শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু

যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহ তা' আলার যিনি সকল সৃষ্টি জগতের পালনকর্তা।

মুহাম্মদ (সাঃ)-আল্লাহর রাসূল

মুহাম্মদ (সাঃ)-সকল মানুষের জন্য উদাহরন, সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ, ও আল্লাহর রাসুল

আল কোরআন - মহান আল্লাহ প্রদত্ত কিতাব

এ সেই কিতাব যাতে কোনই সন্দেহ নেই। পথ প্রদর্শনকারী পরহেযগারদের জন্য,

আমাদেরকে সরল পথ দেখাও

আমরা একমাত্র তোমারই ইবাদত করি এবং শুধুমাত্র তোমারই সাহায্য প্রার্থনা করি।

আল্লাহ নিতান্ত মেহেরবান ও দয়ালু

সে সমস্ত লোকের পথ, যাদেরকে তুমি নেয়ামত দান করেছ। তাদের পথ নয়, যাদের প্রতি তোমার গজব নাযিল হয়েছে এবং যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে।

Labels: , ,

মুহাম্মদ (সঃ) নবী হয়ে কেন যুদ্ধ করেছিলেন? একজন নবী কী যুদ্ধ করতে পারে?

ত্যানা প্যাচানোওয়ালা নাস্তিকদের জবাবে....
মুহাম্মদ (সঃ) নবী হয়ে কেন যুদ্ধ করেছিলেন? একজন নবী কী যুদ্ধ করতে পারে?"
এরপর শুরু হয়ে গেল গালাগালি। কোন কথা শুনাশুনিতে নাই। অবশ্য কোন কথা শুনতেও রাজি নয়। ওদের একটাই কথা, "তোদের নবী একজন খুনি। আমরা কোন খুনিকে ফলো করি না। ঘেউ ঘেউ ঘেউ।"
বলতে ইচ্ছা হয়, না করলে না করবি, আমার কিসের ঠ্যাকা?

এমন ভাব যেন আমি গিয়ে ওদের হাতে পায়ে ধরছি, "প্লিজ আমার নবীকে 'গ্রেট' বল! প্লিজ! নাহলে পা ছাড়ছি না।"
যে লোকটাকে আল্লাহ সর্বোচ্চ সম্মান দিয়েছেন, কোন ফকিরনি তাঁকে নিয়ে কী বলল না বলল তাতে কিই বা আসে যায়?

তবে ওদের কথা শুনে কিছু মানুষের মনে এমন প্রশ্ন উঠে, "আসলেইতো, একজন নবী কী করে যুদ্ধের হুকুম দিলেন? আল্লাহ কী করে যুদ্ধের হুকুম দিলেন? তাহলে ইসলাম দেখছি আসলেই জঙ্গি ধর্ম!"
প্রশ্নের উত্তর দেয়ার আগে একটা কথা বলে নেই, যদি আমাদের নবী যুদ্ধ না করতেন, তাহলে ওরা এখন কী বলতো জানেন?

"কিসের নবী তোদের? কিসের ধর্ম? মানুষ এসে চড় থাপ্পর মেরে যায়, তোরাও লাথি উষ্টা খেয়ে যাস, তারপরেও কিছু বলতে পারিস না। 'ধৈর্য্য ধর' 'ধৈর্য্য ধর' আওয়াজ তুলিস! আরে তোরা হচ্ছিস নপুংশকের জাত! নিজের অধিকার আদায় করতে জানিস না।"

সিনেমা হলের একটা চেয়ারের কভারে একটা ছোট ছিদ্র করে আসুন। একমাসের মধ্যেই দেখবেন সেই কভারের খাল বাকল সব ছিলা হয়ে গেছে। মানুষ সেই ছোট ছিদ্রটা দেখার সাথে সাথেই মনের অজান্তে ইচ্ছা মতন খাবলা খুবলি করে এই হাল করেছে।

বনের বাঘকে সবাই ভয় পায়। অথচ বাঘের চেয়ে শারীরিকভাবে অনেক বড় গরু দিয়ে মানুষ হালচাষ করে।
তেমনি কোন মানুষকে অত্যাচারিত হতে দেখুন। দেখবেন চিকন থেকে চিকনতম মেরুদন্ডের মানুষও সেই দুর্বলের উপর অত্যাচার করা শুরু করে দিয়েছে। "এক গালে চড় দিলে আরেক গাল পেতে দাও" থিওরি বাস্তব জীবনে একদমই অকেজো। গান্ধীজির চ্যালারা যদি মনে করে থাকেন তাঁর এই মতবাদের কারনেই ভারত ছেড়ে ব্রিটিশরা পালিয়েছিল তাহলে সবাই মুর্খের রাজ্যে বাস করছেন। গান্ধীজির পাশাপাশি বিপ্লবীদের অবদানও যথেষ্ট ছিল। সেই সাথে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইংল্যান্ডের ভরাডুবিও ছিল আরেকটা কারন।

ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে কোন কোন পরিস্থিতিতে চড় খেলে চুপচাপ গাল ফিরিয়ে সরে যেতে হবে, আবার কোন পরিস্থিতিতে কেউ চড় দিলে একদম হাত ভেঙ্গে দিতে হবে।

যারা দাবি করে, নবীজি যুদ্ধবাজ ছিলেন, তারা অত্যন্ত যত্নসহকারে তাঁর মক্কার জীবনটা এড়িয়ে যায়। প্রথমে নিজের পরিবারের লোকজনেরাই (আবু লাহাব, চাচা) তাঁর শত্রু হলেন। তারপর নিজ শহরের লোকেরাও একই কাজ করলো। প্রথমে তাঁকে মারধর না করলেও তাঁর নামাজ পড়া অবস্থায় তাঁর উপর পশুর গলা নাড়িভুড়ি ফেলা হলো। তাঁর ফলোয়ারদের অমানুষিক অত্যাচার করা হলো। বিলালকে (রাঃ) মরুভূমির গরম বালুতে শুইয়ে রেখে তাঁর উপর গরম পাথর রাখা হত। তাও এমনই গরম পাথর যার উপর মাংস ফেলে রাখলে কিছুক্ষনের মধ্যেই সেটা রান্না হয়ে যেত।
খাব্বারের(রাঃ) পিঠের উপর তাঁর মালকিন লোহা গলানোর কয়লা ঢেলে দিয়ে তাঁর চিৎকার শুনে হাততালি বাজাত।
সুমাইয়া ইয়াসিরকেতো (রাঃ) তাঁদের ছেলের সামনেই নৃসংশভাবে হত্যা করা হলো। বর্ণনা দিব? সুমাইয়ার(রাঃ) যোনি পথ দিয়ে বর্শা ঢুকিয়ে খুঁচিয়ে খুচিয়ে তাঁকে হত্যা করে শরীর দুই ভাগ করা হলো। এবং ইয়াসিরকে(রাঃ) দুই পাশ দিয়ে ঘোড়া দিয়ে টানিয়ে মাঝবরাবর ছিড়ে ফেলা হলো।
কেন? কারন তাঁরা শুধু বিশ্বাস করেছিলেন আল্লাহ এক, এবং অদ্বিতীয়।

তারপরেও কিছুতে কিছু হচ্ছিল না বলে তাঁদের সমাজচ্যুত করা হলো। তিনটা বছর মুসলিমদের সাথে কেউ কথা বলেনি, কোন লেনদেন করেনি। না খেয়ে মুসলিম শিশুরা মরেছে, বৃদ্ধরা মরেছে, নারীরা মরেছে - কেউ এগিয়ে আসেনি ওদের সাহায্যে। পশুর চামড়া আর গাছের লতাপাতা চিবিয়ে খেয়ে বাঁচতে হয়েছে। মুতইম ইবনে আদী যদি সেসময়ে মাঝে মাঝে তাঁদের খাবার না পাঠাতো, তাহলে খবরই ছিল। একটা প্রতিবাদ করেননি আমাদের নবী(সঃ)।
তারপরেও তারা শান্ত হয়নি। এইবার নবীজিকেই (সঃ) মেরে ফেলতে চাইলো। রাতের আঁধারে তাঁর বাড়িতে এসে হামলা করলো। তিনি মদিনায় "হিজরতে" গিয়ে প্রাণে রক্ষা পেলেন। সাহাবীরা প্রতিরাতে স্বপ্ন দেখেন একদিন জন্মভূমিতে ফিরে যাবেন। নিজের বাড়িঘরের দেয়ালে চুমু খাবেন, নিজের মাতৃভূমির মাটিতে সিজদাহ দিবেন। বুক ভরিয়ে ফেলবেন মক্কা নগরীর বাতাসে। তাঁদের লেখা কবিতায় তখন এইসব হাহাকার প্রকাশ পায়।

এইদিকে মক্কাবাসী কুরাইশরা কী করলো? তাঁদের ফেলে যাওয়া চৌদ্দ পুরুষের সহায় সম্পত্তি সব লুটে নিল। লুটের টাকা সিরিয়ায় পাঠিয়ে আরও প্রফিট বানালো।
যদি নবীজি(সঃ) এর পরও চুপ থাকতে বলতেন, তাহলেও সাহাবীরা চুপ থাকতেন। কিন্তু ব্যপারটা কতখানি প্র্যাকটিকাল হতো?
বাস্তব উদাহরণ দিলেই বুঝবেন।

পাকিস্তান আমাদের উপর একটানা শোষণ করে গেছে। আমরা মাঝে মাঝে চুপ থেকেছি, মাঝে মাঝে প্রতিবাদ করেছি। কিন্তু যেদিন আমাদের ঘরে ঘরে ঢুকে ওরা গুলি করে মারতে লাগলো, আমাদের মা বোনদের উঠিয়ে নিয়ে যেতে লাগলো, তখন কী আমাদের ধৈর্য্য ধরে বসে থাকলে চলতো? "এক গালে চড় খেলে আরেক গাল পেতে দাও" ফিলোসফি কাজে আসতো? They didn't mind killing Bengalis.

নবিজিই(সঃ) উদাহরণ সেট করে গেছেন। পরিস্থিতি বিবেচনায় "মুসলমান মুসলমান ভাই ভাই" হাদিসটা ভয়েড হয়ে যায় কুরআনের একটি আয়াত দিয়ে "যখন দুইজন মমিনের মধ্যে লড়াই বাঁধবে তখন তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে দুইজনের মধ্যে মিমাংসা করে দাও। আর যদি সেই দুইজনের মধ্যে একজন জালিম হয়ে থাকে, তবে দুর্বলের পক্ষ্য নিয়ে জুলুমকারীর বিরুদ্ধে লড়, ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ না সে পরাজিত হয়।" আল্লাহর স্পষ্ট নির্দেশ।
ছাত্ররা কলম ছেড়ে অস্ত্র তুলে নিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর একটা রিক্সাওয়ালার কাঁধে কাঁধ রেখে শত্রুর মোকাবিলা করলো। দেশ স্বাধীন হলো।

যদি নবিজি(সঃ) উদাহরণ সেট করে না যেতেন? ট্রাস্ট মি, আজকে পৃথিবীতে মুসলমান সংখ্যা এত বেশি হতো না। তার বহু আগেই অত্যাচারিত হয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত। আর বাকিরা ভয়েই দূরে সরে যেত।
ভুলে গেলে চলবে না, আমাদের নবী(সঃ) সেদিনকার রাজাকার বনু কুরায়দাকে যেমন মৃত্যুদন্ড দিয়েছিলেন, তেমনি মক্কা বিজয়ের পর চিরশত্রু কুরাইশদের হাতের মুঠোয় পেয়েও সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন। সবচেয়ে বড় কথা, তিনি কী একটা যুদ্ধ জয়ের শেষেও ভিকট্রি পার্টি করেছিলেন? বাংলায় বললে বিজয়োৎসব? রং ছুড়াছুড়ি, খুশিতে এর ওর মুখে জোর করে মিষ্টি খাইয়ে দেয়া? খুঁজতে থাকেন। একটাও যদি উদাহরণ পান, প্লিজ দেখান।
ত্যানাবাজরাই কেবল বনু কুরায়দা, কাব বিন আশরাফ আর বিভিন্ন যুদ্ধ নিয়ে ত্যানা প্যাচায়।
এখন এটাও ঠিক ইসলামের নামে জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। এবং একদল মুর্খ জঙ্গিদের জন্য গোটা ইসলামকেই দোষ দিচ্ছে।

কিন্তু ক্রিমিনোলজি নিয়ে বিন্দুমাত্র পড়াশোনাও যদি কেউ করে থাকে, তারই বুঝবার কথা যে প্রতিটা অপরাধীর নিজস্ব কিছু ফিলোসফি থাকে। হিটলার জাতীয়তাবাদের নামে লাখ লাখ ইহুদি মেরে সাফ করে দিয়েছিল। স্তালিন কমিউনিজমের নামে লাখ লাখ স্বজাতির হত্যা করেছিল। দেশপ্রেমের নামে অ্যামেরিকা যে কয়টা দেশ উজার করে দিয়েছে কে হিসেব করবে? আমাদের দেশেও বিএনপি আওয়ামীলীগের নামে প্রতিদিন হত্যার ঘটনা ঘটছে।
"তুই ওকে মারলি কেন?"
"ও আওয়ামীলীগ করে। ভারতের দালাল।"
"তুইই বা ওকে মারলি কেন?"
"ও বিএনপি করে। যুদ্ধাপরাধী।"
"ও পাকিস্তানি ওকে পায়ের নিচে পিষে মারা দরকার।"
এই কথাতো আমরা প্রায় প্রতিদিনই শুনি। আবার একই বক্তব্য হয়তো কোন এক পাকিস্তানিরও আমাদের বাঙালিদের প্রতি।
আস্তিক নাস্তিকদেরও একই ঘটনা। শুধু শব্দের হেরফের হয়।
"ও নাস্তিক। ওর ফাঁসি চাই।"
"ও ছাগু! ও শুধু কোপাতেই জানে। ওরও ফাঁসি চাই।"

কাজেই, নিতান্তই আহাম্মক না হলে কেউ অপরাধীর অপরাধকে ধর্মের ভিত্তিতে ফিল্টার করেনা।
ক্যানাডা এয়ারফোর্সের হাইলি ডেকোরেটেড অফিসার কর্নেল রাসেল উইলিয়ামস নিজের বেসের প্রতিবেশী মেয়েদের আন্ডার গার্মেন্টস চুরি করতো। সে কিন্তু ধর্ষণ করতো না। সুন্দরী মেয়েদের আন্ডার গার্মেন্টসের গন্ধ নিতে তার ভাল লাগতো। পারভার্ট এই লোকটার এই অপরাধ ধীরে ধীরে বাড়তে বাড়তে দুইটা খুনে গিয়ে শেষ হলো। মেয়েগুলো তাকে চুরির সময়ে দেখে ফেলেছিল বলে। তাহলে কী এখন সব দোষ ভিক্টোরিয়া'স সিক্রেট জাতীয় কোম্পানিগুলোর?
একজন সন্ত্রাসী, সে যেই হোক, সে একজন সন্ত্রাসী। এবং দেশের প্রচলিত আইনেই তার বিচার হওয়া উচিৎ। এবং সে যদি মুসলিম হয়, তাহলে আমার দাবি তার বিচার সর্বোচ্চ ও কঠোরতর হওয়া উচিৎ। এখানেও আমি ইসলামেরই দৃষ্টান্ত দেব।

উমার (রাঃ) আমির-উল-মু'মিনীন নির্বাচিত হয়ে প্রথমেই নিজের ছেলেদের ডেকে পাঠালেন। তারপর গম্ভীর স্বরে বললেন, "তোমাদের বাবা ইসলামের খলিফা নির্বাচিত হয়েছে। সবাই জানে ন্যায়ের পক্ষ্যে উমার কতখানি কঠোর। কেউ অপরাধ করলে আমি অবশ্যই তাকে শাস্তি দেব। এবং অপরাধী যদি তোমরা হয়ে থাক, তাহলে সেই শাস্তির পরিমাণ হবে দ্বিগুন। প্রথমত অপরাধের জন্য, দ্বিতিয়্ত, খলিফার ছেলে হয়েও অপরাধ করার জন্য। তোমাদের শাস্তি এত প্রচন্ড হবে যে তোমরা যেন আফসোস করে ভাব, কেন তোমাদের বাবা খলিফা নির্বাচিত হলেন!"
তিনি তাঁর কথা রেখেছিলেন। নিজের ছেলেকেই মদ্যপানের শাস্তি দিতে গিয়ে পুত্রহারা হয়েছিলেন। একজন পিতা জানেন তাঁর কাঁধে সন্তানের মৃতদেহ কতখানি ভারী।

একেকটা খুনি জঙ্গিকে বেত্রাঘাত করতে করতে ফাঁসিতে ঝুলানোর আগে যেন তাদের আফসোস হয়, কেন তারা খুন করতে গেল। এবং তারচেয়েও বেশি আফসোস হয়, একজন মুসলিম হবার পরেও সে কেন খুন করতে গেল।
শেষ করি সাম্প্রতিক একটি ঘটনা দিয়ে। বঙ্গদেশের একটা ষোল বছরের হারামজাদা মাতাল অবস্থায় গাড়ি দিয়ে একটি যাত্রীবাহী রিক্সা পিষে ফেলেছে। বাপ চাচা প্রভাবশালী হওয়ায় পুলিশের সহায়তায় হারামিটা পালিয়েও যেতে পেরেছে। দেশের সরকার হয়তো এই ছেলেটার কিছুই হতে দিবেনা। গরিব রিক্সাওয়ালা মরলে মরুক, রিক্সা চরনেওয়ালা যাত্রী মরলে মরুক....এইচবিএম ইকবালের ভাতিজা বলে কথা। চাচায় মিছিল করে পিস্তল নিয়ে, ভাতিজা যদি দুই একটা মানুষ গাড়িচাপা না দিল তাহলে চলবে?

উমার(রাঃ) কী করেছিলেন শুধু একটা ঘটনা বলি।
মিশর থেকে এক ব্যক্তি এসে খলিফাকে বিচার দিলেন মিশরের গভর্নরের পুত্র তাঁর উপর অত্যাচার করেছে। উমার সাথে সাথে মিশরের গভর্নর আমর ইবনে আস(রাঃ)সহ তাঁর পুত্রকে সমন পাঠালেন। খলিফার সমন পেয়ে আমর(রাঃ) নিজের পুত্রকে বারবার জিজ্ঞেস করলেন, "তুমি কোন অপরাধ করনিতো? নাহলে খলিফা কেন খবর পাঠালেন?"
আমরের পুত্র বারবার পিতাকে আশ্বস্ত করলেন তিনি কিছুই করেননি।

খলিফার দরবারে মিশরীয় ব্যক্তি প্রমাণ করে দিলেন ঘটনা। খলিফা নিজের লাঠি ধরিয়ে দিয়ে বললেন, "একে ততক্ষণ পর্যন্ত পিটাও যতক্ষণ না তোমার মন শান্ত হয়।"
গভর্নরের সামনেই এক সাধারণ জনতা তাঁর পুত্রকে লাঠি দিয়ে পেটালেন।
একটা সময়ে বেচারা ক্লান্ত হয়ে লাঠি ফেরত দিতে দিতে বললেন, "ধন্যবাদ হে আমিরউল মু'মিনীন। আমি আমার বিচার পেয়ে গেছি।"

উমার(রাঃ) বললেন, "বিচার এখনও শেষ হয়নি। এই নাও লাঠি, এখন তুমি গভর্নরকে মারো। তাঁর ছেলে তাঁর বাপের পজিশনের জোরেই এই কুকর্ম ঘটিয়েছে। কাজেই সে বুঝে নিক, তাঁর বাপের পজিশন তাঁর বাপকেও অপরাধ করার লাইসেন্স দেয় না।"

নজরুলের মতন আমারও আফসোস করে বলতে ইচ্ছা করে
"শুধু অঙ্গুলি হেলনে শাসন করিতে এ জগতের
দিয়াছিলে ফেলি মুহম্মদের চরণে যে-শমশের
ফিরদৌস ছাড়ি নেমে এস তুমি সেই শমশের ধরি
আর একবার লোহিত-সাগরে লালে-লাল হয়ে মরি!" 

পোস্টটি  লিখেছেন : মঞ্জুর চৌধুরী 

0 comments
Labels: , , , ,

আপনার যদি কোন মেয়ের দিকে অশালীনভাবে তাকানোতে সমস্যা না থাকে ?




