শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু

যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহ তা' আলার যিনি সকল সৃষ্টি জগতের পালনকর্তা।

মুহাম্মদ (সাঃ)-আল্লাহর রাসূল

মুহাম্মদ (সাঃ)-সকল মানুষের জন্য উদাহরন, সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ, ও আল্লাহর রাসুল

আল কোরআন - মহান আল্লাহ প্রদত্ত কিতাব

এ সেই কিতাব যাতে কোনই সন্দেহ নেই। পথ প্রদর্শনকারী পরহেযগারদের জন্য,

আমাদেরকে সরল পথ দেখাও

আমরা একমাত্র তোমারই ইবাদত করি এবং শুধুমাত্র তোমারই সাহায্য প্রার্থনা করি।

আল্লাহ নিতান্ত মেহেরবান ও দয়ালু

সে সমস্ত লোকের পথ, যাদেরকে তুমি নেয়ামত দান করেছ। তাদের পথ নয়, যাদের প্রতি তোমার গজব নাযিল হয়েছে এবং যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে।

Labels: , , ,

কিভাবে আমার চরিত্রের উন্নতি করবো?

প্রথম কথা হল হারাম কাজ পরিত্যাগ করা। মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকা। মন্দ কাজ থেকে বিরত হবার আগ পর্যন্ত ভালো কথা বলতে যেও না। কারণ তুমি শরীরের ক্ষতস্থানে রক্ত প্রবাহিত অবস্থায় ঔষধ দিলে সেটা ফলপ্রসু হবে না আর মন্দ কাজ বা পাপ থেকে বিরত না হয়ে ভালো কথা বললেও সেটা ফলপ্রসু বা দীর্ঘস্থায়ী হবে না।

এক্ষেত্রে সর্বপ্রথম তোমাকে আনন্দের মধ্য দিয়ে যে বদ অভ্যাস গড়ে তুলেছ তা থেকে বিরত থাকতে হবে। মুভি দেখা বাদ দিতে হবে, রাস্তায় চলমান অবস্থায় চক্ষুকে অবণত করতে হবে-কারণ নারীর প্রতি তোমার প্রত্যেকটা চাহনির সাথে তোমার মানবিক গুনকে নষ্ট করে ফেলছ। তুমি একজন নারীর দিকে এমনভাবে তাকাও যেন সে একটা খাবারের টুকরা, যেন সে একটা প্রাণী- আর এটাই প্রমাণ করে যে তুমি একজন মানুষকে তাঁর মানবিক অবস্থানমূলক সম্মানের জায়গাকে অপমানিত করছ। এটাই প্রমাণিত করে যে তুমি নিজেই এক প্রাণীতে পরিণত হয়েছ।

সুতরাং চারিত্রিক উন্নতি করতে হলে তোমাকে অবশ্যই প্রথমে সেই মানবিকতা ফিরিয়ে আনতে হবে এবং তারপর তোমার জীবনকে ভালো কাজ দিয়ে সুশোভিত কর, তাকে সৌন্দর্যমন্ডিত কর।
নিজেকে ভালো করে গড়ে তুলার ক্ষেত্রে ছোট ছোট পদক্ষেপ নিতে থাকো – যেমন , সুন্দর ও পারফেকটভাবে সালাত আদায় কর, কিছু প্রয়োজনীয় দোয়া মুখস্ত করা, কাজের ক্ষেত্রে সততা বজায় রাখা, পিতা-মাতার প্রতি সদয় হওয়া। আর এগুলো তেমন কিন্তু তেমন কঠিন কাজ নয় - চাইলেই পারো।

আল্লাহ আমাদের কাছ থেকে এইগুলোই প্রত্যাশা করেন।

কেউ প্রশ্ন করতে পারে আল্লাহ কেন আমাদের কাছে এগুলো প্রত্যাশা করেন, এগুলো কি তাঁর কোন উপকারে আসে?

এর উত্তরে বলা যায়- আমরা জানি আল্লাহর একটি নাম হল “গনী” যার অর্থ যিনি ধনী, এমন ধনী যে যার আর কোন কিছুরই দরকার নেই কারো কাছে। অর্থাৎ চূড়্রান্ত ধনী। তাহলে কি আমরা বলতে পারি যে আল্লাহর আমাদের কাজ দরকার? নাহহহহ।

তাহলে?

বরং একাজগুলো আমাদেরই দরকার, কারণ আমরাই কিন্তু দূর্নীতিগ্রস্থ, আমরাই পাপী, আমরাই মন্দ কাজ করে আমাদের চরিত্রকে ধ্বংস করে ফেলেছি। এ কারণেই আল্লাহ এসব ভালো কাজ করতে বলেছেন যাতে তুমি উত্তম হতে পারো, হতে পারো ধনী-তিনি তোমার চাহিদা পূরণ করে দিবেন, তোমার উপর রহমত ও দয়া বর্ষণ করবেন।

ভালো কাজ আমাদের শুধু উপকারই করে না বরং এগুলো আমাদের জন্য ঔষধস্বরুপ; কিন্তু এর অধিক উপকারিতা হল এই যে - ভালো কাজ আমাদের দুনিয়াতেও উপকার করে আবার আখিরাতেও বোনাস হিসেবে উপকার করবে। সুবহানাল্লাহ !!

