আর ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতার জন্য ক্ষমাপ্রার্থি ।
* প্রয়াত হুমায়ুন আহমেদ , তার অসমাপ্ত লেখা নবীজী ( বই লীলাবতীর মৃত্যু ) লেখার ইচ্ছা ছিল বছর তিনেক ধরে । কিন্তু বইটি হাতে পাওয়ার পর কিবোর্ড নিয়ে বসা । আল্লাহ তাঁকে বেহেসতে নসীব করুন ।
* আবুল আসাদ - বই আমরা সেই সে জাতি -২ ( ভাষা মাধুর্যে মুগ্ধ । অনেক লাইন সরাসরি ধার করা হয়েছে )
*আর রাহিকুল মাকতুম বা মোহরাঙ্কিত জান্নাতী সুধা ( পুরস্কারপ্রাপ্ত নবীজীর জীবনী গ্রন্থ)
* ব্লগার তন্দ্রা বিলাস ( তার তাফসির এর পোস্ট টির জন্য )
* তাফসীর ফী যিলযালালিল কুরআন
*শব্দার্থে আল-কুরানুল মজীদ ( দশম খন্ড )
* তাফহীমুল কুরআন ( ১৯ তম খণ্ড )
* ছহীহ নূরানী বঙ্গানুবাদ কুরআন শরীফ ( মিনা বুক হাউজ )
*মেঝ মামা মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম
*ছোট বোন নাসিমা পারভীন সুমি
*এবং আরো অনেকের প্রতি
* ছবি গুগল

0 comments
Labels:

ডিজিটাল শিক্ষক

ডিজিটাল শিক্ষক
চট্টগ্রামের মাদ্রাসাশিক্ষক হাফেজ আল্লামা মোহাম্মদ মহিউল হক। ব্রিটিশ কাউন্সিলের 'কানেকটিং ক্লাসরুম প্রজেক্ট'-এ মুনশিয়ানা দেখিয়ে পেয়েছেন কয়েকটি আন্তর্জাতিক পুরস্কার। মাইক্রোসফট স্বীকৃত বাংলাদেশের একমাত্র 'এক্সপার্ট এডুকেটর' তিনি। গত মাসে স্পেনের বার্সেলোনায় অনুষ্ঠিত মাইক্রোসফট গ্লোবাল ফোরামে 'পোভার্টি' বিভাগে ৯৭টি দেশের এক হাজার ১০০ প্রতিযোগীর মধ্যে হয়েছেন প্রথম রানারআপ।

২০০৯ সালে চট্টগ্রামের অজপাড়াগাঁর নজিরিয়া নঈমিয়া মাহমুদিয়া সিনিয়র মাদ্রাসায় প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন মহিউল। সে বছরই মাদ্রাসাটিকে যুক্ত করেন 'কানেকটিং ক্লাসরুম'-এর সঙ্গে। কানেকটিং ক্লাসরুম হলো ব্রিটিশ কাউন্সিলের স্কুলভিত্তিক একটি প্রকল্প, যার মাধ্যমে এক দেশের স্কুলের শিক্ষার্থীরা আরেক দেশের স্কুলের নিয়মকানুন ও সিলেবাস সম্পর্কে জানতে পারে। শিক্ষাবিষয়ক নানা অভিজ্ঞতাও একে অন্যের সঙ্গে আদান-প্রদান করতে পারে। শুধু তা-ই নয়, কানেকটিং ক্লাসরুমের অন্তর্ভুক্ত বিদেশি স্কুলগুলোর বিজ্ঞান মেলা, বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতাসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশ নেওয়া যায়। নজিরিয়া নঈমিয়া মাহমুদিয়া সিনিয়র মাদ্রাসাটি যুক্তরাষ্ট্রের ডারহ্যাম-সান্ডারল্যান্ডের চারটি স্কুলের সঙ্গে 'কোলারভেটিভ পার্টনারশিপ' হিসেবে যুক্ত হয়। মহিউলের এ উদ্যোগ অল্প কয়েক দিনের মধ্যে শিক্ষার্থীদের পাঠদানে নতুন মাত্রা যোগ করে। তিনি দেখিয়েছেন লেখাপড়াটা শিক্ষার্থীদের কাছে বিরক্তিকর নয়, বরং মজার। অজপাড়াগাঁর যে ছেলেমেয়েদের ইন্টারনেট ব্যবহার করাটা স্বপ্নের ব্যাপার ছিল, সেখানে এই প্রকল্পের মাধ্যমে ইংল্যান্ডের বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিজেদের অভিজ্ঞতার আদান-প্রদান করতে পারছে। এতে মাদ্রাসার শত শত শিক্ষার্থীর লেখাপড়ার মানোন্নয়ন হয়েছে। যে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা কয়েকটা বিষয়ে ফেল করত, তারাই এই প্রকল্পের বদৌলতে রাতারাতি বদলে গেল। মহিউল হকের হাত ধরে এই মাদ্রাসা শুধু শিক্ষায় উন্নতি করেনি, বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের নামটাও আরো উঁচুতে তুলে ধরেছে। কানেকটিং ক্লাসরুম প্রজেক্টে অসামান্য সাফল্য অর্জনের প্রতিদান হিসেবে মাদ্রাসাটি ব্রিটিশ কাউন্সিলের সহায়তায় যুক্তরাজ্য থেকে পেয়েছে ২০১০ সালে 'স্টার পার্টনারশিপ অ্যাওয়ার্ড', ২০১১ সালে '১০০ ওয়ার্ডস ড্রামা অ্যাওয়ার্ড', ২০১২ সালে বাংলাদেশের প্রথম ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যাওয়ার্ড (আইএসএ)'।

২০১২ সালে বাংলাদেশ থেকে একমাত্র মাদ্রাসা হিসেবে যুক্তরাজ্যে অনুষ্ঠিত প্যারা অলিম্পিক গেইমসে অংশ নেওয়ার সুযোগ পায় নজিরিয়া নঈমিয়া মাহমুদিয়া সিনিয়র মাদ্রাসা। এমনকি ২০১৩ সালে ১০০ ওয়ার্ড অডিও বিজয়ী হিসেবে নাম লেখায় এই মাদ্রাসা।


Bangladeshi Madrasa teacher shows ‘How it’s done’ !

More links: http://www.thedailystar.net/print_post/connecting-classrooms-2468 
http://62.164.186.166/blog/76584
http://hifipublic.com/bangladeshi-madrasa-teacher-shows-how-its-done/

0 comments