আপনার যদি কোন সমস্যা না থাকে কোন মেয়ের দিকে তাকানোর প্রতি, অশালীনভাবে তাকানোতে, অর্থাৎ আপনি তারদিকে সম্মানের সাথে তাকাচ্ছেন না, আপনি যেন তাকে পশু বা মাংসপিণ্ড মনে করছেন, যদি এই আপনার মনোভাব হয়, তার মানে এই যে, আপনার নিজের মায়ের প্রতি, নিজের বোনের প্রতি, নিজের স্ত্রীর প্রতি, নিজের কন্যার প্রতি আপনার কোন শ্রদ্ধাবোধ নেই। তারাও নারী। আপনি কখনই চাইবেন না যে মানুষ তাদের দিকে অশোভন ভাবে তাকাক। আর আপনি যার দিকে তাকাচ্ছেন তিনিও কারো কন্যা, কারো বোন বা কারো মা। তাই সাবধান হউন।

এমনকি উনাদের যদি নিজেদের জন্য শ্রদ্ধা নাও থাকে, কখনও অমুসলিম নারীদের নিজেদের প্রতি সম্মানবোধ থাকেনা, তাই তারা কখনো কখনো ‪#‎অশালীন‬ পোশাক পরে, এমনকি মুসলিমরাও অশোভন পোশাক পরে থাকে। কিন্তু আপনারতো নিজের প্রতি এবং আপনার পরিবারের নারীদের প্রতি সম্মানবোধ আছে, তাই আপনি নিজের দৃষ্টিকে নত করুন। অবশ্যই করুন।

আর এটা খুবই ঘৃণ্য ব্যাপার যে, পুরো পরিবারে সবাই একসাথে বসে মুভি দেখে, আর যখন কোন আপত্তিকর দৃশ্য আসে, তখন মা আর মেয়ে তাদের স্বামী আর ভাইদের সাথে একসাথে তা দেখে – “ওহ, এইটা মাত্র একটা খারাপ দৃশ্য, এইটা এমন কিছু না”। এটা খুবই ন্যাক্কারজনক, এটা কোন মুসলিম পরিবারের আচরণ হতে পারেনা। এই ধরণের অশ্লিলতায় আমাদের বিরক্তি হওয়া উচিৎ। আমাদের এর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। এটা আমাদের সমাজের একটা বিশাল সমস্যা, আমাদের সমাজে অনেক ভাল ব্যাপার আছে, অনেক অনেক ভাল দিক আছে। কিন্তু এটা এমন একটা ব্যাপার যা আমাদের তরুণদের ধ্বংস করে দিচ্ছে। অশ্লিলতার অতিরিক্ত প্রকাশ। কোন এক মেয়ে যদি আপনাকে মেসেজ পাঠায়, “আমি তোমার ফেসবুক ফ্রেন্ড হতে চাই”। ঠিক আছে। কিন্তু আমি চাইনা। না। যাও তোমার ভাইয়ের সাথে ফ্রেন্ডশিপ কর। তোমার কি বাবা নেই? সে কি তোমার সাথে বন্ধুভাবাপন্ন নয়? তোমার কেন অন্য বন্ধু দরকার?

আমি খুব গুরুত্ব দিয়ে বলতেসি, আমি খুবই জোর দিচ্ছি, আপনারা এটাকে মজা মনে করবেন না। “ওহ, কি সুন্দর ছবি...” – এইটা আপনার জাহান্নামেরও টিকেট। আপনি আপনার চরিত্র নষ্ট করছেন। আপনি কি এমন কোন মেয়ে কে বিয়ে করবেন যার সাথে আর ১০০ ছেলের যোগাযোগ আছে। “হ্যাঁ, ও দেখতে বেশ সুন্দর, ওহ, তুমি অই মেয়েকে বিয়ে করেছ, আচ্ছা, আচ্ছা বেশ ভাল”। আপনার পরুষত্ব কোথায়? মুসলিমদের লজ্জাশীলতা থাকা উচিৎ, পুরুষ ও নারী উভয়েরই। এবং আমাদের নারীদের, কারও আপনার স্ত্রীর দিকে তাকানোর কথা না, কে ছাড়া?- আপনি। তার সৌন্দর্য আপনি ছাড়া আর কারও উপভগ করার কথা না। আপনার বিরক্ত হওয়া উচিৎ যদি কেউ আপনাকে এসে বলে “মাশাল্লাহ, আপনার স্ত্রী খুবই সুন্দর দেখতে”। এটাতে আপনার বিরক্ত লাগবে – তাই না? আমাদের এমন বিরক্তিই লাগা উচিৎ যখন আমরা মাহ্রাম নয় এমন কারও দিকে তাকাব। আমাদের মধ্যে লজ্জাশীলতা থাকতে হবে। আমি জানিনা এইটা কোথায় গেল। আজকাল এইটা মনে হয় ছুটি কাটাচ্ছে। অনেক মুসলিমের জন্যই সত্যি যে, তাদের শালিনতাবোধ ছুটি কাটাচ্ছে।

নিজের লজ্জাশীলতাকে ফিরিয়ে আনুন। এটা খুবই জরুরি, নাহলে আপনার পরিবার ধ্বংস হয়ে যাবে। আপনার বিয়ে সুখকর হবেনা, আর নিশ্চিতভাবেই আপনার বাচ্চারাও ভালভাবে গড়ে উঠবে না, যদি আপনার মধ্যে শালীনতাবোধ না থাকে। আপনার মাঝে অবশ্যই ‪#‎লজ্জাশীলতা‬ বা ‪#‎শালীনতাবোধ‬ থাকতে হবে।



আর টেলিভিশন এ যে নোংরা জিনিষ দেখান হয়, যা আপনারা দেখে থাকেন, আপনারা জানেন যে, মহানবী (সাঃ) আমাদের সাবধান করেছেন যে, তারা এমন কাপড় পড়ে যেন মনে হয় তারা কোন কাপড় পড়েনাই (শালীনভাবে), তিনি আমাদের এমন সময়ের ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। “ওহ এইটা শুধু পিজি-১৩ মুভি, ঠিক আছে আমরা এইতাতে যেতে পারি, এটা শুধুই পিজি-১৩। অথবা এইটাতে শুধু একটা খারাপ দৃশ্য আছে, এইটা এমন খারাপ কিছু না”। “আপনি কি চান? আমরা কি করি? আমরা কি মুভিও দেখতে পারবনা? আমার বাবা আর মা আমাকে কিছুই করতে দেয়না”। “আমার জীবন এ দুঃখ ছাড়া কিছুই নেই, কারন আমি এইটা দেখতে পারিনাই ...... যাইহোক”। তাইনা? নিজের উপর নিয়ন্ত্রন আনুন। নিজেকে সবসময় বিনোদনের মধ্যে রাখার উপর নিয়ন্ত্রন আনুন। আপনি একজন মুক্ত মানুষ। টেলিভিশন আর মুভি এর বাইরেও জীবন আছে । আর who.com বা বিভিন্ন ওয়েবসাইট এর বাইরেও আছে। এইসব কিছুর বাইরেও জীবন আছে। এখনও বাইরে অক্সিজেন আছে, আপনার জীবন বেঁচে থাকবে, আমার কথা বিশ্বাস করুন। আপনি এইসব বাদ দিয়েও বেঁচে থাকবেন, বরং সুখেই থাকবেন।

আর যেহেতু আমি আপনাকে বলছি আপনি কি করবেন না, তাহলে আমাকে এটাও বলতে হবে যে আপনি কি করবেন, তাই না? মানে আপনি যদি এসব কিছু না করেন, তাহলে আপনি কি করবেন? খেলাধুলার জন্য সময় বের করুন। বাইরে যান, জগিং বা এরকম কিছু করুন। স্বাস্থ্যকর কোন অভ্যাস করুন, আমি বলছি না যে আপনাকে ধর্মীয় কোন কাজ করতে হবে, আমি এই মুহুরতে আপনাদের কাছ থেকে তা আশাও করিনা, কিন্তু আমি এটা আশা করি যে আপনি এমন কিছু করছেন যা আপনাকে খারাপ মানুষে পরিনত করছেনা। আপনারা কি বুঝতে পারছেন যে আমি কি বলতে চাচ্ছি? কমপক্ষে খারাপ কাজ থেকে দূরে থাকুন। কমপক্ষে খারাপ কাজ থেকে দূরে থাকুন।

যারা বয়স্ক আছেন তাদের কে বলছি। আপনাদের থেকে একটু সময় নিচ্ছি। যদি এমন হয় যে আমাদের তরুনেরা মসজিদে আসছে, কিন্তু তারা ইসলাম নিয়ে কিছুই শিখছে না, তারা এইখানে শুধু বসে আছে, পিজা খাচ্ছে বা এমনি কথা বলছে, হয়ত কোন ভিডিও গেম নিয়ে কথা বলছে। আমি খুবই আনন্দিত যে তারা এটা করছে, কারন তারা যদি এইখানে এইটা না করত, খুব সম্ভবত বাসায় তারা আর খারাপ কিছুই করত। তাই দয়াকরে এমন বলবেন না যে, “এই, বাচ্চারা এইখানে কি করছে?” দয়া করে এমন বলবেন না। তাদের কে এইখানে থাকতে দিন। কারন এখানে না থাকলে তারা আরও খারাপ কিছুই করবে। অন্তত তারা কোন ক্ষতি করছে না। তারা বাইরে অন্য যে কিছুর চেয়ে এইখানে ভাল আছে। আপনারা কি বুঝতে পারছেন আমার কথা? আমাদের তরুণদের কাছ থেকে সবচেয়ে ভাল আচরণ আশা করবেন না, কারন আপনারাই তাদের সেভাবে গড়ে তোলেননি। তাই, আপনারা কিভাবে তাদের থেকে এটা আশা করেন? আপনারা তাদের পাবলিক স্কুলে পাঠিয়েছেন, তারা নিজে থেকে যায়নি। আপনারা পাঠিয়েছেন, তাদেরকে প্রতিদিন ৮ ঘণ্টা করে অশালীন পরিবেশে ছেড়ে দিয়েছেন, আর যখন তারা এমন আচরণ করেনা, যেমন তাবিইন রা করতেন, তখন আপনি বলেন, “তারা কিভাবে এইটা করতে পারল?”। আপনি কিভাবে এইটা চিন্তা করেন? বাস্তবে আসুন, বাস্তবিক ভাবে চিন্তা করুন। এটাই বাস্তবতা। আমি নিবেদিতভাবে সমাজের বয়স্কদের বলছি, মসজিদে তরুণদের সাথে ভাল ব্যবহার করুন। তাদেরকে ভালভাবে গ্রহন করুন, তাদেরকে বের করে দিবেন না।

আর আমি নিবেদিতভাবে তরুণদের বলছি, আমার শেষ পরামর্শ শালীনতা নিয়ে, তারপর আমি শেষ করব ইনশাল্লাহ। আমি কথা দিচ্ছি, এটাই শেষ। সত্যি সত্যি বলছি। বন্ধুত্ব করার জন্য আরও ভাল মানুষ খুজে বের করুন। আপনার বন্ধুরা যদি অশালীন হয় তাহলে আপনিও অশালীন হবেন। আর যদি আপনার বন্ধুদের মাঝে শালীনতা আর ভদ্রতা থাকে তাহলে আপনার মধ্যেও শালীনতা আর ভদ্রতা থাকবে। যদি আপনার বন্ধুরা খারাপ হয়, তাহলে তারা তাদের সাথে আপনাকেও দোজখে টেনে নিয়ে যাবে। আপনি মনে করছেন যে তারা খুব cool, কিন্তু একদিন এমন সময় আসবে যখন আপনি দেখবেন তারা আসলে খুব hot (জাহান্নামের আগুনের মত)। তখন আর এটাকে cool মনে হবেনা। আমি দোয়া করি ইনশাল্লাহ আপনারা এই পরামর্শগুলো গুরুত্তের সাথে নিবেন, আমি এত কিছু নিয়ে বলতে চাইনি, কিন্তু বলতেই হল।

আমার মনে হয় যে আমি যথেষ্ট সময় ও সুযোগ পাইনা তরুণদের পরামর্শ দেয়ার জন্য। খুব সহজে বলতে গেলে, অশ্লীলতা পরিহার করুন, নিজের ভিতরের খারাপ প্রবৃত্তির মোকাবিলা করুন, ইনশাল্লাহ আপনার লজ্জাশীলতা ফিরে আসবে। আমি দোয়া করি যেন আপনারা এই দ্বীনের নেতৃত্ব দিতে পারেন, আর এর বার্তা বহন করতে পারেন আর যখন সময় আসবে তখন শক্তিশালী, স্বাস্থ্যকর মুসলিম পরিবার গঠন করতে পারেন। আপনারাই আমাদের নেতা। আপনারা এটা চান আর না চান। আগামি দশকে আপনারাই আমাদের সমাজের নেতা হবেন। আপনারা মিলেই এই সমাজ, আপনারা মিলেই ইসলাম ইনশাল্লাহ। এই দায়িত্ব আপনাদেরই। আল্লাহ আপনাদের কে এই দায়িত্ব ঠিক ভাবে পালনের তৌফিক দান করুন ইনশাল্লাহ, আর আল্লাহ আপনাদের পিতামাতাদের আপনাদেরকে সঠিক ভাবে গড়ে তোলার সুযোগ দান করুন। আল্লাহ আপনাদেরকে ভাল বন্ধু পেতে সাহায্য করুন, আর খারাপদের থেকে দূরে থাকতে সাহায্য করুন। আল্লাহ আপনাদের খারাপ অভ্যাস থেকে দূরে থাকতে সহায়তা করুন, আর অশালিনতার থেকে দূরে রাখুন। পিতামাতার সাথে কথা বলার সময় নিজের জিহ্বা সতর্ক করুন, সময় নষ্ট করা বন্ধ করুন, সালাতে নিয়মিত হউন।

আমি যদি ভাল আর সত্যি কিছু বলে থাকি তাহলে তা আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে নিয়ামত। আর যদি কোন ভুল করে থাকি, তাহলে তার দায় আমার নিজের।

সুত্র: নোমান আলী খান
Nouman Ali Khan Collection In Bangla


0 comments
Labels: , , ,

দুনিয়া মু’মিনের জন্য জেলখানা, কাফিরের জন্য বেহেশত।- কথা কি সত্য ?

“মনে করে দেখো, যখন আমি বলেছিলাম, “এই শহরে প্রবেশ করো এবং এখানে তোমরা ইচ্ছেমতো যত খুশি খাও, কিন্তু এর দরজা দিয়ে প্রবেশের সময় আমার প্রতি (কৃতজ্ঞতায়) অবনত হয়ে প্রবেশ করো এবং বলতে থাকো, “আমাদের পাপের বোঝা হালকা করে দিন!” তাহলে আমি তোমাদের দোষ-ত্রুটি-অন্যায় আচরণ ক্ষমা করে দিব এবং যারা ভালো কাজ সুন্দরভাবে করে তাদের পুরস্কার আরও বাড়িয়ে দিব। [আল-বাকারাহ ৫৮]

কু’রআনে এই কথাগুলো বার বার আসে: সুস্বাদু খাবারের কথা, জীবনকে উপভোগ করার কথা, আল্লাহর ﷻ সৃষ্টি করা এই অত্যন্ত সুন্দর পৃথিবী এবং আকাশ ঘুরে দেখা। আল্লাহ ﷻ আমাদেরকে কু’রআনে বার বার তাঁর অনুগ্রহের কথা চিন্তা করতে বলেছেন, আমাদেরকে হালাল উপায়ে জীবনকে উপভোগ করে আখিরাতে আরও বেশি আনন্দের জন্য চেষ্টা করতে বলেছেন।

কিন্তু কোনো এক অদ্ভুত কারণে অনেক মুসলিমের ভেতরে একটি ধারণা চলে এসেছে যে, যদি একজন আদর্শ মুসলিম হতে চাও, তাহলে আজকে থেকে জীবনের সব আনন্দ ছেড়ে দিয়ে, কোনোমতে চলে–এরকম একটা জীবন-যাপন করো এবং নিজেকে যত পারো কষ্টের মধ্যে রাখো। হাজার হলেও, হাদিসে আছে: “দুনিয়া মু’মিনের জন্য জেলখানা, কাফিরের জন্য বেহেশত।”(তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, সহীহ মুসলিম)

এটি একটি বহুল প্রচলিত ভুল ধারণা যে, একজন আদর্শ মুসলিম হতে হলে জীবনের সব হালাল আনন্দ, সম্পদ অর্জনের সুযোগ, উচ্চতর ডিগ্রি পাওয়ার চেষ্টা – এই সব ছেড়ে দিয়ে, গরিবের মতো জীবন যাপন শুরু করতে হবে। “সবসময় মুখ গম্ভীর করে রাখতে হবে, যেন মানুষ আমাকে দেখলেই বুঝতে পারে আমি একজন খাঁটি ঈমানদার। সস্তা, সাধাসিধে, তালি দেওয়া কাপড় পড়তে হবে, যেন আমাকে দেখলে মনে হয় আমি একজন আদর্শ সুন্নতি বান্দা। পরিবারকে নিয়ে ভুলেও রেস্টুরেন্টে খেতে যাওয়া যাবে না, যতক্ষণ না দেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়ে, সবাই যাকাত দিয়ে, সব গরিব মানুষ সচ্ছল হয়ে না যাচ্ছে। দিনরাত নিজেকে বিভিন্ন ধরনের কষ্টের মধ্যে রাখতে হবে। কারণ যত বেশি কষ্ট, তত বেশি সওয়াব”— এগুলো সবই ভুল ধারণা, যা হাদিসটির বিভিন্ন ধরনের অপব্যাখ্যা থেকে এসেছে। এধরনের অপপ্রচারের কারণে আজকাল মানুষ ‘ইসলাম’ মানেই মনে করে একটি বন্দি, হতাশাকর, বিষণ্ণ জীবন ব্যবস্থা।

এই দুনিয়াতে মানুষের আত্মাকে আল্লাহ ﷻ দেহ নামের এক জেলখানায় ভরে দিয়েছেন। এই জেলখানায় থাকার অনেক নিয়মকানুন আছে। এখানে কিছু কাজ করা নিষিদ্ধ, কিছু কাজ নিয়মিত করা বাধ্যতামূলক। এই নিয়মগুলো দেওয়া হয়েছে জেলখানার সবার ভালোর প্রতি লক্ষ রেখে, জেলখানায় নিয়ম শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য। এই হচ্ছে জেলখানার প্রকৃতি। একজন মু’মিনের কাছে এই ব্যবস্থাকে একটা জেলখানার মতো মনে হতে পারে, কিন্তু এটাই বাস্তবতা এবং সে সেটা মেনে নেয়।

কিন্তু অবিশ্বাসীরা এটা বিশ্বাস করতে চায় না যে, একদিন কিয়ামত হবে, বা মৃত্যুর পরে আর কোনো জীবন আছে। তারা মনে করে: এই দুনিয়াটাই হচ্ছে তাদের বেহেশত— এখানে কোনো নিয়ম নেই, কোনো নিষেধ নেই, যখন যা খুশি তাই করা যাবে। যেহেতু তাদের কাছে এই দুনিয়াটাই হচ্ছে একমাত্র জীবন, এর পরে আর কোনো অস্তিত্ব নেই, তাই তারা এই দুনিয়াটাকে তাদের মতো করে বেহেশত বানিয়ে, যতটুকু সম্ভব আমোদ ফুর্তি করে যেতে চায়। এই দুনিয়ার মতো ক্ষণস্থায়ী একটা জায়গা, যেখানে অসুখ হয়, প্রিয়জনেরা হারিয়ে যায়, পদে পদে নানা কটু কথা, অন্যায় সহ্য করতে হয়–এটাই তাদের শেষ বেহেশত। এর পরে আর কিছু পাওয়ার আশা নেই।

এরকম একটি ধারণা মানুষকে কতখানি হতাশ করে দেয়, সেটা আমাদের মুসলিমদের পক্ষে চিন্তা করাটা কঠিন। একটা মানুষ যখন প্রতিদিন নিজেকে বোঝায়: “একদিন আমি মরে যাবো, আর এই সবকিছু হারিয়ে যাবে, আমার পরিবার আমাকে ছেড়ে চলে যাবে, আর কোনোদিন আমি তাদেরকে পাবো না; আমার সব সম্পত্তি একদিন আমার কাছ থেকে চলে যাবে, আমার অস্তিত্ব একদিন ধ্বংস হয়ে যাবে, আর মাত্র কয়েকটা বছর, তারপর সব শেষ”–কি ভয়ংকর হতাশাকর পরিস্থিতির মধ্যে তাকে জীবনটা পার করতে হয়। সে তখন মরিয়া হয়ে যায় এই জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে যত বেশি করে পারে আনন্দ করে নিতে। তখন সে বন্ধু বান্ধব নিয়ে মরিয়া হয়ে ড্রিঙ্ক করে মাতাল হয়ে যায়। যৌবন শেষ হয়ে গেল, শরীর নষ্ট হয়ে গেল–এই তাড়নায় ছুটতে থেকে অশ্লীল কাজে গা ভাসিয়ে দেয়।