যেমন তুমি তোমার মায়ের প্রতি অসত ছিলে, মন্দ ছিলে কিন্তু যখনই তুমি সৎ ব্যবহার করতে শুরু করলে তোমারও জীবনে কল্যাণ আসতে শুরু করল। এটা তোমার মায়ের প্রতি ভালো ব্যবহারের একটা প্রতিদান দিয়েছেন আল্লাহ।

এভাবে তুমি যতই তুমি ভাল কাজ করবে, সেই ভালো কাজগুলো তোমার আরো বেশি কল্যাণের পথ দেখিয়ে দিবে। এভাবেই আল্লাহ তোমার প্রতি এই দুনিয়ার সদয় হন। যে ব্যক্তি আল্লাহর ব্যাপারে সদা-সচেতন হয়, আল্লাহ তার জন্য অবারিত ধারায় উত্তম পথের সন্ধান দিয়ে দেন, তার কল্যাণের জন্য। আল্লাহ তার জন্য এমন জায়গা থেকে প্রতিদান দেন যা সে কল্পনাও করতে পারত না- এর কারণ সে আল্লাহর ব্যাপারে সচেতন হয়েছে, আর আল্লাহও তার প্রতি সর্বদা খেয়াল রাখেন। আল্লাহ আমাদের কাছে এই ভালো কাজগুলো চান এবং এর বিনিময়ে তিনি আমাদের জীবনকে আরো উত্তম করে দেন, আরো সহজ করে দেন।

আল্লাহ তোমাদের বোঝাকে হালকা করতে চান, যেহেতু মানুষকে দূর্বল(রুপে)করে সৃষ্টি করা হয়েছে।(সূরা নিসা - ২৮)

তুমি কি মনে করো আড্ডা দিয়ে, গীবত করে , মিথ্যা বলে, ফেইসবুকে মেয়েদের সাথে চ্যাট করে জীবন সহজ হবে ? বরং তুমি তোমার জীবনকে আরো অধিক কষ্টদায়ক করছ, জীবনকে অধিক ভারী করে তুলছ।। আল্লাহ তোমার জীবনকে সহজ করতে চান, তোমার বোঝাকে নামিয়ে নিতে চান, কিন্তু তুম বুঝতে পারছ না,- কারণ তুমি খুবই দূর্বল; কিন্তু আল্লাহ ‘গানী’ বা ধনী – আর তাই ঐ ধনীর(আল্লাহর)কাছে যাও এবং তাঁর নির্দেশনা মেনে নিয়ে নিজের অভাব পূরণ কর।

# Help Taken From The Lecture - Tips To Improve Your Character by Ustadh Nouman Ali Khan

# সম্পূরক লেকচার হিসেবে শাইখ সালেম আল-আমরী এর Effects of Sins লেকচারটি অবশ্যই দেখার অনুরোধ করব। এখানে পাপের কেন করি-কারণ, পাপের বিভিন্ন ধরণ এবং বিশেষত ইবনুল কাইয়্যুম(র) এর একটি চমৎকার বই থেকে পাপ থেকে কিভাবে বেঁচে থাকা যায় সেগুলো বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়েছে প্র্যাক্টিক্যাল উদাহরণসহ।

http://www.youtube.com/watch?v=cTM8cKGme-8

0 comments
Labels: , , ,

আপনার চরিত্রই আপনার সর্বশ্রেষ্ট দাওয়াহ।

ভাবতে পারেন কথাটুকুর গুরুত্ব কতটুকু?...কি বুঝতে পারছেন না?- এতটুকুই জেনে রাখুন যে মানুষের এই চারিত্রিক ব্যবহারের কারণেই কেউ জান্নাতে যাবে আবার কেউ বা জাহান্নামে যাবে--- এবার কিছুটা উপলব্ধি করতে পারছেন তো।

রাসূল (সা) এর ঐ হাদীসটা মনে আছে না – এক ব্যক্তি রাসূল (সা)কে প্রশ্ন করল হে আল্লাহর রাসূল(সা)- একনারী সালাত আদায় করে প্রচূর, যাকাতও দেয় এবং অন্যান্ন নফল আমলও করে প্রচূর কিন্তু সাথে প্রতিবেশির সাথে দূর্ব্যবহারও করে- তার ব্যাপারে আপনার মত কি? – রাসূল (সা) বললেন – সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।

আবার জিজ্ঞেস করলেন – একনারী ফরজ সালাত আদায় করে, ফরজ যাকাত দেয় এবং অন্যান্ন ফরজগুলোও ঠিকমত আদায় করে কিন্তু নফল তেমন করে না এবং প্রতিবেশির সাথে উত্তম ব্যবহার করে, তার ব্যাপারে আপনার মত কি? – রাসূল (সা) বললেন সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।

রাসূল (সা) এর মাঝেই আমাদের জন্য উত্তম আদর্শ রয়েছে তাই না? – সেই আদর্শ কি?

--চারিত্রিক সৌন্দর্য ও গুনাবলীর পরিপূর্ণ বিকাশ সাধনের জন্যই আমি প্রেরিত হয়েছি। – মুয়াত্তা ইমাম মালেক

--নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রে অধিষ্ঠিত। (সূরা কালাম-৪)

--নিঃসন্দেহে কিয়ামতের দিন মু’মিনের পাল্লায় যে জিনিসটি অধিক ভারী হবে তা হলো উত্তম চরিত্র। আর নিঃসন্দেহে আল্লাহ অশ্লীলভাষী ও নির্লজ্জ ব্যক্তির প্রতি শত্রুতা পোষণ করেন। – তিরমিযী

--মুমিনদের মধ্যে পরিপূর্ণ ঈমানদার হচ্ছে সে ব্যক্তি, যে তাদের মধ্যে সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী। (আহমাদ, আবু দাউদ, তিরমিযী)

এখন আমরা যারা ফেইসবুক ব্যবহার করি, বা কাউকে পছন্দ করি না --- এইসব ব্যবহারের দিকটা কি লক্ষ করেছি? – ফেইসবুকে কেউ কারো সাথে দ্বিমত করলেই কাফির ফতোয়া দেই, ইহুদিদের দালাল বলে ঘোষণা দেই, মন্দ ব্যবহার করি, গালি দেই... আপনি কি রাসূল (সা) কে দেখেছেন কখনো কারো সাথে মন্দ ব্যবহার করতে? – নাহহহহ। তাহলে তিনি যদি আদর্শ হন আমাদের- তাহলে ফেইসবুকে গালি দেই কেন?, দ্বিমত পোষণ করলে তার সাথে মন্দ ব্যবহার করি কেন? অথচ আপনি জানেন মন্দ ব্যবহারের কারণে মানুষ জাহান্নামে যাবে...

আরবীতে তথ্যের কোন উপকার নেই জানেন? একারণে আপনি ঈমান আনার সাথে সাথে আমালের কথা বলা হয়েছে কোরআনের অনেক আয়াতে। আপনি ঈমান আনলেন, আপনার কাছে প্রচূর ইসলামী জ্ঞান আছে ...আপনার কোন লাভ নেই যদি তা পালন না করেন।

সর্বশেষ আরো একটি হাদীস মনে রাখুন – রাসূল (সা) বলেছেন ; কিয়ামাতের দিন সর্বনিকৃষ্ট হবে ঐ ব্যক্তি যার কর্কশভাষার জন্য(মন্দ ব্যবহারের কারণে) লোকেরা তাকে এড়িয়ে চলবে।

(অথচ আপনি এখান থেকে দুটি জিনিস অর্জন করতে পারেন – কেউ আপনার প্রতি মন্দ ব্যবহার করলেও তার প্রতি মন্দ ব্যবহার না করে উত্তম চরিত্র অর্জন করা এবং সবর শিক্ষা করা – দুটী সাওয়াব পাচ্ছেন)।

আল্লাহ আমাদের উত্তম চরিত্র অর্জন করার তাওফিক দিন।

0 comments
Labels: , ,

মিউজিক \ গান কি এতই খারাপ...?

আমার মতে, বর্তমান সময়ে মিউজিক হল নৈতিক অবক্ষয়ের অন্যতম সহজ উপায়। বর্তমানে মিউজিক হল অডিও পর্ণগ্রাফি। এটা সত্যিই তাই। এটা স্পষ্টতই অশালীন এবং অভদ্র। এটা আপনার মধ্য থেকে মনুষ্যত্ব দূর করে দেয়, এটা আপনাকে নারীকে ভোগ্যপণ্য ভাবতে শিখায়, এমনকি ভোগ্যপণ্য থেকেও নিকৃষ্ট ভাবতে শিখায়। পশুর চেয়েও খারাপ ভাবতে শিখায়। এরা নারী সম্পর্কে এমন ভাবে কথা বলে যেন নারীরা পশু। সত্যি। এটা নারীকে ভোগ্যবস্তু রূপে পেশ করে, আমি বিশেষ ভাবে লক্ষ্য করেছি যে, আমার পরিচিতদের মাঝে অনেকেই এমন যারা মুসলিম, কিন্তু তারা “হিপ হপ” সংস্কৃতিতে আকৃষ্ট। তাদের অনেকেই গানগুলো হিফয বা মুখস্ত করে ফেলে, তাইনা? তারা গানগুলো মুখস্ত করে এবং পূর্ণ তাজ্বীদ এর সাথে গানগুলো গাইতেও পারে, তাইনা? এবং তাই তারা এটা করে এবং গান গুলোর ভাষা খুবই কদর্য, খুবই ভয়াল, ভয়াল, ভয়াল নিম্নমানের ভাষা। 

আপনাদের কি আর বলব, আমার একমাত্র মতামত এটাই যে, আপনার যদি আল্লাহের কিতাবের প্রতি বিন্দুমাত্রও শ্রধা থাকে, যদি আপনি সত্যি বিশ্বাস করেন যে এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে নাজিল হয়েছে, “বি সালিস্মুল ফুসুকু বা’দাল ঈমান”, এমন কি খারাপ জিনিষ এর নাম, এর উল্লেখ, এ শব্দ ব্যবহার করাও ভয়াবহ, যদি আপনার বিশ্বাস থেকে থাকে। এমনকি কোন ভয়ানক খারাপ জিনিষ এর উল্লেখ করাও আপনার জন্য ক্ষতিকর, যদি আপনার বিশ্বাস থেকে থাকে। আপনার জিহব্বা/ভাষা অবশ্যই পরিষ্কার রাখতে হবে। আপনাকে বলতে হবে- “কুল্লি ইবাদুল ইয়াকুলুললাতি হিয়া আহসান” – আমার বান্দাদেরকে বলুন তাই বলতে যা সবচেয়ে ভাল। সবচেয়ে ভাল কথা বলুন। আপনার জিহবা দিয়ে ভাল কথা বলুন। এটাই হল প্রথম ধাপ। যখন আপনি কদর্য কথা বলেন এবং এমন কথা বলেন যা আমাদের জন্য আল্লাহের নির্ধারিত নৈতিক মাপকাঠির সরাসরি বিপরীতে, তখন খুব স্পষ্টতই আপনি আপনার স্বাভাবিক বিশ্বাস থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন, আল্লাহের পথে চলার প্রবণতা থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন। আপনি যখন বিরতিহিন ভাবে এসব আবর্জনা শুনতে থাকেন, তখন আপনি পথভ্রষ্ট হয়ে যান, তখন আল্লাহ কে অমান্য না করলে আপনার ভাল লাগেনা, আর এটাই হল হৃদয়ের অসুখের লক্ষণ। তাই অবশ্যই তাকে এর থেকে দূরে আস্তে হবে। এটাই প্রথম পদক্ষেপ। 