তারপর শরীর এবং মন ভর্তি অসুখ নিয়ে বিভিন্ন ধরনের আসক্তিতে জড়িয়ে পড়ে। একসময় সে এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে, তার ভয়ংকর আসক্তির জন্য এবং জঘন্য সব স্মৃতিকে ভুলে থাকার জন্য নিজেকে অ্যালকোহলে, ড্রাগে বুঁদ করে রাখতে হয়। এদেরকে বাইরে থেকে দেখে অনেক আমোদে আছে, জীবনটা অনেক উপভোগ করছে মনে হলেও, রাতে ঘরে ফেরার পর যখন তারা একা হয়, তখন তাদের উপরে হঠাৎ করে নেমে আসে ভয়ংকর বিষণ্ণতা, অবসাদ এবং হতাশা। তাদের জীবনে আর বড় কোনো গন্তব্য নেই, বড় কোনো উদ্দেশ্য নেই। এই নষ্ট দুনিয়াটাই তাদের শেষ চাওয়া-পাওয়া।

আপনারা যদি পাশ্চাত্যের অমুসলিমদের মুসলিম হওয়ার ঘটনাগুলো পড়েন, দেখবেন তাদের ঘটনায় একটি ব্যাপার বার বার ঘুরে ফিরে আসে: তাদের অনেকেই দিনরাত ফুর্তি করত, ব্যভিচার, মদ ছিল তাদের জীবনে খুবই স্বাভাবিক একটা ঘটনা। শনি-রবিবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে বারে গিয়ে সারারাত ড্রিঙ্ক করে মাতাল হয়ে আসত। তারপর যখন সোমবারে হুঁশ ফিরত, এক ভয়ংকর হতাশা, বিষণ্ণতায় ডুবে যেত। জীবনটা তাদের কাছে অসহ্য মনে হতো। নিজের কাছে নিজেকে একটা পশু মনে হতো। “জীবন কি এটাই? জীবনে কি এর চেয়ে বড় কিছু নেই? এভাবে নিজেকে শেষ করে দিয়ে কি লাভ?”—এই ধরনের প্রশ্ন তাদেরকে পাগলের মতো তাড়িয়ে বেড়াত। তাদের জীবনে কোনো সুখ ছিল না, ছিল কিছু ক্ষণস্থায়ী ফুর্তি। হতাশা, বিষণ্ণতা, অশান্তি এবং নিজেকে শেষ করে দেওয়ার একটা অসহ্য ইচ্ছাকে দমিয়ে রাখার জন্য তাদেরকে দিনরাত নিজের সাথে সংগ্রাম করতে হতো, নিজেকে মদে বুঁদ করে রাখতে হতো।


আল্লাহ ﷻ আমাদেরকে এর ঠিক উল্টোটা করতে বলেছেন। তিনি আমাদেরকে যে জীবন-বিধান দিয়ে দিয়েছেন, সেভাবে জীবন পার করলে এই দুনিয়াতেই আমরা হাসিখুশি থাকতে পারব, নিজের জীবনে, পরিবারে, সমাজে, দেশে শান্তি নিয়ে আসতে পারব। একই সাথে মৃত্যুর পরে অনন্তকাল পরিবার-পরিজন, বন্ধুবান্ধব নিয়ে অনাবিল, অফুরন্ত শান্তিতে জান্নাত উপভোগ করতে পারব। তিনি আমাদেরকে বলেননি এই দুনিয়াতে নিজেদের উপরে ইচ্ছা করে কষ্ট দিতে। বরং তিনি পৃথিবীতে অসংখ্য হালাল আনন্দের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন এবং সেগুলো উপভোগ করার নির্দেশ কু’রআনেই দিয়েছেন—

আল্লাহ তোমাদেরকে এই জীবনে যা দিয়েছেন, তা ব্যবহার করে এর পরের জীবনকে পাওয়ার জন্য চেষ্টা কর, কিন্তু সেই সাথে এই দুনিয়াতে তোমার যে প্রাপ্য রয়েছে, সেটা ভুলে যেও না। অন্যের সাথে ভালো কাজ কর, যেভাবে আল্লাহ তোমাকে কল্যাণ দিয়েছেন। এই পৃথিবীতে দুর্নীতি ছড়ানোর চেষ্টা করবে না। দুর্নীতিবাজদের আল্লাহ পছন্দ করেন না! [আল-কাসাস ২৮:৭৭]


বল, “কে তোমাদেরকে আল্লাহর সৃষ্ট সৌন্দর্য এবং ভালো-পবিত্র খাবার উপভোগ করতে মানা করেছে, যা তিনি তার বান্দাদের জন্যই তৈরি করেছেন?” বলে দাও, “এগুলো তাদেরই জন্য যারা এই দুনিয়াতে বিশ্বাস করে: কিয়ামতের দিন এগুলো শুধুমাত্র তাদেরই হবে।” এভাবেই আমি আমার বাণীকে পরিষ্কার করে দেই বুদ্ধিমান লোকদের জন্য। [আল-আরাফ ৭:৩২]


ও প্রভু, আমাদেরকে এই দুনিয়াতে কল্যাণ দিন এবং আখিরাতেও কল্যাণ দিন। আর আমাদেরকে আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা করেন। [আল-বাকারাহ ২:২০১]

উপরের আয়াতগুলো এবং বাকারাহ-এর আলোচ্য আয়াতের মূলকথা একটাই: জীবনকে উপভোগ করতে হবে আল্লাহর প্রতি অনুগত থেকে, কৃতজ্ঞ থেকে এবং পাপের ব্যাপারে সবসময় সাবধান থেকে। মনে রাখতে হবে, দুনিয়াতে আমরা যা কিছুই উপভোগ করব, কিয়ামতের দিন সেগুলোর সবকিছুর হিসাব দিতে হবে। সুতরাং আমরা যেন উপভোগ করতে গিয়ে আল্লাহর ﷻ অবাধ্য না হই। এমন কিছু যেন করে না ফেলি, যেটা কিয়ামতের দিন আমাদেরকে দেখানো হলে আমরা লজ্জায় কিছু বলতে পারব না।

আমরা পৃথিবীতে আল্লাহর ﷻ তৈরি সৌন্দর্য, ভালো-পবিত্র খাবার যখন ইচ্ছে উপভোগ করতে পারি, যদি সেটা আল্লাহর ﷻ প্রতি অনুগত অবস্থায়, তাঁর দেওয়া নিয়মের মধ্যে থেকে করি, এবং একই সাথে আমরা যে সবসময় ভুল করছি, সেটার জন্য তাঁর কাছে ক্ষমা চাই। এরকম বিনীত, কৃতজ্ঞ অবস্থায় পৃথিবীতে আল্লাহর ﷻ অসাধারণ অনুগ্রহগুলো পরিমিতভাবে উপভোগ করে, জান্নাতে গিয়ে অনন্তকাল আনন্দ করার চেষ্টার মধ্যে কোনোই বাধা নেই

(সোর্স এবং আরো বিস্তারিত দেখুন এখানে- উস্তাদ নুমান আলী খানের তাফসীরের প্রেরণায় বাংলা ভাষায় অসাধারণ এই সাইট থেকে - http://quranerkotha.com/baqarah-58/ )

0 comments
Labels: , , ,

আজকে "ব্লগার" একটি গালি! ধার্মিক মানেই মৌলবাদী, সন্ত্রাসী! মুক্তমনা মানেই ভন্ড।

বাংলাদেশী অনলাইন জগতে এখন সবচেয়ে আলোচিত শব্দ হচ্ছে "মুক্তমনা।" একদল লোক শব্দটিকে গালি বানিয়ে দিয়েছে। তাদের কাছে মুক্তমনা মানেই কাফের, নাস্তিক, এদের ফাঁসি চাই। আরেকদল নিজেদের মুক্তমনা দাবি করে নিজেদের মনের পারভার্টনেস, গালাগালি, মস্তিষ্কের পায়খানা ইত্যাদি বের করে এনে অনলাইন জগৎকে দূষিত করছে। আজকে হঠাৎ করেই মনে হলো, এ নিয়েই কিছু কথা বলে ফেলি।
তাহলে একটু ঘুর পথেই মূল বিষয়ে যাওয়া যাক।

মত প্রকাশের অধিকার মানুষের জন্মগত অধিকার। মায়ের পেট থেকে সে স্বাধীন হয়েই বের হয়। তাঁকে কেউ পরাধীন বানালে সেটা মানুষ বানায়, প্রকৃতি নয়। জন্মের পর থেকেই নানান অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে সে বড় হতে থাকে। তাঁর মস্তিষ্কের ব্ল্যাংক হার্ডডিস্কে ধীরে ধীরে নানা তথ্য জমা হতে থাকে। এবং অতি স্বাভাবিক কারনেই তাঁর মনে নানান বিষয়ে নানান সময়ে নানান প্রশ্ন জেগে উঠে। কিছু কিছু বিষয়ে তাঁর একান্ত নিজস্ব মত সৃষ্টি হতে থাকে। এবং এই প্রশ্ন করার অধিকার, এবং কোন বিষয়ে মত প্রকাশের অধিকারটাই তাঁর জন্মগত অধিকার। আমাদের কাউকে ক্ষমতা দেয়া হয়নি সেই অধিকার দাবিয়ে রাখার।

এখন সেই মত প্রকাশের বা প্রশ্ন করার মাঝে একটা শালীনতা, একটা পরিমিতি বোধ থাকা প্রতিটা মানুষেরই উচিৎ। আমার হাতে রাইফেল ধরিয়ে দিলেই আমি গুলি করে যাকে তাকে মেরে ফেলতে পারিনা। এইটুকু বিবেক বোধ আমার থাকাটা জরুরী।যখনই কেউ সীমা অতিক্রম করে, তখন সেটা আর মুক্তমন থাকেনা, ফাজলামি হয়ে যায়। এখন আমাদের দেশে ঠিক যেটা চলছে।
ব্যাখ্যা করলে কিছুটা স্পষ্ট হবে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যৌবনে বাংলা সাহিত্যের প্রথম ও শ্রেষ্ঠ মহাকাব্য মেঘনাদবধ কাব্যের সমালোচনা করতে গিয়ে তাঁর "ব্লগের" উপসংহারে লিখেন, "ইহা আসলে কোন মহাকাব্যই নয়।"এখন মাইকেলের ভক্তেরা যদি রবীন্দ্রনাথের উপর ক্ষেপে গিয়ে ব্লগিং শুরু করে দেন যে "এই শালা বউদির সাথে প্রেম করে, যেখানে সেখানে প্রেম করে, লুইচ্চা ব্যাটা মহাকাব্যের কী বুঝে?" এবং অফ টপিক সমালোচনা, ব্যক্তিগত আক্রমন। সেটা আর মত প্রকাশ থাকেনা, মুক্তমনেরতো ধারে কাছেও যায় না। এইটাই ফাজলামি। আসল মুক্তমনারা রবীন্দ্রনাথের সাথে সুস্থ আলোচনায় বসবে, এবং যদি আলোচনা ফলপ্রসু না হয় তাহলে যে যার বিশ্বাস নিয়ে স্থির থাকবে। তবু ভদ্রতার সীমা অতিক্রম করবে না।
কথা প্রসঙ্গে বলে ফেলি, শেষ বয়সে রবীন্দ্রনাথ বুঝতে পেরেছিলেন যৌবনে তিনি কী ভুলটাই না করেছিলেন। তিনি তাই নিজের সমালোচনা করে বলেছিলেন, মেঘনাদবধ কাব্যের মাহাত্য বুঝার মত বয়স তখন তাঁর ছিল না।
এমনি এমনি কেউ "কবিগুরু" হয়না। বিশাল একটা কলিজা থাকা লাগে।
এখন সরাসরি পয়েন্টে আসি।

আজকাল মুক্তমনার ছদ্মবেশে মানুষ ধর্মকে সরাসরি আক্রমন করছে। ধর্মীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লেখালেখি এক বিষয়, আর ফাজলামি ভিন্ন। দেশে এখন ফাজলামি চলছে বেশি। যেমন, কেউ যদি হিন্দু ধর্মের গোড়ামির সমালোচনা করতে চায়, সে বর্ণ প্রথা নিয়ে সমালোচনা করুক। "বিধবা নারীর বিবাহ শাস্ত্র সিদ্ধ নয়," "সতিদাহ প্রথা মহাপুন্যের," "ব্রাক্ষণের সঙ্গে যৌন মিলনে পাপ নেই" - ইত্যাদির বিরুদ্ধে বলুক। এবং তারচেয়ে বড় কথা, নিজে সেটা পালন করুক।
কিন্তু কৃষ্ণ, রাম, শিবদের নামে খিস্তি গাওয়ার কী মানে?এর মানে একটাই, তাদের মূল উদ্দেশ্য সমাজ সংস্কার নয়, তাদের মুখ্য উদ্দেশ্য উস্কানি।ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যা সাগর নিজের পুত্রের বিয়ে এক বিধবা নারীর সাথেই দিয়েছিলেন। যতদূর জানি, ঈশ্বর চন্দ্র কোন লেখায় কোন ধর্মকে আক্রমন করে কিছু লিখেননি।

তাই আমরা দেখতে পাই, "মুক্তমনার" দাবি তোলা এইসমস্ত ব্লগাররা কখনই সমাজ বদলের জন্য তেমন মুখ্য ভূমিকা রাখেননা। তারা অনলাইনে গালাগালি আর উস্কানি নিয়ে ব্যস্ত। সোমালিয়ায় একটি এতিম শিশুকে দেখভাল করতে মাসে মাত্র তিরিশ ডলার লাগে। আমি নিশ্চিত বাংলাদেশে খরচ এর কাছাকাছিই হবে। কখনই দেখবেন না এইসব মুক্তমনাদের এইসব এতিম শিশুদের দেখভাল করতে।

আমি একবার এক মানবতাবাদী মুক্তমনাকে দেখেছিলাম রিক্সাওয়ালাকে ঠাস করে চড় মারতে। কারন সে ন্যায্য ভাড়ার চেয়ে পাঁচ টাকা বেশি চেয়েছিল। রিক্সাওয়ালার যুক্তি, সেদিন গরম বেশি ছিল।
মানুষের প্রতি মমতা এদের অনলাইন জগতেই সীমাবদ্ধ। আর পশুপাখির প্রতিতো নেই বললেই চলে।
এক সাইকোকে চিনতাম যে ক্ষধার্ত কুকুরের উপর গরম পানি ঢেলে দিয়ে খুব মজা পেত। চামড়া ঝলসে যাওয়ার যন্ত্রনায় কুকুরের চিত্কার শুনতে তার খুব ভাল লাগতো। সেই কিনা আবার নিজেকে মুক্তমনা দাবি করে মাঝে মাঝে স্ট্যাটাস দেয়।

তবে যারা আসলেই মানবতাবাদী, তাঁরা ফালতু খিস্তি আওরান না। তাঁদের মানসিকতাই ভিন্ন। এরাই অ্যাগনস্তিক, মানে হচ্ছে লজিক্যাল এবং তারচেয়েও ভদ্র, নাস্তিক। মোটেও ফাজিল নয়। আমার বন্ধু তালিকায় এদের সংখ্যা প্রচুর।
আর এইদিকে সেসব উস্কানিমূলক লেখা পড়ে মুমিন মুসলমানের রক্ত টগবগিয়ে ফুটে। তারা ঝাপিয়ে পড়ে মানুষ খুনের কাজে। এমন ভাব যেন ইসলাম বিপন্ন, এরা না মরলে ইসলামের সম্মান ধুলায় লুটাবে। নারায়ে তাকবির! আল্লাহু আকবার!

আহারে মুসলিম! আল্লাহর উপর এই তোদের ভরসা! এই তোদের রাসুলের নির্দেশ মেনে চলা?
এর ফলে পরিচিতি পাচ্ছে ইসলাম একটি সন্ত্রাসী ধর্ম। মুসলিম মানেই সন্ত্রাসী!
এদের কিছু বুঝাতে যাবেন, আপনি হবেন কাফির। আপনিও হবেন নাস্তিক।
একদিকে তথাকথিত মুক্তমনা, অন্যদিকে এইসমস্ত মূর্খ মৌলবাদী - আমাদের অবস্থা পিষ্ট হওয়া মরিচের থেকেও দফারফা।
এইবার আসা যাক আসল পয়েন্টে।

বিরাট সংখ্যক মুসলমানদের একটা বিশ্বাস আছে যে আমাদের ধর্মকে কোন রকম প্রশ্ন করা যাবেনা। যা আছে, চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করতে হবে। কারন ঈমানের আভিধানিক অর্থই বিশ্বাস। এবং ইসলাম শব্দের অর্থ আত্মসমপর্ন। নবীজি (সঃ) যা বলেছেন, আল্লাহ যা বলেছেন, চোখ বন্ধ করে আত্মসমর্পণ করে ফেলার নামই ঈমান।
কিন্তু কিউরিয়াস মন মাঝে মাঝেই জানতে চায়। এটা কেন হলো? ওটা কেন হলো? এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই প্রশ্ন করার অধিকার কী ইসলাম আমাকে দিচ্ছে? উত্তর হচ্ছে, আপনার পাড়ার মোল্লা হয়তো নাও দিতে পারেন, ইসলাম কিন্তু সেই অধিকার দিচ্ছে।
উদাহরণ দিচ্ছি।

আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালুলের নাম কেউ কেউ হয়তো শুনেছেন। এই লোকটাকে বলা হতো মুনাফেক সর্দার। এক নম্বরের বিশ্বাসঘাতক। এই সেই শয়তান যে আরও অনেক অপকর্মের পাশাপাশি হজরত আয়েশার (রাঃ) নামে কুৎসা রটিয়েছিল। মানে নবীজির (সঃ) তার পারসনালপার্সোনাল শত্রুতা থাকার যথেষ্ট কারন ছিল।যেদিন সে মারা গেল, এবং সেটি ছিল ন্যাচারাল ডেথ, কোন কোপাকোপি নয়; নবীজি (সঃ) গেলেন তার জানাজায়। তিনি নিজে তার কবরে নেমে তাকে মাটিতে শুইয়ে দিলেন। নিজের গায়ের কাপড় দিয়ে তার কাফন জড়ালেন। যদি কোন বাহানায় আল্লাহ এই মুনাফেককে মাফ করেন!

ছোট নোট, নবীজির এই ক্ষমার বৈশিষ্ট্য মুক্তমনা কিংবা মৌলবাদী সন্ত্রাসীদের কারও নজরে পরবে না। এরা কাব বিন আশরাফ কাব বিন আশরাফ বলে লাফাতে থাকবে। বিরক্তিকর!  ছিদ্রান্বেষী না হয়ে যদি কেউ সত্যান্বেষী হতো, তাহলে অবশ্যই তাদের চোখে পড়তো।

তা যা বলছিলাম, নবীজির (সঃ) এহেন কর্মে অবাক হয়ে এক সাহাবী প্রশ্নই করে বসলেন, "হে আল্লাহর দূত! আল্লাহ কী আপনাকে নিষেধ করেননি এদের জন্য ক্ষমা চাইতে?"নবীজির কর্মকান্ডে প্রশ্ন করার সাহস কারোরই ছিল না। একজন বাদে। হজরত উমার(রাঃ)। যিনি ছিলেন "আল ফারুক" - সত্য মিথ্যার প্রভেদকারী। নবীজি (সঃ) তখন উত্তরে বললেন, "ইয়া উমার(রাঃ)। আল্লাহ আমাকে বলেছেন তুমি যদি সত্তুরবারও ওদের জন্য ক্ষমা চাও, তবুও আমি মাফ করবো না। তাই আমি একাত্তুরবার ক্ষমা চাইবো। যদি তিনি মাফ করেন!"
তাহলে এই ঘটনায় আমরা কী পাই? নবীজিকেও প্রশ্ন করা যায়। কেন এমন হচ্ছে? অমন কেন হচ্ছে না?
আরেকটা উদাহরণ লাগবে?