আমি আপনাদের কে বলব, যদিও এটা আমার ব্যক্তিগত বিবেচনা, এটা কোন ফতওয়া নয়, এটা আমার ব্যক্তিগত বিশ্লেষণ, আপনাকে এটা মানতেই হবে এমন নয়, কিন্তু যদি কোন মানুষের দীর্ঘদিন “হিপ হপ ” মিউজিক আর এটা ওটা শোনার পর তার কাছে কুরআন শুনাকে বিরক্তিকর মনে হয়, যখনই কেউ গাড়িতে কুরআন তেলাওয়াত চালু করে, জানেন তারা কি বলে? “ওহ এটা বন্ধ কর, আমি শুধু কথা বলতে চাই”। আর কুরআন শোনা মাত্রই তারা তাৎক্ষনিকভাবে বিরক্ত হয়ে উঠে, এর আসল মানে হল তারা শয়তানের কব্জায় চলে গেছে, এবং তারা বিরতিহীন ভাবে এই মানুষটিকে কুবুদ্ধি দিচ্ছে। শয়তান কন জিনিষটিকে সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করে? তারা কুরআন কে সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করে। তারা আল্লাহের বানীকে ঘৃণা করে। তারা পালিয়ে যায়- কারন এটা তাদের জন্য ক্ষতিকর। তাই তারা কি করে জানেন? যেহেতু মানুষটি এদের কব্জায় আছে, এর হৃদয় তাদের কব্জায় আছে, তারা তার হৃদয়ে খোঁচা দিতে শুরু করে যখন সে কুরানের বানী শুনে, আর সে বলে “আহহ আমি এটা শুনতে চাইনা”। এটা সার্জারি করার মত, এটা যেন দাঁত তোলার মত যন্ত্রণাদায়ক মনে হয়। এটা সত্যিই ঘটে। আপনি যখন এরকম মানুষকে আল্লাহের বানীর কথা স্মরণ করিয়ে দিবেন, তারা বিরক্ত হবে, উত্তেজিত হবে, যেন তাদের এটাতে এলারজি আছে। এর কারন? কারন তারা শয়তান কে তাদেরকে কব্জা করার সুযোগ দিয়েছে। তাদেরকে বিতাড়িত করতে হলে, প্রথমে যে কাজটি করতে হবে তা হল, তাদেরকে জ্বালানি সরবরাহ করা থেকে বিরত হওয়া। মিউজিক এর জ্বালানী। এভাবে উদ্দেশ্যহীন সময় নষ্ট করাটাই, শয়তান এর জ্বালানী। 

তারা এটাই পছন্দ করে যে, আপনি যেন সময় নষ্ট করেন। তারা এটাই ভালবাসে। কারন, আল্লাহ সমগ্র মানবজাতিকে একটি মাত্র সম্পদ, শুধু একটি মাত্র সম্পত্তি প্রত্যেককে দিয়েছেন, আর তা হল সময়। আর মিউজিক, টিভি, ইউটিউব, ফেসবুক, মাই স্পেস, টুইটার এসব কি? আপনি যদি এগুলোর পিছনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নষ্ট করেন, এটা আপনার সময় নষ্ট করা ছারা আর কি হতে পারে? এটা আপনার সম্পদকে নষ্ট করে দিচ্ছে, আর শয়তান এর থেকে অন্য কোনকিছুই বেশি ভালবাসেনা। আল্লাহ’তালা আপনাদেরকে এই ধরনের প্রবৃত্তি থেকে বিরত থাকার শক্তি দান করুন। আমার পরামর্শ হল, আমি বার বার এই পরামর্শই দেই, তা হল- ভাল বন্ধু জোগাড় করুন। এমন বন্ধু জোগাড় করুন যারা এসবে আসক্ত নয়, এবং তাদের সাথে বেশি বেশি সময় কাটান। ইনশাল্লাহ আপনি নিজেকে এ ধরনের অভ্যাস থেকে মুক্ত করতে পারবেন।

0 comments
Labels: , , ,

সালাতঃ ব্যক্তিত্ব পরিবর্তনকারী এক ইবাদাত

হে মুমিনগণ! তোমরা রুকু কর, সেজদা কর, তোমাদের পালনকর্তার ইবাদাত কর এবং সৎকাজ সম্পাদন কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। (সূরা আল-হাজ্জঃ আয়াত ৭৭)

(এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলছেন) আমি তোমাদের শিখিয়ে দেই কিভাবে আল্লাহকে যথাযথ স্বীকৃতি দিতে হয়। ঠিক এভাবেই আল্লাহর মর্যাদার যথাযথ মূল্যায়ন করতে হয়। রুকূ’ কর এবং সিজদাহ কর। এই দুটি কাজই কিসের প্রতি ইঙ্গিত করছে? সালাত।

(আল্লাহ বলছেন) তোমার উচিত আমাকে যথোপযুক্ত স্বীকৃতি দেওয়া। আর এর জন্যে প্রথম পদক্ষেপ হল সালাত আদায় করা

আমরা আমাদের নামাযকে কতটা গুরত্ব দেই তা থেকে বুঝা যায় আমরা আল্লাহকে কতটা মর্যাদা দেই। আমরা কতটা সক্রিয় এবং সতর্ক ঘুম থেকে উঠে নামায পড়ার ব্যাপারে, মসজিদে যেতে কতটা আলসেমি লাগে, কুর'আনের তিলাওয়াত আকর্ষণীয় না হলে আমরা কতটা বিরক্ত অনুভব করি... এসব ব্যাপারই বলে দেয় আল্লাহর কাছে আমাদের অবস্থান কোথায়।

যে আসলে নামায সম্পর্কে জানে না, মুসলিমদের প্রার্থনার ব্যাপারে যার কোন ধারণা নেই... একজন Non-Muslim, সে যদি হঠাৎ করে কিছু মুসলিমদের নামায পড়তে দেখে তবে সে খেয়াল করবে এই মানুষগুলো মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে অর্থাৎ তারা কারও প্রতি তাদের হীনাবস্থা প্রকাশ করছে। এরপর তারা মাথাসহ অর্ধেক শরীর ঝুঁকিয়ে ফেলে। ওয়াও! তারা আরও বিনয়ী হয়ে উঠেছে। তারপর যখন তারা দাঁড়িয়ে পড়ে এরপর কী হয়? সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে! তারা সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করছে! অন্য কথায় সে খেয়াল করবে আল্লাহর প্রতি সম্মান প্রদর্শনে তারা প্রতিনিয়ত অগ্রসর হচ্ছে... তারা যার ইবাদত করছে তাঁর প্রতি তারা আরও বেশি আজ্ঞাবহ হচ্ছে।দেখে মনে হবে তারা তাদের প্রভুকে সম্মান প্রদর্শন করছে...আরও সম্মান প্রদর্শন করছে... আরও বেশি সম্মান প্রদর্শন করছে। সালাতের এই অগ্রসরতা আমাদের শিক্ষা দেয় যে আল্লাহর প্রতি আমাদের বিনয়াবনত অবস্থা বেড়ে উঠা উচিত, বিকশিত হওয়া উচিত।

মূল ধারণাটি হল, আমরা আল্লাহর যত ইবাদত করবো ততোই বিনয়ী হয়ে উঠবো। আর বিনয়ের সর্বোচ্চ অবস্থা ছিল সিজদাহ।এরপর যা করা উচিত... কারণ এই দুটি জিনিস (রুকূ ও সিজদাহ) মূলত সালাতের প্রতিই নির্দেশ করে। কিন্তু নামাযের মধ্যবর্তী অবস্থা গুলোতে কী করা উচিত? “নিজেদের আল্লাহর দাস হিসেবে দায়বদ্ধ কর এবং তোমাদের রবের ইবাদত কর” - অন্য কথায় রুকূ’ এবং সিজদাহ করা তো হল এখন নামায তো একমাত্র ইবাদত নয়। আপনারা জানেন ইবাদতের মানে এর চেয়ে অনেক বেশি।

ইবাদত এক ধরনের জীবনাচরণ। আমি একজন দাস। আমি এখানে দাসত্বের জন্যে এসেছি। আমি যেভাবে হাঁটি, যেভাবে কথা বলি, যেভাবে নিজের ব্যাপারে চিন্তা করি, অন্যের ব্যাপারে চিন্তা করি - এসবই ইবাদত। আপনার সম্পূর্ণ আচার-আচরণ পরিবর্তন হয়ে যায় নামাযের কারণে। নামায একজন মুসলিমের ব্যক্তিত্বের বড় একটা অংশ, কেবল তার আচরণের নয়। আমরা নামাযকে মুসলিমদের আচরণ হিসেবে দেখি। কিন্তু আসলে, দৈনন্দিন নামায আদায়ের কারণে এর সরাসরি প্রভাব থাকা উচিত আমাদের চিন্তাধারায়, আচার-আচরণে, আমাদের মানসিকতায়।

জোহর এবং আসর নামাযের মধ্যবর্তী সময়টা তে আমার চিন্তা প্রভাবিত হয়ে থাকবে জোহর নামাযকে ঘিরে। আসর এবং মাগরিব নামাযের মধ্যবর্তী সময়ে আমার চিন্তাধারা অগ্রাধিকার পাবে আসর নামাযকে ঘিরে। এই পথেই একজন মুসলিম নিজেকে ইবাদতকারী হিসেবে পরিচিত করে। ইবাদতের মনোভাব গড়ে তোলা - নামাযের কাজ হল এটাই।

আপনারা দেখেছেন স্তম্ভগুলো একটা দালানকে কিভাবে ধরে রাখে? নামায আমাদের দিনকে সেভাবে ধরে রাখে। আর নামাযের মধ্যবর্তী সময়টা বলে দেয় আমাদের নামাযের মান কেমন ছিল। সালাত যদি অনুভবশূন্য হয়ে পড়ে, নামায যদি কেবল হৃদযন্ত্রের ব্যয়াম হয়ে পড়ে, নামায যদি কেবল সূরা ইখলাস আর সূরা কাওসার (সবচেয়ে ছোট সূরা) এর রিভিউ সেশন হয় কারণ আপনার হাতে এর চেয়ে বেশি সময় নেই।নামায যদি কেবল এতেই সীমাবদ্ধ থাকে তবে আপনি আপনার ব্যাক্তিত্বে কোন পরিবর্তন দেখতে পাবেন না।