হুদায়বিয়ার সন্ধি। এখানেও প্রশ্নকর্তা সেই একই ব্যক্তি, উমার(রাঃ)।
"আপনি কী রাসূল নন? আমরা কী সৎপথে চালিত নই? ওরা কী জুলুমকারী নয়? তাহলে কেন সন্ধির এই অপমানজনক শর্তগুলো মেনে নিলেন? একে বিজয় বলছেন? কিভাবে?"
এক গাদা প্রশ্ন! বা সেই সাহাবিকেই বা আমরা কিভাবে ভুলে যাই যিনি নবীজিকে গিয়ে বলেছিলেন, "আমাকে ব্যাভিচারের অনুমতি দিন। আমি এবং মেয়েটি যদি পরস্পরের সম্মতিক্রমে ব্যভিচারে লিপ্ত হই, তাহলে কেন সেটি পাপ হবে?"কথা হচ্ছে, তিনি কী একবারও প্রশ্ন শুনে কাউকে কোপানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন?

এই গেল নবীজি। আপনারা কী জানেন আল্লাহকে পর্যন্ত প্রশ্ন করা যায়?
আদম সৃষ্টির ইচ্ছা প্রকাশ করলে ফেরেস্তাদের রিয়েকশন কী ছিল? "কেন আপনি ওদের সৃষ্টি করতে যাচ্ছেন? ওরাতো পৃথিবীতে গিয়ে ঝামেলা ছাড়া আর কিছুই করবেনা। আপনার ইবাদতের জন্য কী আমরাই যথেষ্ট নই?"
জ্বী, প্রশ্ন করার অধিকার ইসলামে আছে। তাই কেউ প্রশ্ন করলেই মারতে তেড়ে যাবেন না। নিজের সর্বোচ্চ বিদ্যা দিয়ে বুঝাবেন। না পারলে ক্ষমা চেয়ে নিবেন, এবং নিজেও সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা নিবেন। এতে আপনার নিজের জ্ঞান বাড়বে। কুপিয়ে দিলে জাহান্নামের খাতায় নিজের নামটা লেখানো ছাড়া আর কিছুই লাভ হবেনা।
এবং কে বলেছে ইসলাম ধর্ম নিয়ে কখনও কিছু লেখা যাবেনা?

আপনি ইসলাম ধর্মে প্রচলিত নানান কুসংস্কারের বিরুদ্ধে কথা বলুন, সমস্যা কী? আমি নিজে কী বলছি না? পীর ব্যবসা, পীর পূজা, কবর পূজা, মাজার ব্যবসা, ঝারফুক থেকে শুরু করে ধর্মের নামে কুপিয়ে মানুষ হত্যা - সবকিছুর বিরুদ্ধেইতো লিখছি। ইসলামী রেফারেন্স দিয়ে দিয়েই লিখছি। কেউ আসুক প্রমান নিয়ে, ভুল ধরিয়ে দিক। আমি তাহলে নিজের কথা ফিরিয়ে নিব। সেটা মুক্তমনা হোক, বা কাঠমোল্লা।

আমাদের বাঙালিদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, আমরা আমাদের ভদ্রতার স্ট্যান্ডার্ড দিন দিন একদম পাতালে নামিয়ে আনছি। একটা সময়ে কেবল ভদ্রজনেরাই লেখালেখি করতেন। আফসোস! আজকে "ব্লগার" একটি গালি! আগে ধার্মিকদের দিকে মানুষ শ্রদ্ধার সাথে তাকাতো। আজকাল ধার্মিক মানেই মৌলবাদী, সন্ত্রাসী! 
Written by: মঞ্জুর চৌধুরী 

0 comments
Labels: , ,

উগ্রবাদিতার স্থান ইসলামে নেই

একটা ঘটনা বলি। ঘটনাটি বিখ্যাত ইসলামিক স্কলার ওস্তাদ নোমান আলী খানের নিজ কন্ঠ থেকে আমার শোনা। তাঁর গল্পে বিশ্বাস করাই যায়।

নবীজি(সঃ) তখন পূর্ণোদ্দমে ইসলাম প্রচার করছেন। দিকে দিকে সাহাবীদের দিয়ে শাহাদাতের বাণী পাঠিয়ে দিয়েছেন। মসজিদে নববীতে তাঁর অফিস।

শেষ নবীর আবির্ভাবের খবর পেয়ে একদল খৃষ্টান পুরোহিত তাঁর সাথে দেখা করতে এলো। দেখা করতে আসার মূল উদ্দেশ্য আসলে ঠিকমত যাচাই বাছাই করে দেখা যে ইনিই কি তাঁদের বাইবেলে বর্ণিত 'আসল নবী' কিনা।
নবীজি(সঃ) তাঁদের স্বানন্দে অভ্যর্থনা জানালেন। তিনি তাঁদের থাকার ব্যবস্থা মসজিদে নববীতেই করলেন। এখানে point to be noted, তাঁর সাথে দেখা করতে আসা বেশিরভাগই কিন্তু খৃষ্টান পুরোহিত। মানে তাঁরা সবাই যীশুর (ঈসা (আঃ)) পূজা করেন। তাঁদের মসজিদে নববীতে স্থান দেয়ার মানে তাঁরা মসজিদের ভিতরেই পূজা করবে।
এমন সর্বনাশা অনুমতি কে দিলেন?

স্বয়ং হযরত মুহাম্মদ, সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
আরেকটা ঘটনা বলি। এইটি আরেকজন ইসলামিক স্কলার, মুফতি মেঙ্কের কাছ থেকে শোনা। ইনি এতই বড় স্কলার যে স্বয়ং নোমান আলী খানও তাঁর ভক্ত। তাঁর রেফারেন্সের উপরে নিঃসন্দেহে ভরসা করা যায়।
একবার নবীজি(সঃ) ও সাহাবীদের আলোচনাকালে এক বেদূইনের পেশাবের বেগ পেল। আরব বেদূইনরা জংলি কিসিমের হয়ে থাকে। ভদ্রতার ধার ধারে না।

সে আলোচনা থেকে উঠে গিয়ে মসজিদের ভিতরেই এক কোণে গিয়ে পেশাব করতে শুরু করে দিল।
সাহাবীরা হায় হায় করে উঠলেন। মসজিদে নববীতে পেশাব মানেতো ইসলামের অপমান! তাঁরা তেড়ে গেলেন বেদূইনকে মারতে। হযরত মুহাম্মদ (সঃ) সাথে সাথে তাঁদের বাঁধা দিলেন। তিনি বেদূইনকে অভয় দিয়ে বললেন, সে যেন তাঁর কাজ শেষ করে।

প্রাকৃতিক ডাক এমন একটা বিষয় যা মাঝপথে উঠে আসা সম্ভব নয়। বেদূইন ঘাবড়ে গিয়েছিল। নবীজির(সঃ) অভয়বাণীতে আশ্বস্ত হয়ে সে ধীরে সুস্থে তাঁর প্রাকৃতিক কর্ম সম্পাদন করে।
তাঁর কাজ শেষ হলে নবীজি(সঃ) সাহাবীদের বলেন পানি এনে স্থানটি ভাল মত ধুয়ে ফেলতে।
তারপর তিনি বেদূইনকে বুঝালেন যে মসজিদ মুসলমানদের জন্য একটি পবিত্র স্থান। এখানে পেশাব পায়খানা করা যায় না।

Another point to be noted, নবীজির (সঃ) উপস্থিতিতেই একজন মসজিদে পেশাব করলো। নবীজি তাঁকে বিন্দুমাত্র শাস্তি দিলেন না। বরং ধৈর্যের সাথে তাঁর অজ্ঞতা দূর করলেন।
এখন আসি মূল প্রসঙ্গে।
বাংলাদেশে কয়েকটা ঘটনা সিজনালি(মৌসুমী) ঘটে।
শীতকালে শৈতপ্রবাহে গরীব মানুষ মরে।
বর্ষায় দেশ বন্যায় ডুবে যায়।
ক্রিকেট টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ দলের ভরাডুবির ঘটে।
তেমনি পূজার মৌসুমে মন্দির ভাংচুর হয়।

এখন উপরের দুই ঘটনা পড়ার পর আমাদের মনে কী প্রশ্ন জগতে পারে?
যারা মন্দির ভাংচুর করে, তারা কী নিজেদের নবীজির (সঃ) চাইতেও বেশি ধার্মিক মনে করে?
উগ্রবাদিতার স্থান ইসলামে নেই। আল্লাহ নিজেই বলেছেন কেউ যদি অন্য ধর্মের অনুসারী হয়ে থাকে, তাকে তার মত ছেড়ে দিতে।

এরা দেখি আল্লাহর কথাকেও পাত্তা দেয় না!
নবীজি(সঃ) এদের ব্যপারেই বারবার সাবধান করে বলেছিলেন, "কাফিররা ইসলামের যত না ক্ষতি করবে, তারচেয়ে বেশি ক্ষতি এরা করবে।"

আরেকটি হাদিসে নবীজি(সঃ) এদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছিলেন, "ওদের দেখলে তোমাদের মনে হবে এরা বিরাট ধার্মিক, আসলে তারাই পথভ্রষ্ট।"

যারা ধ্বংসের মাধ্যমে 'শান্তির' পথ খুঁজে, তাদের জন্যই আজকে বিশ্বে মুসলমানদেরকে 'সন্ত্রাসী' বলা হয়ে থাকে। অ্যামেরিকান এয়ারপোর্টে কারও নামের আগে পিছে 'আহমদ' বা 'মোহাম্মদ' থাকলে তাঁদেরকে একটু বেশি সুক্ষ্মভাবে সিকিউরিটি চেক করা হয়। সে যেই হোক না কেন। নবীজির (সঃ) নামের এই বদনামের জন্য শুধু এবং শুধুমাত্র এইসব মাথামোটা ছাগলগুলাই দায়ী।

বাংলাদেশে যে এখন দলে দলে মানুষ ইসলাম ত্যাগ করছে, তাদের জন্য নাস্তিকদের গালাগালি না করে এইসব উগ্রবাদীদের ধরে পেটানো উচিৎ।

লতিফ সিদ্দিকীর আজাইরা প্রলাপে আমাদের যেমন হৃদপিন্ড কাঁপে, ঠিক তেমনি মন্দির ভাংচুরে হিন্দুদেরও কলিজা ছিড়ে যায়।

একটি পিপড়ার মনেও কষ্ট দিলে যেখানে আল্লাহ শাস্তির ওয়াদা করেছেন - সেখানে এরা মানুষের মন ছিন্নভিন্ন করে!
আফসোস! যদি এদের একটুও জ্ঞান হতো!

Post written by:মঞ্জুর চৌধুরী

0 comments
Labels: , ,

‘জিহাদী মুসলিম’

"তুই ঐ কাফির নাছারাদের দেশে পড়ে আছিস কেন?"

অ্যামেরিকাপ্রবাসী জাকির অফিসের কাজের ফাঁকে বাংলাদেশনিবাসী বন্ধু সোহেলের সাথে চ্যাট করছিল।
বন্ধুর কথায় সে একটু নড়েচরে বসে।

"কেন বন্ধু? এই দেশে সমস্যা কী? ওরাতো আমার দাড়ি শেভ করতে বলছে না। আমার স্ত্রীকে হিজাব পড়তে নিষেধ করছে না। পাঁচওয়াক্ত নামাজ পড়তে কেউ বাঁধা দিচ্ছে না। এমনকি কাজ থেকে ব্রেক নিয়ে জুম্মার নামাজ পড়তেও আমার কোন সমস্যা হয়না। ঠিকঠাকমত রোজা রাখতে পারি, ঈদের জামাতও মিস হয়না। তাহলে শুধু শুধু ওদের গালি দিব কেন?"

সোহেল বোধয় জবাব শুনে হাসলো। সে লিখলো, "আমাদের মুসলমানদের এই এক সমস্যা। অল্পতেই খুশি। গাধার সামনে মূলা ধরার মতন। আরে, ওরা যে আমাদের মুসলিম ভাইদের মেরে সাফ করে দিচ্ছে, ইরাক, ফিলিস্তিন, আফগানিস্তান ধ্বংস হয়ে গেল, এসব কিছুই তোদের চোখে পড়েনা? শুধু জামাতে নামাজ পড়তে দিয়েছে বলেই খুশিতে লেজ নাড়তে শুরু করে দিয়েছিস? নাইন ইলেভেনে তোদের বুক পুড়ে, অথচ গাজায় যে প্রতিদিন নাইন ইলেভেন হচ্ছে, সে নিয়ে তোরা নিরব। ধিক তোদের ঈমানে!"

জাকিরের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। একটা জরুরি ফাইল নিয়ে কাজ করছিল। আপাতত ফাইলটা ক্লোজ করে রাখলো। সোহেলকে কিছু কথা না শোনালে ঠিকমতন মনোযোগ দিতে পারবেনা।

"তোর ফোন নম্বরটা দে।"
"কেন?"
"কথা আছে।"
সোহেল নম্বর দিল।
জাকির অফিস ম্যাসেঞ্জারে 'ইন আ মিটিং' স্ট্যাটাস দিয়ে ডেস্কটপ লক করে ব্রেক রুমে চলে এলো।
"হ্যালো।"
"হ্যালো বন্ধু, কি ব্যপার? হঠাৎ ফোন দিলি যে?"
"তোর সাথে কথা বলার জন্য। চ্যাটে টাইপ করলে কথাগুলি ভালমত এক্সপ্লেইন নাও করতে পারি।"
"এতে এক্সপ্লেইন করার কী আছে?"
সোহেল জাকিরের কথা উড়িয়ে দিল।

"বিদেশে গিয়ে আরাম আয়েশে থেকে তোরা দ্বীনের রাস্তা থেকে সরে গেছিস। মুসলিম মায়ের অশ্রুতে তোদের কলিজা কাঁপে না, মুসলিম ভাইয়ের রক্তে তোদের চোখ ভিজে না। তোরা দামী গাড়ি, দামী বাড়িতেই সুখী। আর অন্যদিকে ইরাকে আমাদের মুজাহিদ ভাইয়েরা দ্বীনের জন্য প্রাণ দিচ্ছে। জিহাদ চলছে ফিলিস্তিনে, আফগানিস্তানে, কাশ্মিরে, পাকিস্তানে। আর তোরা ইসলামের দুশমনদের গোলামী করছিস!"
জাকির বলল, "তোকে একটা গল্প শুনাই। সহীহ হাদিস। হুনেইয়ের যুদ্ধের ঘটনা।"
সোহেল উদাস স্বরে বলল, "শোনা..."

সোহেলের কন্ঠস্বরে মনে হলো সে শুনতে আগ্রহী না। তবু জাকির শুরু করলো,
"হুনেইয়ের যুদ্ধ জয়ের পর রসূলুল্লাহ (সঃ) যখন গণিমতের মাল বন্টন করছিলেন, তখন এক আরব বেদূইন এসে সরাসরি তাঁকে এই বলে অভিযুক্ত করে যে তার সাথে অন্যায় করা হয়েছে। রাসূল (সঃ) ন্যায্য দাবী আদায়কারী নন। সে নবীজির(সঃ) নাম উচ্চারণ করে বলেছিল,“আল্লাহকে ভয় পান, এবং ন্যায় বিচার করুন!”
"আস্তাগফিরুল্লাহ!"
সোহেল ক্ষেপে গিয়ে ইস্তেগফার করে উঠলো।

জাকির বলল, "ঠিক। রাসূলের (সঃ) সাথেকার সাহাবীরাও তোর মতই রেগে উঠেছিলেন। কিন্তু নবীজি (সঃ) ধৈর্য্যের সাথে বললেন, 'খোদ বিশ্বজাহানের মালিকের যেখানে আমার বিচারের উপর আস্থা আছে, সেখানে তুমি আমাকে অন্যায়কারী বলছো?'"
বেদূইন নবীজিকে(সঃ) গালাগালি করে চলে গেল।

সাহাবীরা চাইলেন লোকটিকে উপযুক্ত সাজা দিতে। নবীজি (সঃ) বললেন, "ওকে যেতে দাও। ওকে হত্যা করলেও ভবিষ্যতে ওর মতই আরও অনেকে আসবে। তাদের দেখলে খুব ধার্মিক বলে মনে হবে, কিন্তু আসলে তারা পথভ্রষ্ট। আমার জীবিতাবস্থায় তারা যদি আত্মপ্রকাশ করে, তবে আমিই তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করবো, এবং তাদের সেভাবেই ধ্বংস করবো, যেভাবে আদ্ব জাতিকে আল্লাহ ধ্বংস করেছিলেন। তোমরা তাদের থেকে সাবধান থেকো।"
নবীজি (সঃ) এরকম দশটিরও বেশি সহিহ হাদীছে তাদের বিরুদ্ধে সাবধান করে গেছেন। কেন? কারন তারা কাফেরদের চেয়েও ইসলামের বেশি ক্ষতি করবে।"

সোহেল বলল, "তুই কী বলতে চাস?"
জাকির বলল, "বলছি, তবে তার আগে তোকে আরেকটা ইসলামী ঘটনা শুনাতে চাই। তোর সময় আছেতো?"
সোহেল বলল, "কোরআন হাদীছে শোনার সময় হবেনা? কী ভাবিস তুই আমাকে?"
"গ্রেট! হযরত আলী(রাঃ) এবং মোয়াবিয়ার মধ্যকার কনফ্লিক্টের ঘটনা তুই জানিস?"
"জানবোনা কেন?"

"গুড! তাঁদের মধ্যকার আসল ঝামেলাটা ছিল রাজনৈতিক, ইসলামিক নয়। কাজেই হযরত আলী (রাঃ) সিদ্ধান্ত নিলেন দুইনেতা একসাথে বসে ঝামেলা মিটিয়ে ফেলবেন। এতে সাধারণ মুসলিমরা খুশি হলেও ছয় হাজার মুসলমানের একটা দল হযরত আলীকে(রাঃ) গালাগালি দিয়ে দলত্যাগ করলো। তাদের দাবী ছিল, হযরত আলী(রাঃ) মোয়াবিয়ার সাথে শান্তি স্থাপনের আলোচনায় রাজী হয়ে ইসলামের পথ থেকে সরে গিয়েছেন। মানুষ কোন সমস্যার সমাধান করতে পারবেনা, শুধুমাত্র কুরআনের সেই অধিকার আছে।"

ওরা এতটাই ধর্মান্ধ হয়ে গিয়েছিল যে তারা ইসলামের চুতুর্থ খলিফাকে 'কাফির' গালি দিতেও দ্বিতীয়বার চিন্তা করেনি।
ওদের একজনতো আবার প্রস্তাব করেছিল আলীকে (রাঃ) হত্যা করবে!"
সোহেল এবারে গালি দিল।

জাকির বলল, "কিন্তু হযরত আলী (রাঃ) কী করলেন? তাদের যেতে দিলেন। বললেন, ‘তোমরা তোমাদের নিজেদের মসজিদ বানাও, নিজেদের মত ধর্ম পালন কর। আমাদের কারও ক্ষতি না করা পর্যন্ত তোমাদের কোন ক্ষতি আমরা করবো না।’ পয়েন্ট হচ্ছে, হযরত আলীও (রাঃ) কিন্তু নবীজির (সঃ) মতন তাদের যেতে দিয়েছেন। হত্যার হুকুম দেন নাই।"

সোহেল বলল, "তারপর কী হলো?"
"ওরা আলাদা হয়ে গেল। ওরাই ইসলামের প্রথম ভাঙ্গন ঘটায়। শিয়া-সুন্নি ভেদেরও আগে তারাই মুসলমানদের মধ্যে প্রথম বিভক্তি টানে। হযরত আব্বাস (রাঃ) পরে গিয়ে তাদের সাথে কথা বলেন এবং তাদের সাথে পথভ্রষ্ট এক তৃতীয়াংশ লোককে ফিরিয়েও আনতে সক্ষম হন। কিন্তু আরও চার হাজার লোক ঠিকই থেকে যায়।"
"তারা কী করে?"