0 comments
Labels: , ,

আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী জীবন যাপন

"আর যদি তারা তাওরাত, ইঞ্জিল এবং যা তাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হয়েছে, পুরোপুরি পালন করত, তবে তারা উপর থেকে এবং পায়ের নীচ থেকে (অর্থাৎ আসমানী বরকত এবং ভূ-গর্ভের নেয়ামত) ভক্ষণ করতো। তাদের মধ্যে কিছু সংখ্যক লোক মধ্যপন্থা অবলম্বনকারী এবং অবশিষ্ট বেশিরভাগ লোকই মন্দ কাজ করে যাচ্ছে।"

আজকের আলোচনায় সূরা মায়িদাহ এর ৬৬ নং আয়াতে আল্লাহ বলছেন, "ওয়া লাও আন্নাহুম আক্বামুত তাওরাতা ওয়াল ইঞ্জিল" - যদি ঐ লোকেরা তাওরাত এবং ইঞ্জিল প্রতিষ্ঠা করত (পুরোপুরি মেনে চলত)... আল্লাহ এখানে সেই সময়ের ইহুদি এবং খ্রীস্টানদের কথা বলছেন।

তাদের উপর তাওরাত এবং ইঞ্জিল নাজিল হয়েছিলো... যদি তারা সেই কিতাব মেনে চলত, "ওয়া মা উনঝিলা ইলাইহিম মিন রাব্বিহিম" - এবং অন্যান্য যেসব কিতাব তাদের প্রভুর পক্ষ থেকে নাজিল করা হয়েছিলো সেগুলো মেনে চলত, "লাআকালু মিন ফাউক্বিহিম ওয়া মিন তাহতিহিম" - তাহলে তারা তাদের উপর থেকে আর তাদের নিচ থেকে আহার পেতো।

আল্লাহ বলছেন, যদি তুমি কিতাব প্রতিষ্টা কর, তাহলে শুধু জান্নাতেই সুখী জীবন পাবে না...যে বিষয়ে আগের আয়াতে ৬৫ নং আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে, বরং এখানেও সুখী জীবন পাবে। তুমি উপর থেকে আর নীচ থেকে আহার পাবে। বিষয়টা এমন না যে আল্লাহর কিতাব মেনে চললে সবকিছু হারাতে হবে।

অনেক মানুষ মনে করে যদি তারা আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী জীবন ধারণ করে তাহলে সে জীবন হবে দুর্বিষহ। জীবনে অনেক কিছু তাদের হারাতে হবে। আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লা বলেন, হায় যদি তোমরা জানতে! আমি আসমানের রিযিকের দরজা খুলে দিতাম, জমিনের রিযিকের দরজা খুলে দিতাম। তোমরা শুধু সেসব ভোগ করতে, তোমরা বিলাসী জীবন পেতে... শুধু কী করতে হবে?

মাত্র একটা জিনিসই করতে হবে - আল্লাহ'র কিতাব মেনে চলতে হবে। সুবহানাল্লাহ! "মিনহুম উম্মাতুন মুক্বতাসিদাহ ওয়া কাছিরুন মিনহুম সাআ মা ইয়া'মালুন" -কিতাবী লোকদের অনেকেই ছিলো মোটামুটি ধরণের লোক। তারা খুব বেশি ধার্মিক ছিলো না। 'মুক্বতাসিদাহ' বলতে বোঝাচ্ছে যে তারা ঠিক আছে, তারা মধ্যমপন্থী। তারা ক্লাসের খুব ভালো ছাত্রও না আবার ফেল করা ছাত্রও না। মাঝামাঝি পর্যায়ের।

তার মানে আল্লাহ বলছেন যদি তোমরা মাঝামাঝি অবস্থানেও থাকতে পার তাহলেও আল্লাহ তোমাদের দেবেন। এরপর তিনি বলছেন,"ওয়া কাছিরুম মিনহুম" -তাদের অধিকাংশই- "সাআ মা ইয়া'মালুন" - তারা কতইনা খারাপ কাজ করেছে! কতইনা ভয়ানক সব কাজ করেছে। তুমি এমন কিছু লোক দেখবে যাদেরকে দেখে কখনোই মনে হবে না যে তারা কিতাবে বিশ্বাস করে। কখনোই মনে হবে না যে তারা ওহীর উপর বিশ্বাস রাখে। আমি এখানে কেবল ইহুদি আর খ্রীস্টানদের কথা বলছিনা, মুসলিমদের কথা বলছি।

আমরা কি ঐ লোকদের মত হয়ে গেছি? আমি কি ওদের মত হয়ে গেছি? আপনি কি ওদের মত হয়ে গেছেন? আমরা এমন কিছু কাজ করি যা দেখে মনেই হয় না এই লোকটা কিতাবে বিশ্বাস করে, এই লোকটা ওহীতে বিশ্বাস করে, আকাশ থেকে নাযিল হওয়া কোন গ্রন্থে বিশ্বাস করে, কোন কর্তৃপক্ষের আদেশ মেনে চলে। মাঝে মাঝে আমরা আল্লাহর বিধানের সাথে আপোস করে বসি, এরকম কিছু কথা বলার মাধ্যমে- দেখ ভাই আমাদের কাজ করে খেতে হয়... তোমারও তো কাজ করতে হয়।