এবারে সোহেলের কন্ঠে কৌতূহল টের পাওয়া যায়।
জাকির বলে, "তারা হযরত আলীর (রাঃ) সাথে থেকে যাওয়া মুসলিমদের সমালোচনা করতে থাকে। বিদ্রুপ করতে থাকে। বিভিন্ন জায়গায় হ্যারাসও করতে থাকে। একবার তারা একজন সাহাবীকে স্বপরিবারে জবাই করে হত্যা করে। কারন? তিনি বলেছিলেন, ‘হযরত আলী (রাঃ) নিঃসন্দেহে আমার এবং তোমার চেয়ে ধর্ম বেশি ভাল জানেন।’"
সোহেল এইবারও গালি দেয়।

জাকির বলে, "মজার ব্যপার কি জানিস? সাহাবী হত্যা করে ফেরার পথে দলের একজন একটি বাগানের আঙ্গুর গাছ থেকে বিনা অনুমতিতে একটি আঙ্গুর পেড়ে খেয়েছিল, এবং আরেকজন একটি খৃষ্টানের গৃহপালিত শুকর হত্যা করেছিল বলে সেই দলেরই সবাই ওদের তিরষ্কার করে। ওদের কথা হচ্ছে বিনা অনুমতিতে অন্যের সম্পদ থেকে একটি আঙ্গুর পেড়ে খাওয়াও গুনাহ, এবং অন্যের গৃহপালিত জানোয়ার হত্যাতো আরও বড় গুনাহ! তারা বাগান এবং শূকরের মালিককে ডেকে ক্ষমা চায়, এবং ক্ষতিপূরনও দেয়। ওদের এই কাজ দেখলে যে কেউ ভাববে তারা বিরাট ধার্মিক! কিন্তু মাত্রই যে তারা সাহাবী হত্যা করে এসেছে, সেটাকে কী বলবি? তাদের ফলোয়াররা কিন্তু সেটাকেও জাস্টিফায়েড মনে করে।"

"তুই কী বলতে চাস?"
"আমি বলতে চাই, কোন কিছুতেই এক্সট্রিম হওয়া উচিৎ না। আমি তোকে নবীজির (সঃ) ভবিষ্যতবাণীর কথা বললাম, তোকে হযরত আলীর (রাঃ) জীবনের ঘটনাও বললাম। একটা জিনিস লক্ষ্য কর, না নবীজি (সঃ), আর না আলী(রাঃ) তাঁদের মতবিরোধ করায় কাউকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কারা প্রথম হত্যাকান্ড ঘটালো? পথভ্রষ্টরা। যারা কট্টরপন্থী, ধর্মান্ধ। এতই অন্ধ যে সামনে নবীজি(সঃ), খলিফা, সাহাবী কাউকেই দেখতে পায়নি। ধর্মান্ধতার জন্য তারা আল্লাহরও বিপক্ষে যায় এবং সেটাও তারা দেখতে পায় না।"
সোহেল কিছু বলল না। বুঝা গেল সে কিছু একটা বুঝতে পারছে।

"ইসলামে কখনই বলা হয়না নিরপরাধ কারও রক্ত ঝরাতে। নবীজির (সঃ) স্পষ্ট হাদিস আছে, পিতার অপরাধে পুত্রকে, অথবা পুত্রের অপরাধে পিতাকে সাজা দেয়া যাবেনা। কোনভাবেই না। কিন্তু ইসলামের নামে রক্ত ঝরানেওলা সেই নবীজির (সঃ) যুগেও ছিল, এই যুগেও আছে। আফসোস যে ভবিষ্যতেও থাকবে। পুরনো উদাহরণগুলোতো দিলাম, বর্তমানের কিছু উদাহরণ দিব? জুহেইমানের গল্প শুনেছিস? ১৯৭৯ সালের বিশে নভেম্বর তারিখে সে কাবা শরীফ দখল করে ফেলেছিল। কাবাগৃহে অবস্থানকারী মানুষদের সে এক সপ্তাহের মতন জিম্মি করে রেখেছিল। মেশিনগান চালিয়ে খোদ কাবা শরীফে সে নিরপরাধ মানুষের রক্তপাত ঘটায়। কেন? তার ধারনা ছিল সে কাবা ঘর দখলের মাধ্যমে ইসলামী দুনিয়ার নেতৃত্ব নিবে। বিপথগামী মুসলমানদের সে আল্লাহর রাস্তায় পরিচালিত করবে। এই হচ্ছে তার 'শান্তির' পথ। সাধারণ মানুষের রক্ত ঝরানো! তুই ইচ্ছা করলে গুগল করে আরও বিস্তারিত জেনে নিতে পারিস।"
"তুই এদের সাথে ফিলিস্তিনি, ইরাকি, আফগানি মুজাহিদদের তুলনা করছিস কিভাবে?"

"এতে কোনই সন্দেহ নাই যে কারও দেশ আক্রান্ত হলে সেই দেশ রক্ষার জন্য জিহাদ করা ফরয। কিন্তু তার মানে এই না তুই গিয়ে অন্য দেশের সাধারণ মানুষ হত্যা করবি। অ্যামেরিকান মিলিটারী কি করলো না করলো, তারজন্য টুইন টাওয়ারের হাজারো নিরপরাধ মানুষ মারার পেছনে যুক্তি কী? শুধু মানুষ মেরেইতো ঘটনার শেষ হয়নি, কোটি মানুষের অর্থনৈতিক জীবনেও তার প্রভাব পড়েছে - সবাই নিরপরাধ ছিলেন। মার্কিন আগ্রাসী নীতির সাথে যাদের কোনই সম্পর্ক নেই। বোমা ফেটেছে বালিতে, বোমা ফেটেছে লন্ডনে, বোমা ফেটেছে বোস্টনে। নিহত মানুষদের একশো ভাগই নিরপরাধ। এইটাই কী ইসলাম? কোথায় বলা হয়েছে এইটাকে 'জিহাদ' বলে?"

"আর তাদের সরকার যে নিরপরাধ আফগানদের হত্যা করলো? ইরাকে হামলা চালালো? সেসব চোখে পড়ে না?"
"ওদের ছুতোটা কারা দিয়েছে? ওরা কী ভেবেছিল, টুইন টাওয়ার ধ্বসিয়ে দিলে অ্যামেরিকা চুপচাপ বসে থাকবে? সম্ভাব্য মার্কিন হামলা থেকে বাঁচার জন্য তাদের কোন ব্যবস্থা ছিল? ইসলাম এমন বেকুবের মত কাজ কখনও করতে বলে? আহাম্মকেরা ‘হুদায়বিয়ার সন্ধির’ ঘটনা থেকে কিছুই শিখে না। তোর ‘জিহাদী ভাইয়েরা’ কেবল মানুষ মারা পর্যন্তই চিন্তা করে। এর কনসিকোয়েন্স চিন্তা করতে পারেনা। এদের সব ধ্যান জ্ঞানই কেবল অন্যের ক্ষতি সাধন! নিজের ক্ষতির পরিমান যে কয়েকগুণ বেশি হবে, সেদিকে বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই! আফগানিস্তানে সাধারণ মানুষ হত্যার জন্য অ্যামেরিকা যেমন দায়ী, তোর so called 'জিহাদী' ভাইয়েরাও সমান দায়ী!"
"অ্যামেরিকা যে ইরাকে যুদ্ধ ঘটালো? লিবিয়ায় সন্ত্রাস? পৃথিবীর সব মুসলমান দেশের বিরুদ্ধেই তোর দেশ লাগছে, আর দোষ কেবল মুসলমানদের?"

"ইরাকে যে যুদ্ধ হয়েছে, সেটা কোন ধর্মযুদ্ধ ছিল না। সবাই জানে যে তেলের জন্যই সেই আক্রমণ হয়েছিল। মিডল ইস্টেও অশান্তির পেছনে মূল কারন তেল। সেটা অবশ্যই নিন্দনীয়। কিন্তু তারা জিসাসের নাম নিয়ে মানুষ মেরে আসেনি। এখন ইরাকে যা ঘটছে, তোদের আই.এস ভাইয়েরা যা চালাচ্ছে, সুন্নি মুসলিম ছাড়া বাকি সবাইকে জবাই করে ফেলছে, সেটা এক কথায় নবীজির (সঃ) সেই অভিশপ্ত সম্প্রদায়ের আধুনিক সংস্করণ, যারা স্রেফ হত্যা ছাড়া আর কিছু চিন্তা করতে পারেনা। মাথামোটা এইসব মৌলবাদীরা মনে করে তাদের সাথে থাকলেই কেউ বেহেস্তে যাবে, নাহলে খুন করার অধিকার তাদের আছে। কেনরে ইবলিসের চ্যালারা, মানুষকে বেহেস্তে নেয়ার দায়িত্ব কি আল্লাহ শুধুই তোদের হাতে দিয়েছেন? সেটা আল্লাহর উপর ছেড়ে দিলে সমস্যা কোথায়? মানুষ খুনের মাধ্যমে এরা শান্তি আনতে চায়! এরচেয়ে হাস্যকর যুক্তি আর কী হতে পারে?"
"ওদের জায়গায় না গেলে তুই বুঝবি না।"
এবারে জাকিরের গলা চড়ে গেল।

"আর ওদের ভিকটিমদের জায়গায় কে যাবে? নিরীহ সাংবাদিকদের পশুর মত জবাই করে মারছে। যেখানে ইসলামে বলা হয়েছে বিনা কারনে একটি গাছ কাটাও নিষেধ, তারা সেখানে ‘বিসমিল্লাহ’ বলে মানুষ জবাইকে হালাল করার চেষ্টা করে? লাভটা কী হলো? যুদ্ধবিমুখ সাধারণ অ্যামেরিকানরা এখন একজোট হয়ে সরকারের কাছে দাবী করছে ইরাক আক্রমনের জন্য। বিশ্বব্যাপী ইসলামকে 'সন্ত্রাসী ধর্ম' হিসেবে বদনাম করার পেছনে কাদের অবদান সবচেয়ে বেশি? তোদের আলকায়েদা, আই.এস টাইপের জঙ্গি গোষ্ঠীদের। আমাদের দেশেও যে আজকে এত মানুষ ইসলাম বিমুখ, তোর কী ধারনা 'রগ কাটা' জামাত শিবিরের কোনই অবদান নেই তাতে?"
“তুই বেশিই কথা বলা শুরু করেছিস।"

জাকির জানে সোহেলের বুকে শেল বিধিয়ে দিয়েছে। সোহেল কট্টরপন্থী মুসলিম। কলেজ জীবনে ছাত্র শিবির করতো। জামাত যে একাত্তুরে রাজাকার ছিল, এই সহজ সত্য স্বীকারে সে বিমুখ।

জাকির গলার দৃঢ়তা বিন্দুমাত্র না কমিয়ে বলতে লাগলো, "দরকার আছে বলেই বেশি কথা বলছি। তোদের এই এক সমস্যা, দাড়িওয়ালা কেউ কিছু বললেই লাফায় লাফায় বিশ্বাস করিস। একটুও যাচাই বাছাই করার চেষ্টা করিস না। তোদের মতের বিরোধী হলেই তোরা শুনতে চাস না। এমনকি বিরুদ্ধমতের কাউকে হত্যা করতেও পিছপা হোস না। তোকে যে দুইটা ঘটনা শুনালাম, তুইই বল, তোরা কাদের ফলো করছিস?"

"অ্যামেরিকায় থেকে থেকে তোরও মাথা গেছে। তুই বেশি পন্ডিত মনে করা শুরু করেছিস নিজেকে। ইসলাম নিয়ে তোর কোন পড়াশোনা আছে? মাদ্রাসায় গিয়েছিস কখনও? কয়টা আলেমের লেখা বই তুই পড়েছিস?"
"অ্যামেরিকায় আসায় আমার এই সুবিধা হয়েছে যে আমি অনেক অনেক বড় বড় ইসলামিক স্কলারদের লেকচার নিয়মিত শুনতে পেরেছি। নিজের ধর্ম নিয়ে আমার অনেক ভ্রান্ত ধারনা দূর হয়েছে। তোদের জন্য আফসোস হয়, তোদের ‘আলেম পীরেরা’ তোদের যাই বুঝায়, তোরাও তাই বিশ্বাস করিস।"

সোহেল তাচ্ছিল্য করে বলল, "তোদের লেকচারাররা কী? কোট-প্যান্ট পড়ে থাকে। খৃষ্টানদের পোশাক! ইসলামী পোশাকে কয়জনকে দেখা যায়?""

জাকির হেসে বলল, "এইযে তুই তোর জ্ঞানের দৌড় দেখিয়ে দিলি। আরে, পুরুষদের জন্য 'ইসলামী পোশাক' বলে পৃথিবীতে আলাদা কিছু আছে নাকি? নবীজি (সঃ) যে পোশাক পড়তেন, আবু জাহেলও সেই একই পোশাক পড়তো। সেটা ছিল আরবের সাধারন পোশাক। ইসলাম বলেছে, শরীর ঢেকে রাখতে, ব্যস। 'জোব্বা' পড়লে বেশি সওয়াব হবে, আর কোট প্যান্ট পড়লে গুনাহ - এইসব তোদের স্বল্পবিদ্যার মোল্লাদের ফতোয়া। তোদের সমস্যা হচ্ছে, তোরা সবসময়েই অতি Radical হয়ে যাস। নাশকতা করতে করতে তোরা প্রাণ দিতেও পিছপা হোস না। আফসোস! তোদের এই প্রাণত্যাগ মিথ্যা কারনে ঘটে। নবীজি (সঃ) সাবধান করে বলেছিলেন, 'ওদের ধর্মাচরণ দেখলে মনে হবে ওরা তোমাদের চেয়ে বেশি ধার্মিক, বরং তোমাদের ধর্মাচরণ তাদের থেকে শ্রেষ্ঠ হবে।' ওদের দেখে বিভ্রান্ত না হবার পরামর্শ খোদ নবীজিই (সঃ) দিয়েছেন।"
সোহেল কথা খুঁজে পায়না।

জাকিরকে টেলিফোন অপারেটর ওয়ার্নিং দেয়। তার কার্ডের টাকা শেষ হয়ে আসছে। মাত্র এক মিনিট বাকি আছে।
সে গলা নরম করে বলে, "শোন বন্ধু, ধর্ম অত্যন্ত সেনসিটিভ এবং ব্যক্তিগত একটি বিষয়। একে নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে আল্লাহ এবং নবীজিই (সঃ) নিষেধ করে দিয়েছেন। সুরাহ ক্বাফিরুন এবং বিদায় হজ্জ্বের ভাষণ আবার পড়। শুধু শুধু মনে হিংসা পুষে কী লাভ? উগ্রপন্থী মুসলিম, নন-প্র্যাকটিসিং মুসলিম, স্বল্পজ্ঞানী ফতোয়াবাজ এরা সবাইই ইসলামের জন্য চরম ক্ষতিকারক।"

"তারমানে ফিলিস্তিনের গণহত্যার কোনই প্রতিবাদ করবো না? ইরাকে চলমান ড্রোন হামলার আমরা কিছুই করবো না?"

"তুই আমাকে বল, তুই কিছু করতে পারবি? প্লেনে করে ফিলিস্তিনে গিয়ে যুদ্ধ করা তোর পক্ষে সম্ভব? কিন্তু তাই বলে তুই যদি রাস্তা থেকে একজন random সাদা চামড়ার অ্যামেরিকান ধরে জবাই করে দিস, সেটা কতটুকু যুক্তিযুক্ত? তুই নিন্দা জানা। ইন্টারনেটে নিন্দা জানা, rally করে নিন্দা জানা, লেখালেখি করে নিন্দা জানা। ইসলামে স্পষ্ট বলা আছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিন্দা জানানোও জিহাদ। টাকা পয়সা দিয়ে আহত-নিহত মানুষদের সাহায্য কর। তোর পক্ষে যেসব সম্ভব এবং লজিক্যাল সেসব তুই কর। ভুলে যাস কিভাবে যে ইসলাম একটি লজিক্যাল ধর্ম, মোটেও ইমোশনাল ধর্ম নয়।"

সোহেলের কথা শোনা গেল না। কলিং কার্ডের ক্রেডিট শেষ হয়ে যাওয়ায় সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল।
জাকির নিজের ডেস্কে ফিরে এলো। সোহেলকে অনলাইনে পাওয়া গেল।
একটা দীর্ঘ ইসলামী লেকচার দিয়ে জাকির মোটামুটি উৎফুল্ল।

সোহেল বলল, "বন্ধু, তোর কথায় যুক্তি আছে, কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না আমার কী করা উচিৎ।"
জাকির বলল, "পড়াশোনা কর। বুদ্ধি খাটা, যুক্তির ব্যবহার কর। ইসলামে অযৌক্তিক কিছুই নেই। তোর মনে কোন প্রশ্ন জাগলে স্কলার কাউকে খোলাখুলিই জিজ্ঞেস করে উত্তর জেনে নে। ইন্টারনেটের যুগে এখন এসব খুবই সহজ ব্যপার।"
সোহেল বলল, "তুই বুঝতে পারছিস না। তুই যদি ঠিক হয়ে থাকিস, তোর কথা যদি সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে বাংলাদেশের ধ্বংস হতে খুব বেশি বাকি নেই। উগ্রবাদ, মৌলবাদ, ধর্মান্ধতা এখন সারাদেশে ছড়িয়ে গেছে। বেশিরভাগই ভুলভাবে ইসলাম ধর্ম পালন করছে। আমরা আল্লাহর নামে নিরপরাধ মানুষ খুন করতেও দুইবার চিন্তা করিনা। আমাদের বলা হয়, এসব নাকি জিহাদের অংশ। বিভিন্ন দালিলিক প্রমাণও দেয়া হয়।"
জাকির চ্যাটেই হেসে দিল।

"হাহাহা। বন্ধু, শয়তানের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য কি জানো? সেও কিন্তু সত্য বলে, তবে আংশিক সত্য। সেটা মিথ্যার চেয়েও খারাপ। মানুষ বছরের পর ধরে পড়াশোনা করে স্কলার হয়। ওরা দুই চারটা বই পড়েই নিজেদের বিরাট পন্ডিত ভেবে বসে থাকে! আরে, ওদের কথা বিশ্বাস করার আগে তোর নিজের মনকে জিজ্ঞেস করবি ‘শান্তির ধর্ম’ ইসলামের সাথে সেটা কতটা যৌক্তিক। তারপরে কোন ইন্টারন্যাশনালি রেপুটেড স্কলারের সাথে আলোচনা করবি।"
সোহেল লিখলো, "হুমমম।"

জাকির বলল, "তোদের নিয়ত পরিষ্কার, এই ব্যপারে কোন সন্দেহ নেই। শুধু এতদিন বিপথে চালিত হয়েছিস। তোরা আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠা করতে চাস, পৃথিবীতে শান্তি স্থাপন করতে চাস। এরচেয়ে মহৎ কোন কাজ দুনিয়ায় হতে পারেনা। তবে একটা কথা কী, বিধর্মীদের মুসলিম বানাবার আগে আমার মনে হয় আমাদের মুসলমানদের 'মুসলিম' হওয়াটা ভীষণ জরুরী।"
সোহেল বলল, "কাজটা সহজ হবেনা।"

"নবীজি (সঃ) যদি জাহেলি যুগে ইসলাম প্রচার শুরু করতে পারেন, তাহলে তুই কেন মুসলমানদেরই সুপথে আনতে পারবি না? চেষ্টা কর, এই রাস্তায় তোর সাথে আরও অনেককেই পাবি। হয়তো একঝাক মানুষ তোর কথা শুনবে না। হয়তো এক দুইজন সঠিক রাস্তায় ফিরবে। কিন্তু ভুলে যাসনে, অসীমের গণনার শুরুটা এই ‘এক, দুই’ থেকেই হয়।"
https://www.facebook.com/groups/canvasbd/

**** তথ্য ও গল্পের সাবজেক্ট সরবরাহ, বাল্য সুহৃদ সৈয়দ সাজিদ মাহমুদ (sad but true পেজের অ্যাডমিন)

0 comments
Labels: , , ,

তাকে ইসলাম থেকে দূরে ঠেলে দেয়ার জন্য আসলে আপনি জাহান্নামী

কোন এক নাস্তিক আল্লাহকে গালি দিল। হযরত মুহাম্মদকে (সঃ) গালি দিল। আমরা মুসলমানেরা তখন কী করি? প্রথমেই মুখ দিয়ে সেই লোকটার মা বোন দাদী নানী সহ চৌদ্দ গুষ্ঠির যত নারী আছে, তাদের সবার সাথে শুয়ে যাই।
এরপরে সেও জবাবে আমাদের গুষ্ঠির নারীদের সাথে শোয়ার চেষ্টা করে।

আমাদের ঈমানী রক্ত তখন টগবগ করে ফুটতে থাকে। আমরা তখন মুখ দিয়ে হুমকি ধামকি দিতে থাকি।
এতে সে চুপ না হলে আমরা ধরে নেই এই কাফির/মুরতাদকে কুপিয়ে খুন না করলে আমি বেহেস্তে যেতে পারবো না। কাজেই রান্না ঘর থেকে মাছ কাটার বটি নিয়ে রওনা হই। যদি সেই 'মুরতাদের' ভাগ্য খারাপ হয়ে থাকে, তাহলে আমার কোপ খেয়েই তার ভবলীলা সাঙ্গ হয়।

তারপর ঘরে ফিরে খেতে বসি। মানুষ খুন করে শান্তির ধর্ম ইসলাম কায়েম করার আনন্দে তৃপ্তির ঢেকুর তুলি।
সহমতাবলম্বি ভ্রাতার 'শহীদ' হওয়ার ঘটনায় আরও ঝাকে ঝাকে লোক মুরতাদ হয়।
মুরতাদ একটি আরবি শব্দ, যারা মুসলমান পিতামাতার ঘরে জন্ম নিয়ে ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে, তাদের মুরতাদ বলা হয়ে থাকে।

মৌলবাদী মুসলিম অথবা চরমপন্থী নাস্তিক, দুইজনের কেউ কী একটু ভেবে দেখেন যে ইসলাম ধর্মটা আসলে কী? তাদের দুইজনের জ্ঞাতার্থেই বলছি, ইসলাম হচ্ছে শুধুমাত্র আল্লাহর বাণী, এবং নবীজির জীবনাদর্শ - এই দুইয়ের বাইরে আর কিছুই নয়।

জামায়াতে ইসলামী উনিশশ একাত্তুরে গণহত্যা চালিয়েছে, অথবা সৌদি সরকার নারীদের অধিকার লঙ্ঘন করছে কাজেই আমি নাস্তিক হয়ে যাব - this is bullshit! জামায়াতে ইসলামীর কোন নেতা ইসলামের নবী নয়।
সৌদি আরবে মক্কা মদিনা থাকলেও তাঁদের সরকারও ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের এক স্তম্ভ নয়। কাজেই তাদের ভুলের জন্য শুধুই তাদের তিরষ্কার করা মানায়, ইসলামকে নয়।

একই সাথে, কোন এক ব্লগার নবীজিকে (সঃ) গালাগালি করলেই তাকে খুন করতে ছুটতে যাওয়াটা অনৈসলামিক।
বিশ্বাস না হলে একটা ইসলামী ঘটনা বলছি।

বিদায় হজ্জ্বের ভাষণে নবীজি (সঃ) বলেছিলেন, "আমি তোমাদের জন্য আল্লাহর বাণী এবং তাঁর রাসূলের জীবনাদর্শ রেখে যাচ্ছি।" তিনি বলেছেন এই দুইটাকে আকড়ে রাখলে আমাদের আর কোন কিছু নিয়ে চিন্তা করতে হবেনা।
তাহলে নবীজির (সঃ) জীবনাদর্শে যাওয়া যাক।

একবার নবীজি (সঃ) কাবা ঘরের সামনে বসে ছিলেন। তিনি মাত্রই নতুন ধর্ম প্রচার শুরু করায় তিনি তখন মক্কা জুড়ে কাফিরদের কাছে বিরাট 'ভিলেন।'

তাঁকে যন্ত্রণা দিতেই আবু জাহেল এসে তাঁর মাথায় বালু ঢেলে দেয়। তিনি কিছু না বলে চুপচাপ বালু ঝেড়ে ফেলেন।
নবীজি কোন জবাব না দেয়ায় আবু জাহেল মজা পেল না। তাই সে নানাভাবে তাঁকে উত্যক্ত করতে থাকে। একসময়ে তাঁকে মারধর পর্যন্ত করে। নবীজি (সঃ) তারপরেও কিছু বলেন না।

হযরত হামযা (রাঃ) সম্পর্কে ছিলেন নবীজির (সঃ) চাচা এবং তিনি তখনও ইসলাম গ্রহণ করেননি। তিনি কুরাইশদের ধর্ম নিয়েও মাথা ঘামাতেন না। তিনি নিজের মতই থাকতেন। শিকার করতে খুব ভালবাসতেন।

এই ঘটনার সময়ে তিনি শিকারে ব্যস্ত ছিলেন। শিকার থেকে ফেরার পর তাঁর এক দাসী এসে তাঁকে বলেন, "ধিক তোমার পুরুষত্বে, তোমার ভাতিজাকে এসে আবু জাহেল মারধর করে গেল, অথচ তুমি তোমার শিকার নিয়ে ব্যস্ত!"
হযরত হামযা (রাঃ) নবীজিকে (সঃ) খুব স্নেহ করতেন। তাঁর মার খাওয়ার ঘটনা শুনে তিনি রেগে আগুন হলেন। ছুটে গেলেন কাবা ঘরে। সেখানে নবীজি (সঃ) না থাকলেও আবু জাহেল তখনও ছিল।
হামযা (রাঃ) এসেই আবু জাহেলের টুটি চেপে ধরেন।
"তুমি কোন সাহসে আমার ভাতিজার গায়ে হাত তুলেছো!"
হযরত হামযা (রাঃ) বিরাট বীর ছিলেন। তাঁর সামনে দাঁড়াবার সাহস কারও হয়নি।
আবু জাহেল কোন রকমে বলে, "ও প্রচার করছে আমাদের বাপ দাদার ধর্ম নাকি মিথ্যা। ও বলছে আল্লাহ নাকি এক এবং সে নাকি তাঁর নবী!"

হামযা (রাঃ) তখন চিবিয়ে চিবিয়ে বলেন, "ও যদি তাই বলে থাকে, তবে আমিও বলছি আল্লাহ এক এবং সেই আল্লাহর নবী। এখন তুমি আমাকে কী করতে পারবে? সাহস থাকে তো গায়ে হাত তুলে দেখাও!"
আবু জাহেলসহ তার সাথীরা হায় হায় করে উঠে। হযরত হামযা (রাঃ) মুসলিম দলে যোগ দেয়ায় নিঃসন্দেহে তাঁদের শক্তি বেড়ে যায়।

এর ঠিক দুই-তিন দিন পরের ঘটনা।
কাফিরদের মধ্যে বিরাট বীর উমার(রাঃ) তলোয়ার নিয়ে হাজির। সে মুহাম্মদকে (সঃ) মেরে ফেলবে।
আবু জাহেল খুব খুশি। মক্কায় উমারের(রাঃ) মত বীর খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। হামযাকে (রাঃ) ঠেকাতে উমারের(রাঃ) বিকল্প কেউ নেই। এবং হামযা (রাঃ) বধ হলে মুহাম্মদকে (সঃ) বাঁচাবার কেউ থাকবে না।

সামনে এগুবার আগে উমারের(রাঃ) সংক্ষিপ্ত পরিচয় দিয়ে দেই। সে তখন সাতাশ বছরের টগবগে তরুণ। মদ্যপান, নারী আসক্তি, জুয়া ইত্যাদি সহ এমন কোন খারাপ কাজ নেই যেখানে তাঁর অরুচি আছে। তাঁর একটাই গুণের প্রশংসা করতে হয়, সেটা হচ্ছে তিনি নির্ভিক বীর।

উমারের (রাঃ) তলোয়ার হাতে আসার খবর শুনে সাহাবীরা ঘাবড়ে গিয়েছিলেন। হামযা (রাঃ) তখন তাঁদের সবাইকে বলেছিলেন, "ওকে আসতে দাও। যদি তাঁর নিয়্যত ভাল থাকে, তাহলে তাঁর জন্যই ভাল হবে। আর বদ কোন মতলব থাকলে তাঁকে তাঁর তলোয়ারেই হত্যা করা হবে।"

মোটামুটি ভয়াবহ একটা লড়াই দেখার জন্য সাহাবীরা মানসিক প্রস্তুতি নিলেন।
উমার(রাঃ) এসে দরজায় দাঁড়ালেন। হামযা (রাঃ) হাতে তলোয়ার তুলে নিলেন।
কিন্তু তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে স্বয়ং নবীজি (সঃ) এগিয়ে গেলেন। হাসিমুখে তাঁকে স্বাগত জানালেন। উমার (রাঃ) তাঁর পায়ের কাছে তলোয়ার ফেলে দিয়ে বললেন, "আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া আর কোন ঈশ্বর নাই, এবং আপনিই তাঁর প্রেরিত পুরুষ।"

সাহাবীরা জয়ধ্বনি করে উঠলেন, "আল্লাহু আকবার! আল্লাহ সর্বশক্তিমান!"
দুই দিনের ব্যবধানে দ্বিতীয়বার আবু জাহেলের মাথায় হাত!
এখন ঘটনাগুলো একটু মাথা খাটিয়ে বিশ্লেষণ করা যাক।

প্রথম ঘটনায় নবীজি (সঃ) যদি আবু জাহেলকে পাল্টা চড় থাপ্পর মেরে বসতেন, এমন না যে তিনি দূর্বল ছিলেন; অথবা গালাগালিও করতেন যা কিনা নবীজির (সঃ) স্বভাবে বিন্দুমাত্র ছিল না, তাহলে কী হযরত হামযা (রাঃ) ওভাবে তেড়ে যেতেন? যদি তিনি সেখানে না যেতেন, তাহলে কী তিনি মুসলমান হতেন? উত্তরটা ভাবতে থাকুন।
হযরত উমারের (রাঃ) চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য আগেই বলেছি। তিনি নবীজিকে (সঃ) হত্যা পর্যন্ত করতে চেয়েছিলেন। এই চরিত্রের কাউকে দেখলে আমরা নাক সিটকে বলি, "ব্যাটা জাহান্নামী!"
অথচ মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে আল্লাহ তাঁকে মুসলিম বানিয়েছিলেন। এবং এক সময়ে তিনি ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা পর্যন্ত নির্বাচিত হন।

আল্লাহ চাইলে কি না পারেন?
তাহলে কোন ব্লগার কী লিখলো না লিখলো সেটা আল্লাহর উপর ছেড়ে দেয়াটাই কী ভাল না?
তার যদি কোন বিষয়ে মতবিরোধ থাকে, তবে আমাদের উচিৎ তার সেই মতবিরোধ দূর করা। গালাগালি করে ঝগড়া বাড়িয়ে তাকে আরও দূরে ঠেলে দিলে কোন লাভ হবে? খুন করে ফেলারতো কোন যুক্তিই নেই। যদি কেউ পথে উমারকে (রাঃ) হত্যা করে ফেলতো, তাহলে আমরা কী হযরত উমারের (রাঃ) মতন বীর, এবং একদন আদর্শ খলিফা পেতাম? এর উত্তর নিশ্চই ভাবতে হবে না!

কাফের অথবা নাস্তিকদের উপর আমরাতো ক্ষেপিই, এমনকি মুসলমানদের মধ্যেও যদি কেউ ইসলাম নিয়ে কোন প্রশ্ন তুলে, আমরা তাকে জবাব দেয়ার পরিবর্তে রেগে মেগে গালাগালি করতে থাকি। এতে সে ইসলাম থেকে দূরে সরে যায়। দেশে যে লাখে লাখে মুরতাদ, এর একমাত্র কারণ আমাদের এই অভ্যাস।
আরেকটা ঘটনা দিয়ে শেষ করি।

একবার এক তরুণ সাহাবী নবীজির (সঃ) কাছে গিয়ে বললেন, "আমাকে জিনাহ করার অনুমতি দিন।"
জিনাহ মানে অন্য নারীর সাথে শোয়ার অনুমতি।

সবাই হায় হায় করে উঠলো। বলে কী! নবীজির(সঃ) কাছে এসেছে জিনাহর অনুমতি নিতে! সাধারণ এক মোল্লার কাছে গেলেই যেখানে 'আস্তাগফিরুল্লাহ' বলে তাকে তাড়িয়ে দেয়া হবে!
সাধারণ মোল্লার এটা বুঝার ক্ষমতাই নেই যে এতে সে জিনাহ করা থেকে বিন্দুমাত্র বিরত হবে না। বরং জিনাহ করার পাশাপাশি ইসলাম থেকেও দূরে সরে যাবে।
কিন্তু নবীজি(সঃ) পাড়ার মোল্লা ছিলেন না। তিনি সাহাবীকে শান্ত করে বললেন, "যদি তোমার মায়ের সাথে কেউ জিনাহ করে, তোমার ভাল লাগবে?"

"না।"
"যদি তোমার বোনের সাথে অন্য কেউ শুয়ে পড়ে, তোমার ভাল লাগবে?"
"না।"
"তোমার স্ত্রীর যদি আরও অন্য কারও সাথে সম্পর্ক থাকে, তোমার ভাল লাগবে?"
"না।"
"তোমার মেয়ের সাথে?"
"আমি তাকে খুন করে ফেলবো!"
"ঠিক সেভাবেই তুমি যার সাথে জিনাহ করতে চাইছ, সেও কারও মা, বোন, স্ত্রী, অথবা কন্যা। তুমি যদি কাজটা করো, তাহলে সেটা অন্যের প্রতি অন্যায় করা হবে। কাজটা করোনা।"

সাহাবী নবীজির (সঃ) কথায় সন্তুষ্ট হলেন, এবং ওয়াদা করলেন, তিনি এই কাজ করবেন না।
আমাদের মোল্লারা প্রচার করে বেড়ায় কাফের নাসারারা আমাদের শত্রু। অথচ ইসলামে বলা আছে, প্রতিটা অমুসলিমকে সম্ভাব্য মুসলিম হিসেবে আচরণ করতে। সে পুত্তলিক পুরোহিত হোক, অথবা কট্টর নাস্তিক।
কাজেই, ভিন্ন মতাবলম্বী কারও মতামত শুনে শুরুতেই তাকে গালাগালি করা শুরু করে দিবেন না। শুনুন তার কথা। আপনার যদি ভাল না লাগে, তবে অতিরিক্ত ভদ্রতার সাথে তাকে নিজের পয়েন্ট অফ ভিউ সলিড যুক্তি দিয়ে বুঝাবার চেষ্টা করুন। যদি সে না বুঝে, তাহলে তাকে আল্লাহর হাতে ছেড়ে দিন। শুধু শুধু নিজের পাপের বোঝা বাড়ানো কেন?

"তুমি পর্দা করো না? তুমি জাহান্নামী!"
"তুমি নামাজ পড়ো না? তুমি জাহান্নামী!"
"তুমি নাস্তিক? তুমি জাহান্নামী!"
"তুমি সমকামী? তুমি জাহান্নামী!"

আল্লাহ কী জাহান্নামের কন্ট্রাক্ট শুধু আপনার হাতেই তুলে দিয়েছেন? তওবা বলে একটা ব্যবস্থা যে ইসলামে আছে, সেটা কী আপনি ভুলে গেছেন? আপনি কি জানেন, তাকে ইসলাম থেকে দূরে ঠেলে দেয়ার জন্য আসলে আপনি জাহান্নামী?

https://www.facebook.com/groups/canvasbd/

0 comments
Labels: , , ,

নাস্তিক বনাম আস্তিক

"আমি এখন ওসব ধর্মকর্ম মানিনা। আমি অনেক পড়াশোনা করেছি, এবং বুঝতে পেরেছি ওসব বোগাস।"
কথাটি যে ছেলে বলল, তাকে কিছুদিন আগেও রেগুলার মসজিদে পাওয়া যেত। সে সবকিছুই খুব সিরিয়াসলি করে। যখন মসজিদে যেত, তখন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতে পড়তো। এখন যখন নাস্তিক হয়েছে, তখন ধুমায়ে গালাগালি করবে এইটা নিশ্চিত।

অবশ্য সে একাই যে এমন বলে, এটা ঠিক না। ওর মতন ছেলেতে এখন দেশ ভরে গেছে।
"তাই? ভালইতো। তা, কী পড়াশোনা করেছিস? আমাকেও একটু জানা, তাহলে আমিও তোর মতন হয়ে যাই। কারণ আমি যত পড়াশোনা করেছি, ততই বেশি ধার্মিক হয়ে যাচ্ছি।"
"তুই আমার সাথে রসিকতা করছিস?"

"আমার গলার স্বর শুনে তাই মনে হচ্ছে? স্যরি দোস্ত। কিন্তু আমি আসলেই সিরিয়াস। আমিও জানতে চাই ঘটনা কী?"
বন্ধু আমার নিজের কন্ঠস্বর পাল্টে বলল, "আসলে মোহাম্মদের (সঃ)(যদিও সে দুরুদ পাঠ করেনি, কিন্তু আমি যেহেতু লিখছি, তাই দুরুদ পাঠ করলাম) উপর থেকে রেসপেক্ট চলে যাওয়ায় এখন আর ধর্ম মানতে ইচ্ছা করেনা।"
চোখ বড় বড় করে অবাক গলায় বললাম, "বলিস কী? পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষকে যদি তুই রেসপেক্ট না করিস, তাহলে কাকে করবি?"

"এটা একটা টিপিক্যাল পায়াস স্টেটমেন্ট। তুই নিজে আমাকে বুঝা, উনাকে রেসপেক্ট করার কোন যুক্তি আছে?"
"একটা লোক একটা চূড়ান্ত বর্বর জাতিকে মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে লাইনে নিয়ে আসলেন, তুই বলছিস তাঁকে রেসপেক্ট করার কিছু নেই?"

"বর্বর কাদের বলছিস? ইসলাম নিজে বর্বর নয়? ইসলামে বলা হয়নি মেয়েরা ছেলেদের খেলার পুতুল? স্বামীর পায়ের নিচে স্ত্রীর বেহেস্ত? মেয়েদের মারধর কর? অমুসলিমদের মাথা কেটে ফেল? কী হলো? কোথায় যাচ্ছিস? জবাব দিয়ে যা।"

আমি গিয়ে শেল্ফ থেকে কুরআন শরীফ এনে তার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললাম, "এই যে তোকে কুরআন দিয়ে দিলাম। আরবি থেকে ইংলিশ বাংলা দুই ধরনেরই ট্রান্সলেশন আছে। তুই আমাকে এইসব আয়াত খুঁজে বের করে দেখা। আমি আজকেই নাস্তিক হয়ে যাব।"
"তুই বলতে চাচ্ছিস এসব ইসলামে নেই?"
"ইসলাম মানে কুরআন শরীফ। ইসলাম মানে নবীজির(সঃ) সহীহ হাদিস। এই দুইয়ের বাইরে অন্য কোন কিছুই ইসলাম নয়। বটম লাইন।"

"দাঁড়া আমি তোকে এসব বের করে দেখাবো।"
"আমি স্বানন্দে অপেক্ষায় থাকব। সুরাহ বাকারার ২৫৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ স্পষ্ট করে নির্দেশ দিয়েছেন ইসলাম গ্রহণে কারও উপর কোনরকম জবরদস্তি করা যাবে না। বিশ্বাস না হলে খুলে দেখ। একটা জিনিস মনে রাখিস, পাড়ার মোল্লা মৌলবিরা কোন একটা ফতোয়া জারি করে দিলেই সেটা ইসলাম নয়। ইসলাম শুধুমাত্র আল্লাহর বাণী এবং নবীজির হাদিসের উপর দাঁড়িয়ে আছে। এর বাইরে সব বেদাত।"
"হাদিস মানে কী? ঐ আমলে নবী, সাহাবী এবং স্কলাররা মিলে কিছু নিয়ম করে গেছেন, সেটাইতো?"
আমি চূড়ান্ত হতাস হয়ে বললাম, "ভাইরে....আগে ভাল মতন জেনে আয় হাদিস মানে কী, তারপর তর্ক করতে আসিস।"
"না, সিরিয়াসলি, হাদিস মানে কী?"