আর এই আয়াতে আল্লাহ বলছেন যদি তুমি আমার কিতাব অনুযায়ী জীবন পরিচালনা কর তাহলে খুব-খুব ভালোভাবে থাকতে পারবে। ভালো জীবিকার তুমি কী বা দেখেছ? আমি তোমাকে জীবিকার এমন সব দরজা খুলে দেব যে তুমি জানতেই না যে তার অস্তিত্ব আছে। শুধু জান্নাতেই না-এখানেও! "লাআকালু মিন ফাউক্বিহিম ওয়া মিন তাহতিহিম"...আজ আমরা বলি মুসলিমরা মার খাচ্ছে। আমাদের সম্পদ ছিনতাই হয়ে যাচ্ছে।

আমরা দুর্নীতিতে আসক্ত, দৈনন্দিন জীবনের মৌলিক প্রয়োজনগুলো ও আমরা সঠিকভাবে পূরণ করতে পারি না। এই পৃথিবী মুসলমানদের দুর্দশায় জর্জরিত। সুবহানাল্লাহ।

কিন্তু আল্লাহ তায়ালা বলছেন যে , তোমাদেরকে যা করতে হবে তা হল – আমার দেয়া বই অনুযায়ী জীবন পরিচালনা কর। তাহলে আমি বাকি সব কিছুর যত্ন নেব। তোমার অর্থনীতি ভাল হবে। সবকিছুই ঠিক হয়ে যাবে, চাকরি হবে, টাকা আসবে, খাবার আসবে, তোমার সন্তানের শিক্ষার ব্যবস্থা করা হবে...।

সুতরাং এটা এমন কিছু যা আমাদের মেনে চলতে হবে। আমাদেরকে দুনিয়ার নেয়ামত প্রদান করা আল্লাহর কাছে কিছুই না। যদি আমরা জান্নাতের মানুষ হতে পারি তাহলে আল্লাহ দুনিয়াকে আমাদের পায়ের নিচে নিক্ষেপ করবেন। আর আমরা যদি এই দুনিয়ার পিছনে দৌড়াতে থাকি , এবং বস্তুগত বিষয়ের প্রতি, আমরা শুধু এই বিষয়গুলো নিয়েই পড়ে থাকি - যতক্ষণ এটা ঘটতে থাকবে আল্লাহ এই সমস্ত বিষয়গুলো ও আমাদের থেকে দূরে সরিয়ে রাখবেন। আর আপনি যদি পার্থিব এই সব অর্জন ও করেন, এটা আপনার জন্য কোন সুখ বয়ে আনবে না। এটা আপনাকে কোন প্রশান্তি দেবে না।

আর যখনি আমি-আপনি সিদ্ধান্ত নেই যে, আমাদেরকে হতে হবে পরকাল কেন্দ্রিক মানুষ, আমাদেরকে এই পৃথিবী তে পাঠানো হয়েছে মহত্তর উদ্দেশ্যে। এখানে থাকার চেয়ে ও বড় কোন উদ্দেশ্য রয়েছে আমাদের জীবনের। যখনি আমাদের এই উপলব্ধি হবে এবং আমরা আল্লাহর দেয়া বই অনুযায়ী জীবন যাপন করব, আমরা দেখতে পাব- আগে যে সব বিষয় অর্জন করা আমাদের কাছে বিশাল কিছু মনে হত তাই এখন সহজেই আমাদের কোলে এসে পড়ছে। একটার পর একটা, একটার পর একটা, সুবহানাল্লাহ।

মহান আল্লাহ তায়ালা তার রিযিকের দরজা আমাদের সবার জন্য উন্মুক্ত করুক, এমন রিযিক যা আমাদেরকে তার কাছাকাছি নিয়ে যায়, এবং জান্নাতে আমাদের বাসস্থান তৈরিতে সাহায্য করে শুধু এই দুনিয়াতে নয়।

আল্লাহ আমাকে এবং আপনাদেরকে বরকত দান করুক। আসসালামুয়ালাইকুম ও রাহমাতুল্লাহি ও বারাকাতুহ ।


 Video link:
http://youtu.be/TJXH90tpRX4

0 comments
Labels: , , ,

আল্লাহ সুবহানাল্লাহু তাআলা সম্পর্কে ধারণা

আল্লাহ সুবহানাল্লাহু তাআলা অসীম দয়ালু রহমান অথচ, আমারা ছোট বেলায় আল্লাহ সুবহানাল্লাহ সম্পর্কে বিকৃত ধারণা পাই। সঠিক জ্ঞানের অভাবে পরিবার, সমাজ আমাদের আল্লাহ সম্পর্কে এমন ধারণা দেয় যেন, আল্লাহ প্রতি মুহূর্তে শাস্তি দিতে অপেক্ষা করছে।

ব্যথা পেলে বলা হয়, " এইযে আমার কথা শুনো নাই তো,এই জন্য আল্লাহ তোমাকে ব্যথা দিয়েছে। বুঝ এখন!"
চিন্তা করুন, বাচ্চারা কি ধারণা নিয়ে বড় হবে আল্লাহ সুবহানাল্লাহু তাআলা সম্পর্কে?