"হাদিস হচ্ছে শুধুমাত্র নবীজির (সঃ) বাণী। উনি যা বলে গেছেন, সেটাই। অন্য যে কেউ, এমন কী হযরত আবু বকরও (রাঃ) যা বলে গেছেন, সেটা হাদিস হতে পারেনা।"
"ঐ একই কথা হলো।"
"না, এক না। নবীজির(সঃ) নিজের বাণী, এবং অন্য যে কারও বাণীতে আকাশ পাতাল ব্যবধান আছে। সেটা যেকোন ব্যপারেই হোক।"
বন্ধু ইন্টারনেট ঘেটে একটা আয়াত বের করলো। সূরা নিসার চৌত্রিশতম আয়াত। অতি বিখ্যাত আয়াত। এখানেই আল্লাহ বলেছেন, বউ পেটাতে।

"এই যে, এই দ্যাখ। এখানে স্পষ্ট বলা আছে, forsake them in bed; and [finally], strike them."
এরপর সে বিজয়ীর হাসি হেসে বলল, "এখন তুই কী বলবি?"
আমিও হাসছি দেখে সে বলল, "কিরে? মুখ বন্ধ হয়ে গেলতো? কোন জবাব নেইতো?"
"হাসছি তোর বোকামি দেখে। এই হচ্ছে তোর পড়াশোনার দৌড়? হাহাহা।"
"ফাজলামি বাদ দিয়ে বল তোর কোন জবাব আছে এর এগেইনস্টে?"
"তুই পুরো আয়াতটা পড়, তাহলেই তুই তোর জবাব পেয়ে যাবি। আমাকে ব্যাখ্যা করতে হবেনা।"
"যাই বলা হয়ে থাকুক না কেন, একটা মেয়েকে পেটানো কোনভাবেই জাস্টিফায়েড না।"

"পুরো আয়াতে বলা হয়েছে, ধার্মিক মেয়েরা অবশ্যই স্বামীর প্রতি সৎ থাকবে। এবং যদি তাঁরা স্বামীর সাথে চিটিং করে, তাহলে স্বামীরা যেন প্রথমে তাঁদের চিট করতে নিষেধ করেন। তারপরও যদি তাঁরা না শোনেন, তাহলে তাঁদের শয্যাত্যাগ করেন, মানে তাঁদের সঙ্গত্যাগ করেন আর কি। এবং তারপরেও যদি তাঁরা না মানেন, তাহলেই কেবল তাঁদের আঘাত করা যাবে। এবং এখানেই হাদিস এসেছে যে সেই আঘাতটাও ব্রুটাল হতে পারবেনা। এমন হতে হবে যেন মেসওয়াক (টুথব্রাশ) দিয়ে আঘাত করলে যেমনটা হয়। তুইতো পড়াশোনা করেছিসই, নিশ্চই জানিস ইসলামে কঠোরভাবে নিষেধ আছে স্ত্রীর মুখে আঘাত করার ব্যপারে। তাঁর উপর চূড়ান্ত অসন্তুষ্ট হলে তাকে তালাক দিতে বলা হয়েছে, কিন্তু মুখে আঘাত করে তাঁর চেহারা বিগড়াতে বলা হয়নি। সে যেন আরেকটা বিয়ে করতে পারে, এই পথ যেন খোলা থাকে।"

"তুই কী করে শিওর হচ্ছিস যে টুথব্রাশ দিয়ে আঘাত করার কথা বলা হয়েছে? ওসব মনগড়া কথাওতো হতে পারে। ভাল যুক্তি আছে? এভিডেন্স আছে?"
হেসে বললাম, “তায়াম্মুম কাকে বলে জানিস?"
বন্ধু রেগে গেল।
"এখানে তায়াম্মুম আসছে কোত্থেকে? শুধু শুধু তাকে টেনে আনছিস কেন?"
"দরকার আছে বলেই টানছি। তুই জানিস তায়াম্মুম কাকে বলে?"
"অবশ্যই জানি।"
"আমাকে বল।"
"মানে? তুই আমাকে বিশ্বাস করিস না?"
"আগে করতাম। কিন্তু আজকে তোর কথাবার্তা শুনে ঠিক ভরসা পাচ্ছি না। বল দেখি, তায়াম্মুম কাকে বলে?"
বন্ধু গজগজ করতে করতে বলল, "যখন হাতের নাগালে পানি থাকেনা, তখন অজু করার জন্য পরিষ্কার মাটির ব্যবহার করার পদ্ধতিকে তায়াম্মুম বলে। হয়েছে?"
"যাক, এই প্রশ্নের উত্তর তুই পেরেছিস।"
"বলেছি না আমি যথেষ্ট পড়াশোনা করেছি?"
"অল্পবিদ্যা ভয়ংকরী বন্ধু। অশিক্ষিত মানুষই মনে করে সে যথেষ্ট পড়াশোনা করে ফেলেছে। জ্ঞানী মাত্রই বুঝতে পারে যে জ্ঞানের কোন শেষ নেই।"

"তুই আমাকে অপমান করা বন্ধ করে বল তায়াম্মুমকে কেন টেনে এনেছিস!"
"মাটিতে হাত লাগিয়ে তায়াম্মুম করতে হয়। এই 'মাটিতে হাত লাগানোর' বর্ণনায় কী Verb ব্যবহার করা হয়েছে জানিস? 'দারাবা।' সুরাহ নিসার ঐ আয়াতেও ঐ একই verb, ‘ওয়াদরিবুহুন্না।’ যার আক্ষরিক অনুবাদ করলে হবে 'তাদের প্রহার কর' বা তুই যে ইংলিশে বললি 'strike them.' এর কোনটাই কিন্তু ঠিকমতন ফিট করেনা। কারণ এটা যদি ফিট করে তাহলে বলতে হবে তায়াম্মুমের সময়ে নির্দেশ দেয়া হয়েছে মাটিকে পেটাতে। এই লজিকেই বলা হয়েছে সুরাহ নিসার চৌত্রিশ নম্বর আয়াতে বউ পিটানোর কোন নির্দেশ দেয়া হয়নি, বরং এত বড় অপরাধের পরেও বলা হয়েছে কেবল তার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে! সহজ লজিক হচ্ছে একেক ভাষায় একেকভাবে ভাব প্রকাশ করা হয়ে থাকে। অনুবাদ করে একটা আইডিয়া পাওয়া যায় মাত্র, কিন্তু শতভাগ বুঝে ফেলার দাবী করাটা হাস্যকর। এবং তার উপর কনটেকস্ট না বুঝে সরাসরি উপসংহার টানাটা নির্বুদ্ধিতা।"

"তুই এত কিছু জানিস কেমনে?"
"সেই আদিযুগ থেকেই তোর গুরুরা এবং নির্বোধ কিছু মৌলবাদীরা এই আয়াতের ভুল ব্যবহার করে ফায়দা লুটার চেষ্টা করে। তাই এ সম্পর্কে বিস্তর আলোচনা নেট ঘটলেই পাবি। আর তাছাড়া সাজিদকে চিনিস না? ঐ যে সৈয়দ রাজাউল আকমাল সাজিদ, sad but true পেজের অ্যাডমিন, আমার স্কুল জীবনের বন্ধু, সেই আমাকে আরবি verb-এর ব্যবহার সম্পর্কে বলেছে। ওকেতো চিনিসই, এসব বিষয়ে তাঁর অনেক আগ্রহ আছে। এখন তোর কাছে আমার আরেকটা প্রশ্ন আছে।"
"করে ফেল।"

কয়েক বছর আগে একটা নাটকে লম্পট চরিত্রে অভিনয় করেছিলাম। এবারে ঠিক সেভাবে গলার স্বর ও দৃষ্টি বদলে জিজ্ঞেস করলাম, "বন্ধু। তোমার বউ যদি আমার সাথে বিছানায় শোয়, তখন তুমি কী করবে?"
"আমি তোদের দুইজনকেই খুন করে ফেলবো।"
"কেন বন্ধু? তুমি না এই মাত্রই বললে টুথব্রাশ দিয়ে আঘাত করাও জাস্টিফায়েড না, সেখানে তুমি খুন করার কথা ভাবছো! ও মাই গড! তুমি এতো বর্বর!"
বন্ধু সাথে সাথে থতমত খেয়ে গেল।

"অন্যের বৌকে নিয়ে ফ্যান্টাসি করা খুব সহজ। নিজের বৌকে, মাকে, বোনকে সেই জায়গায় বসালেই আমাদের বিচার বদলে যায়। কুরআন সবার জন্যই সমান। এটাই ইসলাম। আল্লাহ ভাল করেই জানেন কোন স্বামী যদি জানতে পারেন তাঁর স্ত্রী তাঁর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করছে, তবে তিনি কী রিয়েক্ট করতে পারেন। এই যুগেও স্বামীরা স্ত্রীদের মেরে ফেলতে চাইবেন, জাহেলি যুগের স্বামীরাতো আরও এগ্রেসিভ ছিলেন। তাই আল্লাহ বলে দিয়েছেন প্রথমে তাঁদের বুঝাতে, তারপর সেপারেট হতে। কিছুতেই কিছু লাভ না হলে তবেই ‘মৃদু’ আঘাত করা যাবে, তবু 'খুন' করা যাবেনা। কিছুতেই না। আয়াতের শেষে কিন্তু বলা আছে "যদি তাঁরা ভুল স্বীকার করে তোমার কাছে ফিরে আসে, তবে তাঁদের বিরুদ্ধে কোন রাগ পুষে না রাখতে।" তুইই বল, তুই পারবি চিটিং ওয়াইফকে ক্ষমা করে দিতে? কতটুকু বিরাট মনের অধিকারী হলে একে ক্ষমা করা সম্ভব? আল্লাহ কিন্তু সেই নির্দেশই তোকে দিচ্ছেন। তুই বলছিস ইসলাম বর্বর? তোদের চোখে আয়াতের এই অংশটা পড়ে না?"

"ইয়ে তোদের নবী যে ছয় বছরের মেয়েকে বিয়ে করে ফেললেন, সেটাকে কিভাবে জাস্টিফাই করবি?"
"হাহাহা।"
"হাসছিস কেন? হাসির কী বললাম? তুই বলতে চাস উনি তা করেন নাই?"
"অবশ্যই করেছেন। উনি যখন হজরত আয়েশাকে(রাঃ) বিয়ে করেন তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ছয় বছর। এবং সংসার শুরু করেন তারও তিনবছর পর, মানে তাঁর বয়স যখন নয় বছর।"
"এইখানে তোর কোন মন্তব্য আছে? এখনও হাসছিস?"
"আমি জানতাম, ঠিক এই প্রশ্নটাই তোর মনে আসবে। হাহাহা। এর উত্তর অনেক স্কলার অনেক সুন্দরভাবে দিয়েছেন। সেটা তোর চোখে নিশ্চই পড়েনি?"
"তুইই বল দেখি, তোর কী যুক্তি?"
"তোর মাকে যখন তোর আব্বা বিয়ে করেন, আন্টির বয়স কত ছিল?"
"জানিনা।"

"আমার নিজের মায়ের বিয়ের সময়ে বয়স ছিল আঠারো। আমার নানী যখন বিয়ে করেন তাঁর বয়স তখন তের। তাঁর মা যখন বিয়ে করেন, তাঁর বয়স এগারো। আমি একশো বছর আগের কথা বলছি না। আশি নব্বই বছর আগের কথা বলছি। বাংলাদেশের কথা বলছি, যখন দেশের ক্ষমতায় তখন ব্রিটিশ রাজপরিবার। তুই কী জানিস যে খোদ অ্যামেরিকাতেও বর্তমানে মেয়েদের বিয়ের বয়স কোন কোন স্টেটে তের, চৌদ্দ বছর? বিশ্বাস না হলে ইন্টারনেট ঘাট, নিউ হ্যাম্পশায়ারে মেয়েদের লিগাল ম্যারিটাল এজ হচ্ছে তের, নিউ ইউর্কে চৌদ্দ এবং মিসৌরিতে পনের। নবীজির(সঃ) ঘটনা আজ থেকে চৌদ্দশো বছর আগে, আরব মরুভূমিতে। তখনকার যুগে এটাই সাধারণ ব্যপার ছিল। নবীজির(সঃ) শত্রুর কোন অভাব ছিল না। কিন্তু তারা পর্যন্ত এই নিয়ে কোন প্রশ্ন তুলেনি। মানে তাদের চোখেও এটা কোন 'অপরাধ' ছিল না।

আজকের যুগের মেয়েরা রবীন্দ্রনাথের হৈমন্তী পড়েই চোখ কপালে তুলে বলে 'এতো বাচ্চা মেয়ে!' কিন্তু তখনকার যুগে এটাই নিয়ম ছিল। আমাদের দেশে এখনও মেয়েদের ক্ষেত্রে 'কুড়িতেই বুড়ি' কথাটা চালু আছে। কাজেই বাংলাদেশে থেকে, অ্যামেরিকায় থেকে, চৌদ্দশো বছর আগের মরুভূমির কালচার সম্পর্কে মন্তব্য করা খুবই অযৌক্তিক। এটা সেই যুগের ঘটনা যখন বাবারা মেয়েদের জীবিত কবর দিত। সেটাই প্রথা ছিল। ইসলাম এসে সেটা বন্ধ করেছে। দুই যুগকে এক করা আহাম্মকি। Sorry if I sound harsh, but যারা এই যুক্তি দেয়, তারা আহাম্মক! আর তাছাড়া ইসলামই একমাত্র ধর্ম যা বাল্যবিবাহ নিষেধ করে। বিশ্বাস না হলে সুরাহ নূরের ৫৯তম আয়াত পড়। সুরাহ নিসার ৬নং আয়াতেও একইভাবে বিয়ের বয়স নিয়ে বলা হয়েছে। এবং সেটা হচ্ছে শরীরে পিউবার্টি এলেই তুমি যোগ্য। আরবরা সেটাই ফলো করতো। নবীজির (সঃ) সাথে বিয়ে হওয়ায় হযরত আয়েশার (রাঃ) কোন কমপ্লেইন ছিল বলেওতো মনে পড়ে না। তিনি যথেষ্টই সুখী বধূ ছিলেন। তাঁর থ্রুতেই আমরা সবচেয়ে বেশি হাদিস পেয়েছি। যদি দুইজন মানুষ নিজেদের মধ্যে ঠিক করেন কে কাকে বিয়ে করবেন, এবং তাঁরা বিয়ে করে সুখীও থাকেন, সেখানে জোকারের মত আজাইরা নাক গলানো কী ঠিক?"
"ইয়ে, মানে আমার মনে আরও অনেক ডাউট আছে।"

"ডাউট থাকতেই পারে, সময়ের সাথে সাথে ডাউট আসাটাই স্বাভাবিক। আজকে যা নরমাল লাগছে, একশো বছর পর দেখবি সেটা নিয়েই ডাউট আসবে। কিন্তু ডাউট আসলে সেই ডাউটের উপরেই আগে ডাউট করা উচিৎ যে, কেন এমন ডাউট আসলো। মানে কেন আমার মনেই নবীজির (সঃ) বিয়ে নিয়ে ডাউট এলো, কেন একশো বছর আগে কারও মনে এলো না? এবং সেই ডাউট দূর করতে আমাকে ফিরে যেতে হবে চৌদ্দশো বছর আগে, সেই আরব মরু সভ্যতায়, তারপর সেখান থেকে উত্তর খুঁজে বর্তমানে ফিরে আসতে হবে।"
হঠাৎ বন্ধুর চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো, "ও হ্যা, মনে পড়েছে! কুরআনে বলা হয়েছে চারটা বিয়ে করতে। এই নিয়ে কী বলবি? অ্যা?"

একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললাম, "বন্ধু, আমি তোমাকে ছোটবেলা থেকেই চিনি। তুমি স্যারের সাজেশন পেয়ে পাশ করা ছাত্র ছিলে। মাঝে মাঝে পরীক্ষায় নকলও করতে। এখন দেখছি, সেই অভ্যাস তোমার এখনও রয়ে গেছে। কোন কিছুই ডিটেইলে পড়তে পারোনা।"
বন্ধু চোখ পাকিয়ে বলল, "কী বলতে চাস?"

"কুরআনে বলা হয়েছে 'যদি তুমি ন্যায় করতে পারো, তবেই কেবল দুই, তিন, অথবা চার বিয়ে করো। কিন্তু যদি তুমি ন্যায় করতে না পারো, তবে কেবল একটি বিয়ে কর।' সুরাহ নিসা, আয়াত তিন। ইসলামই একমাত্র ধর্ম যেখানে এক বিয়ের কথা বলা হয়েছে। অন্য কোন ধর্মে সেটা নেই।"

"কে বলেছে? হিন্দুরা একটাই বিয়ে করে।"
"তাই? শ্রী কৃষ্ণের কয় বউ ছিল জানিস? শ্রী কৃষ্ণ কী মুসলমান ছিলেন?"
বন্ধু আমতা আমতা করতে থাকে।
"আমি এই জন্যই কোন ধর্ম মানি না।"

"বন্ধু, আবারও বলছি, তখনকার আরব সভ্যতায় ফিরে চল। তখন পুরুষেরা ব্যবসার কাজে শহর থেকে শহরে ঘুরতো, কাজেই দেখা যেত, হয়তো রোগাক্রান্ত হয়ে মারা গেছে অথবা দস্যুর হাতে নিহত হয়েছে। এছাড়া যুদ্ধে মৃত্যু ছিল তাঁদের বেশিরভাগেরই ভাগ্য। শিকারে গিয়েও অনেকে নিহত হতেন। তাহলে দেখা যাচ্ছে পুরুষ থেকে মেয়েদের সংখ্যা স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি ছিল। এত বিপুল সংখ্যক মেয়ে মানুষের দেখভাল করার জন্যই ছেলেদের চার বিয়ে পর্যন্ত করার অনুমতি দেয়া হয়েছিল।"
"মেয়েদের এমনিতেই সাহায্য করা যায়। বিয়ে করতে হবে কেন?"

"অবশ্যই মেয়েদের সাহায্য করা যায়। ইসলামই বলে যারা বিধবা নারীদের, এতিম শিশুদের সাহায্যে এগিয়ে আসেন, তাঁদের স্থান জান্নাত। কিন্তু ভাই, কাকে বোকা বানাচ্ছিস? তুই নিজেও পুরুষ। সুন্দরী মেয়ে দেখলে তোরও নিয়্যত বিগড়ে যাওয়াটা স্বাভাবিক। তোর কী ধারণা, একজন মহিলাকে কয়টা পুরুষ দিনের পর দিন নিঃস্বার্থভাবে সাহায্য করে যেতে পারবে? কিছু একটা বিনিময় সে চাইবেই। বাংলাদেশে যুবতী বিধবা বা ডিভোর্সীদের বাড়ির দরজায় প্রায়ই নানান বাহানায় প্রতিবেশী পুরুষেরা এসে কড়া নাড়ে। এটা আমিও যেমন জানি, তুইও জানিস। সে যুগে মেয়েদের অবশ্যই পুরুষদের উপর নির্ভর করতে হতো। তাঁদের বাইরে কাজ করার কোন সুযোগ ছিল না। যে সমাজে বিধবাদের আরেকবার বিয়ের সুযোগ দেয়া হতো না, সেই সমাজে প্রস্টিটিউজম একটা কমন ফ্যাক্ট ছিল। এখন তুইই বল, বেশ্যা হবার চেয়ে কী কারও ঘরের গৃহিনী হওয়া ভাল ছিল না? এবং ভুলে যাস না, স্বামীর উপর আল্লাহর হুকুম আছে, 'ন্যায়' করতে না পারলে দ্বিতীয় বিয়ে না করতে। এমন না যে কোন একজন বউকে আরেকজনের উপর প্রাধান্য দিতে পারবে। তাহলে তার জন্য এক বিয়েরই হুকুম আছে।”

“I am not convinced.”

"তোকে এই নিয়ে মাথা ঘামাতে কে বলেছে? তুই একটাই বিয়ে কর না। সমস্যা কী?"
সে কোন কথা বলল না।

বললাম, "আবারও বলছি বন্ধু, শর্টকাটে দুই চারটা আর্টিকেল এবং বই পড়েই নিজেকে বিরাট পন্ডিত ভেবে বসিস না। চিন্তা করতে থাক। আরও গভীরে গিয়ে পড়াশোনা করতে থাক। মনে প্রশ্ন আসলে সেই প্রশ্নকেই প্রশ্ন কর। তারপরে দেখবি অনেক কিছুর উত্তর তুই আপনাতেই পেয়ে যাবি।"

https://www.facebook.com/groups/canvasbd/

1 comments
Labels: ,

"বাচ্চা মারা গেছে? নিশ্চই পাপের শাস্তি!"

আপাত দৃষ্টিতে শফিক সাহেব একজন ভাল মানুষ। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। সারাদিন ছাত্র পড়িয়ে সন্ধ্যায় বাড়িতে এসে বিশ্রাম নেন। তাঁর স্ত্রীও একজন আদর্শ গৃহিনী। ঘর সামলাতে সামলাতেই তাঁর দিন চলে যায়। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালবাসার কোনই কমতি নেই, তবুও তাঁরা সুখী নন।

তাঁদের প্রথম সন্তান সাত বছর বয়সে পানিতে ডুবে মারা গেছে। দ্বিতীয় সন্তান একবছর বয়সে নিওমোনিয়ায় মারা গেল। তৃতীয় সন্তান মানসিক প্রতিবন্দ্বী। মা বাবা তাকে 'অটেস্টিক' বলে লোকজনের কাছে পরিচয় দেন। হয়তো নিজেরাও এ থেকে কিছুটা সান্তনা খুঁজেন।

এইরকম একটি পরিবারের কথা শুনলে আপনি, একজন বাঙ্গালি ‘সামাজিক প্রাণী’ হিসেবে সবার আগে কী চিন্তা করবেন?"নিশ্চই কোন পাপ করেছিলেন, যে কারণে এই শাস্তি!"আপনার কথা কী বলবো, সামাজিক প্রাণী হিসেবে আপনার কাজই হচ্ছে আলতু ফালতু কথা বলা। শফিক সাহেব এবং তাঁর স্ত্রী নিজেরাই তখন চিন্তা করবেন নিশ্চই তাঁরা জীবনে কোন বিরাট পাপ করেছেন, যে কারণে তাঁদের এমন শাস্তি দেয়া হয়েছে! তাঁরা তাঁদের স্মৃতির ডায়েরির পৃষ্ঠা প্রতিদিন উল্টে হাতড়ে বেড়াবেন, যদি কোন পাপের সন্ধান পান! কারণ স্বজ্ঞানে তাঁরাতো কোন পাপ করেননি!
অথবা ধরুন এক লোকের পরপর তিনটা সন্তান ‘মেয়ে’ হলো। তখন?

আমার শ্বশুরের দুইখানা সন্তান, এবং দুইজনই মেয়ে। তাঁকে তাঁর আত্মীয়রা সারাজীবন শুনিয়ে গেছেন (এখনও কেউ কেউ শোনান) তিনি ‘অভিশপ্ত।’ আমাকে সেদিন এক মেয়ে জানালো তাঁরা সব বোন, কোন ভাই নেই, এবং তাঁর বাবাকে আত্মীয়স্বজন তথা সমাজ বলে বেড়ায়, "পাপের শাস্তি! নাহলে ছেলে হবে না কেন?"

আরেকটা মেয়ে হাসিমুখে সেদিন বলছিল, "যেদিন আমার জন্ম হয়েছিল, আমার খালা ফুপুরা কান্নাকাটি করে হাসপাতালকে একদম মরা বাড়ি বানিয়ে ফেলেছিল! কেন মেয়ে হলো!"

আমি আবার একজনকে চিনি, যার সাত সাতজন সন্তান ছিল। বড় ছেলে মারা যায় শৈশবে, হাঁটা চলা ছেড়ে কেবল ছুটাছুটি করতে শিখেছিল বেচারা। দ্বিতীয় এবং তৃতীয় ছেলেও মারা যায় একদম দুগ্ধপোষ্য অবস্থায়। ইংরেজিতে যে বয়সের শিশুদের "ইনফ্যান্ট" বলে।তবে তাঁর চার মেয়েই বেঁচে ছিলেন। কিন্তু তাও আবার বেশিদিনের জন্য নয়। প্রথম তিন কন্যা সন্তানেরও কবর তাঁকেই দিতে হয়েছিল। মৃত্যুর সময়ে কেবল একজন মেয়েকেই জীবিত দেখে যেতে পেরেছিলেন। এবং সেই মেয়েও বাবার মৃত্যুর মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই পৃথিবী ত্যাগ করেন।

এই লোকের এই ভাগ্য দেখলে "বাঙ্গালি সামাজিক প্রাণীরা" কী বলবে?

কিছু বলার আগে তাঁর পরিচয় দিয়ে দেই। তিনি হচ্ছেন, হযরত মুহাম্মদ (সঃ), পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানব!
প্রতিটা সন্তানের মৃত্যুর ক্ষণে যিনি একটি কথাই বলতেন, "নিশ্চই আসমান জমিন সবকিছুর মালিক আল্লাহ। তিনি যখন যাকে যা খুশি দেবার ক্ষমতা রাখেন, এবং যখন যার কাছ থেকে যা খুশি কেড়ে নেবারও ক্ষমতা শুধুই তাঁর।"
মেয়ে সন্তান-ছেলে সন্তান নিয়ে নবীজির (সঃ) কোন পক্ষপাতিত্ব ছিল না। তিনি তাঁর কন্যাদের যেরকম স্নেহ করতেন, সেটা কিংবদন্তি হয়ে আছে। তাও আবার সেই আরব 'সভ্যতায়' যেখানে মেয়েদের জন্ম হলে পিতারাই তাঁদের নিয়ে যেতেন লোকালয়ের বাইরে, এবং তাঁদের জীবিত কবর দিয়ে আসতেন!

চৌদ্দশ বছরেও মানুষ সভ্য হতে শিখেনি। যেই দেশ মঙ্গলে যান পাঠায়, সেই দেশেই শিক্ষিত শ্রেণীর লোকজন "কণ্যা ভ্রুণ হত্যা" করে থাকে। বলছি প্রতিবেশী দেশের কথা। ব্যপারটা আশংকাজনক, কারণ তাঁদের দেশে যাই ঘটে, সেটাই কিছুদিন পরে আমাদের দেশেও ঘটে থাকে। পেটের ভিতরে অকারনে কন্যা সন্তান হত্যা করলে কী পাপ হয় না? ওদের কে বুঝাবে?

সন্তানের প্রাকৃতিক মৃত্যুতে নবীজি(সঃ) কিভাবে শক্ত থাকতে পারতেন? কারণ তিনি জানতেন তাঁর মালিক বিভিন্নভাবে তাঁকে পরীক্ষা করার ওয়াদা করেছেন। সুরাহ বাকারায় সেই মালিক (আল্লাহ) বলেছেন, "এবং আমি কিছু ভয়, ক্ষুধা, ধন-সম্পদ, জীবন এবং ফল-ফসলের ক্ষয়ক্ষতি দ্বারা অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা নেব। তুমি সেসব ধৈর্য্যশীলদের সুসংবাদ দাও, যারা বিপদের সময়ে বলে, 'আমরাতো আল্লাহরই এবং তাঁর কাছেই ফিরে যাব।' এরাই তাঁরা যাদের প্রতি তাঁদের মালিকের পক্ষ থেকে বিশেষ অনুগ্রহ ও করুণা বর্ষিত হয়, আর তাঁরাই সৎ পথে পরিচালিত।" (আয়াত নং ১৫৫-১৫৭ দেখে নিতে পারেন।)

আল্লাহ প্রশ্ন ফাঁস করে দিয়েছেন! স্পষ্ট বলে দিয়েছেন তিনি কিভাবে পরীক্ষা নিবেন! কখনও আমাদের ভয় এসে গ্রাস করবে। কখনও ক্ষুধার কষ্টে চোখে অন্ধকার দেখবো! ধনসম্পদ কখনও বেড়ে যাবে, আবার কখনও সব হারিয়ে পথের ফকির হয়ে যাব। কখনও নিজে বেঁচে গিয়ে প্রিয় মানুষদের মরতে দেখবো। আমাদের পরীক্ষা দিতে হবেই। এড়ানোর কোনই উপায় নেই। আমাদের কাজ হচ্ছে মাথা নত করে মালিকের হুকুম মেনে নেয়া। ব্যস! তাইলেই পাশ!
এবং আসল কথা হচ্ছে, এছাড়া আমাদের আরতো কোন উপায়ও নেই। আমার প্রিয় কেউ মারা গেছে, তাই আমি উপরওয়ালার সিদ্ধান্তের উপর অভিমান করে 'নাস্তিক' হয়ে গেলাম! এতে কী সে ফিরে আসবে? বরং এমন দোয়া করাটাই কী ভাল নয় যে "আমার বাকি প্রিয় মানুষদের এত দ্রুত আমার কাছ থেকে কেড়ে নিও না।"

মূল প্রসঙ্গে ফেরা যাক। আমাদের দেশে একজন মানুষের একটি সন্তান মারা গেলেই, অথবা কোন দূর্ঘটনা ঘটলে, কিংবা মেয়ে সন্তান হলে আমরা দল বেঁধে 'ব্যাক বাইটিং' শুরু করে দেই, "নিশ্চই কিছু একটা করেছে....পাপের ফল!"
তাহলে নবীজির (সঃ) সাত সাত জন সন্তান কেন এত অল্প বয়সেই মারা গেল? কেন উনার বংশধর মেয়ের মাধ্যমেই প্রবাহিত হলো? উনারতো কোন পাপের রেকর্ড চোখে পরেনা!

একজন মানুষের ক্যানসার বা এইরকম ভয়াবহ কোন রোগ হলে আমরা অতি সহজেই বলে দেই, "পাপের শাস্তি!"
তাহলে আপনার প্রিয়জনদের অথবা আপনার নিজের যখন একই রোগ হয়, তখন কেন চুপ করে থাকেন?
মজার ব্যপার হলো, আমি এমন অনেককেই চিনি, যারা সারাজীবন মানুষের দূর্বলতা, মানুষের খুঁত ধরে কথা শুনিয়েছেন। মানুষের মনে আঘাত দিয়ে মজা লুটেছেন। পরবর্তী সময়ে একটা একটা করে সবকিছুই তাঁর জীবনে ঘটেছে। What goes around, comes around আর কি। তারপরেও তাঁরা শুধরান না। বিরতিহীনভাবে পরনিন্দা চালু থাকে।

যখন আমাদের প্রতিকূলে সব যেতে শুরু করে, মনে হয় আমাদের বুঝি আল্লাহ পছন্দ করেন না। অথচ একটু চোখ খুলে তাকালেই দেখতে পেতাম আমার চেয়েও অনেক খারাপ অবস্থায় লক্ষ লক্ষ মানুষ বেঁচে আছে। "সবকিছুতেই সফল" টার্মটা কেবল হিন্দি-বাংলা সিনেমার নায়কদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। বাস্তবে এর কোন অস্তিত্ব নেই।

"আমি এটা পেলাম না, ও ওটা পেয়ে গেছে!" - না ভেবে বরং এইটা ভাবুন, "আমার এটা আছে, ওর সেটা নেই!"
একজন চরম ঐশ্বর্য্যশালী ব্যক্তির সাথে মিশে দেখুন, পারিবারিক সুখ কী, তা তিনি জানেন না। টাকা পয়সার অভাব নেই জীবনে, কিন্তু স্ত্রী-পুত্র-সন্তানদের সাথে তাঁর সেইরকম বন্ধন নেই। আবার উল্টো দিকে, একজন সাধারণ মধ্যবিত্তের হয়তোবা টাকা পয়সা নেই, কিন্তু তিনি যা বলেন, তাই তাঁর সন্তানরা অতি শ্রদ্ধার সাথে পালন করে।
শফিক সাহেবের তিন সন্তানের ক্ষেত্রে যা ঘটেছে - আপনার সন্তানদের ভাগ্যে ঘটেনি বলে আল্লাহকে ধন্যবাদ জানান! এবং দোয়া করুন আপনার সন্তানের ক্ষেত্রে যেন তা না ঘটে।

আবার শফিক সাহেবের পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে বলতে গেলে, আমরা জানিনা আমাদের ভবিষ্যতে কী আছে। আল্লাহ বলেন, ভবিষ্যতের মালিক শুধুই তিনি। এবং তিনি অবশ্যই আমাদের জন্য যা ভাল, সেটাই করেন।
কে জানে, তাঁর একটা ছেলে বড় হয়ে কালা জাহাঙ্গীরকেও ছাড়িয়ে যেতে পারতো।

আপনার ছেলে দেশের শীর্ষ সন্ত্রাসী, এইটা বেশি কষ্টকর, নাকি আপনার ছেলে শৈশবেই মারা গেছে - এই অনুভূতি বেশি কষ্টকর? এরশাদ শিকদারের মা বেঁচে থাকলে তাঁকে প্রশ্নটা করা যেত।

কাজেই, অতীতে যা ঘটে গেছে, সেটা নিয়ে আফসোস করতে করতে নিজের বর্তমান ও ভবিষ্যতকে শুধু শুধু নষ্ট করা কেন?

আমি মৃত্যু দিয়ে উদাহরণ দিলেও, যেকোন রকমের বিচ্ছেদ কিংবা ক্ষতির জন্য উপরের কথাগুলো প্রযোজ্য।
Post Written by:মঞ্জুর চৌধুরী

0 comments
Labels: , ,

নোবেল পাওয়ার সহজতম উপায়

"এই মিয়া! তুই না বলেছিলি কুরআন শরীফ পড়লে বিপদ আপদ এড়ায় চলে? আমিতো এখন নিয়মিত কোরআন পাঠ করি। তাহলে আমি কেন রেগুলার বিপদে পড়ি?"
"তুই যে কোরআন পড়িস, সেটা কি শুধুই আরবীতে? নাকি বাংলায় অর্থ বুঝে?"
"আরবীতে। বাংলায় অর্থ বুঝে পড়তে অনেক সময় লাগে।"

হেসে বললাম, "এখানেইতো গন্ডগোল করে ফেলেছিস। কী পড়ছিস, কেন পড়ছিস কিছুই বুঝতে পারছিস না।"
"সেটা বিষয় না। বিষয় হচ্ছে, আমি ডেইলি নামাজ পড়ি। ডেইলি কোরআন শরীফ পড়ি। তারপরেও দুইদিন পরপর আমার জীবনে নানান বিপদ আসে কেন?"
"বন্ধু, আমি তোকে তিনটা গল্প শোনাবো। কোরআন শরীফ থেকে। গল্পগুলো হয়তো তুই জানিস, তারপরেও আজকে তোর মেমোরী রিফ্রেশ করার প্রয়োজন আছে।"
"গল্প শুনলে কি আমার বিপদ কাটবে?"

"অবশ্যই কাটবে। প্রথম গল্পটা হযরত ইব্রাহীমের(আঃ)। তিনি যখন ইসলাম প্রচার শুরু করলেন, তখন তাঁকে শাস্তি দেয়ার জন্য বিরাট একটা অগ্নিকুন্ড তৈরী করা হলো। তাঁকে সেই আগুনে ফেলা হবে। সেই আগুনের এতই তেজ ছিল যে তার অনেক অনেক উপর দিয়েও কোন পাখি উড়ে যেতে পারছিল না। কেমন বিপদ চিন্তা কর! এই সময়ে হযরত ইব্রাহীম (আঃ) একটা কাজ করলেন, যেটাতে তাঁর বিপদ সাথে সাথে কেটে গেল।"
"কী কাজ?"

"সেটা বলছি। তার আগে হযরত ইউসুফের (আঃ) ঘটনা বলে নেই। তাঁকে তাঁর ভাইয়েরা মেরে ফেলার জন্য পরিত্যাক্ত কুয়ায় নিক্ষেপ করেছিল। সেখান থেকে তাঁকে ক্রীতদাস ব্যবসায়ীরা দাস হিসেবে বিক্রি করে দিয়েছিল। সেখান থেকে তিনি মিথ্যা অভিযোগে জেলে বন্দী হলেন। বিপদের পর বিপদ। তিনিও সেই কাজটিই করলেন, যেটা হযরত ইব্রাহীম (আঃ) করেছিলেন। এবং তাতে কাজ হলো। তাঁর বিপদও কেটে গেল!"
"কী সেটা? আয়াতুল কুরসী পড়েছিলেন?"

"বলছি দাঁড়া। আগে মূসার (আঃ) ঘটনাটাও বলে নেই। তিনি যখন তাঁর অনুসারীদের নিয়ে মিসর ছেড়ে যাচ্ছিলেন, ফিরাউনের সেনাবাহিনী তাঁদের হত্যা করতে পেছন থেকে তেড়ে আসছিল। সামনে সমুদ্র, পিছনে ফিরাউন - মূসার (আঃ) উম্মতরা বলল, 'হে মূসা (আঃ)! আজকে আমরা শেষ!' হযরত মূসাও (আঃ) তখন তাঁর পূর্ব পুরুষদের পন্থা অবলম্বন করলেন। এবং তাঁরও কাজ হলো।"
"তুই কী আদৌ বলবি কী করেছিলেন তাঁরা?"

"তাঁরা তিনজনই বিপদে ঘাবড়ে যাননি। মাথা ঠান্ডা রাখলেন। তাঁরা তাঁদের মালিকের উপর ভরসা রাখলেন। তিনিই তাঁদের বিপদ থেকে রক্ষা করলেন। বিপদে পড়াটা মোটেও চিন্তাজনক নয়, বরং বিপদে ভয় পাওয়াটাই বেশি বিপজ্জনক। তোর যদি বিশ্বাস থাকে তোকে আল্লাহ বিপদ থেকে উদ্ধার করবেন, তাহলে দেখবি, বিপদে তুই একদমই ভয় পাচ্ছিস না। ভয় না পেলেই দেখবি তুই ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করতে পারছিস। তাহলে দেখবি তোর খারাপ সময় কেটে যাচ্ছে।"

"এইসব শুনতে ও বলতে সহজ। আসল জীবনে অ্যাপ্লাই করা অনেক কঠিন।"
"তোকে তিন নবীর গল্প যখন বললাম, আমাদের নবীজির (সাঃ) ঘটনা কেন বাদ যাবে? তিনি যখন ইসলাম প্রচার শুরু করেন, তখন তাঁর আপনজনেরাই তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করে। তাঁকে হত্যা করতে লোক লাগায়। তিনি মদিনায় পালিয়ে যান। মদিনায় পালাবার পথে তিনি এবং তাঁর একমাত্র সঙ্গী আবুবকর (রাঃ) একটা গুহায় আশ্রয় নেন। কুরাইশরা তাঁদের অনুসরণ করে গুহা পর্যন্ত পৌছে গিয়েছিল। তাঁরা তাদের কথাবার্তা, চলা ফেরার শব্দ স্পষ্ট শুনছিলেন। হযরত আবুবকর (রাঃ) নবীজির (সাঃ) জীবন নিয়ে শঙ্কিত হলেন। নবীজি (সাঃ) তখন তাঁকে আশ্বস্ত করতে তাঁর পূর্বপুরুষদের মতই বললেন, 'সেই দুইজন ব্যক্তির কীই বা বিপদ হতে পারে যখন তাঁদের সাহায্যকারী তৃতীয়জন হিসেবে স্বয়ং আল্লাহ সুবহানাল্লাহু ওয়াতাআলা পাশে থাকেন?'"
"আমীন।"

"এইজন্যই কোরআন শরীফ আরবীর সাথে সাথে বাংলায়ও পড়তে বলি। পড়লে দেখতি প্রতিটা নবী রাসূলদের কী কঠিন সময়ের মধ্য দিয়েই না আল্লাহ পার করেছেন! তাঁদের প্রত্যেককে নানান বিপদ আপদ দিয়ে তিনি পরীক্ষা করেছেন। তাঁরা প্রত্যেকেই কঠিন সময়ে ধৈর্য্য ধরেছেন। তাঁরা আমাদের মানুষদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম। যখন তাঁদেরকেই আল্লাহ কোন ছাড় দেননি, তুমি আমি সেখানে কী এমন রসগোল্লা? অবশ্যই আমাদের জীবনেও বিপদ আসবে, আমরাও অনেক কিছু পেয়ে হারাবো, আবার হারিয়ে হারিয়ে পাব। কিন্তু তাই বলে সামান্য টুকিটাকি বিপদে ঘাবড়ালে চলবে? সহজ কথা, যদি দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায়, তবু হাসিমুখে যেন বলতে পারি, 'সেই দাসের কী ভয় যখন তার মালিক স্বয়ং তাঁর সাহায্যকারী!' কুরআনের অসংখ্য শিক্ষার মধ্যে এটি অন্যতম প্রধাণ শিক্ষা।"

"মজার ব্যপার কি জানিস? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও একই কথা লিখে গেছেন। 'বিপদে মোরে রক্ষা করো, এ নহে মোর প্রার্থণা, বিপদে আমি না যেন করি ভয়!' এই বাণী বিদেশীদের এতই পছন্দ হয়েছে যে তাঁকে নোবেল পর্যন্ত দিয়ে দিল।"
"হাহাহা। তাহলেই দেখ, তোকে নোবেল পাওয়ার ফর্মূলা দিয়ে দিলাম। ঠিকঠাক মত কুরআন হাদীস মেনে চল, দেখবি হয়তো কোন একদিন শান্তিতে নোবেল পুরষ্কার পেয়ে গেছিস!"

Post Written by:মঞ্জুর চৌধুরী

0 comments