ছোট বাচ্চা যদি কাউকে কুর'আন পড়তে দেখে, আগ্রহ ভরে যখন জিজ্ঞাসা করে কুর'আনে কি বলা আছে, তখন বলা হয় " তুমি যে এটা ঐটা কর, এইটার শাস্তি এই ,ঐটার শাস্তি ঐ।"
শাস্তি, গুনাহ, জাহান্নাম এই সব দিয়ে প্রাথমিক পরিচয় দেওয়া হয় আল্লাহ সুবহানাল্লাহু তাআলা সম্পর্কে, খুবই দুঃখজনক।

অথচ, আল্লাহ সুবহানাল্লাহু তাআলা নিজে কুর'আনে আর রহমান আর রাহিম দিয়ে নিজের পরিচয় শুরু করেছেন। আল্লাহ কঠোর শাস্তিদাতা তা ঠিক কিন্তু সেই সাথে তিনি অত্যন্ত দয়ালু, ক্ষমাশীল। শাস্তি আর রহমাতের মাঝে রহমত সর্বদা প্রাধান্য পায় আল্লাহ সুবহানাল্লাহু তাআলার কাছে। তিঁনি বান্দার ডাকে সাড়া দেন বান্দার যতই খারাপ অবস্থা থাকুক।

আল্লাহ সুবহানাল্লাহ তাআলার এইসব পরিচয় আগে দিতে হবে নতুন প্রজন্মদের। আল্লাহর নাম খুব সম্মান আর সতর্কতার সাথে নেয়া উচিত আমাদের।

--- Bayyinah.tv তে উস্তাদ নুমান আলী খানের Quran with young adults সিরিজ থেকে অনুপ্রাণিত

আল্লাহ সুবহানাল্লাহু তাআলার নাম "আর রহমান" নিয়ে উস্তাদ নুমান আলী খানের ছোট্ট আলোচনাঃ
www.youtube.com/watch?v=P53jYG5r4pQ


0 comments
Labels: , ,

ইস্তেগফার (ক্ষমাপ্রার্থনা) করার সুফল

শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু।



فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا
يُرْسِلِ السَّمَاء عَلَيْكُم مِّدْرَارًا
وَيُمْدِدْكُمْ بِأَمْوَالٍ وَبَنِينَ وَيَجْعَل لَّكُمْ جَنَّاتٍ وَيَجْعَل لَّكُمْ أَنْهَارًا


বাংলা ভাবার্থঃ “অতঃপর বলেছিঃ তোমরা তোমাদের পালনকর্তার ক্ষমা প্রার্থনা কর। তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের উপর অজস্র বৃষ্টিধারা ছেড়ে দিবেন,  তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি বাড়িয়ে দিবেন, তোমাদের জন্যে উদ্যান স্থাপন করবেন এবং তোমাদের জন্যে নদীনালা প্রবাহিত করবেন”। [ ৭১:১০-১২] 

English Translation:  “And said, 'Ask forgiveness of your Lord. Indeed, He is ever a Perpetual Forgiver. He will send [rain from] the sky upon you in [continuing] showers And give you increase in wealth and children and provide for you gardens and provide for you rivers”. [71:10-12]


কুরআনের উনত্রিশতম পারার অন্তর্ভুক্ত সুরা নুহের তিনটি (১০, ১১ এবং ১২)  আয়াত নিয়ে আলোচনা করবো। আল্লাহ্‌‘তালা যুগে যুগে বিভিন্ন কাওমের কাছে নবী-রাসুল প্রেরণ করেছেন। এই আয়াতে নুহ (আঃ) আল্লাহ্‌কে বলছেন, তিনি (আঃ) তাঁর কাওমের জন্য কি কি সম্পন্ন করেছেন বা তাদেরকে কীভাবে আল্লাহ্‌র দিকে আহ্বান করেছেন। এই ঘটনাটি কুরআনে অন্তর্ভুক্ত করার আল্লাহ্‌‘তালা মনস্থ করেছেন, কারণ এই আয়াতগুলোতে একটি চমৎকার শিক্ষা আছে। অন্তর থেকে আল্লাহ্‌র কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করার সুফল এখানে বর্ণনা করা হয়েছে। বিশুদ্ধ ইস্তেগফার করলে কি পাওয়া যাবে বা লাভ করা যাবে? আপনি আল্লাহ্‌র কাছে ইস্তেগফার (ক্ষমাপ্রার্থনা) করছেন, স্বভাবতই বিনিময়ে আপনি আল্লাহ্‌র মার্জনা পাওয়ার আশা করবেন এবং ইন শা আল্লাহ্‌ পাবেন। কিন্তু ক্ষমাপ্রাপ্তি ছাড়াও আর বাড়তি কি কি সুবিধা পাওয়া যাবে? আল্লাহ্‌ যখন আপনার ইস্তেগফার কবুল করেন, তখন মার্জনা করার সাথে সাথে তিনি বান্দার উপর দয়াপরবশত কিছু দুনিয়াদি সুবিধাও দান করেন। এই আয়াতগুলোতে সেটাই বলা হয়েছে। “ফাকুলতুস্ তাগফিরু রাব্বাকুম; ইন্নাহূ কা-না গাফফা-রা” অর্থাৎ ‘অতঃপর বলেছিঃ তোমরা তোমাদের পালনকর্তার ক্ষমা প্রার্থনা কর। তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল’। একজন প্রকৃত ধর্মপ্রচারকদের যা কিছু করণীয় নূহ (আঃ) তার সব কিছুই প্রয়োগ করেন তার সম্প্রদায়ের হেদায়েতের জন্য। তিনি বারে বারে আল্লাহ্‌র বাণী পুণরুক্তি করেন, শোনান, প্রচারণা করেছেন,  প্রকাশ্যে ও গোপনে ব্যক্তিগত ভাবে আহ্বান করেছেন।  তিনি তাঁর কাওমকে আল্লাহ্‌র দরবারে অন্তর থেকে ক্ষমাপ্রার্থনা করার আবেদন করেন, এবং আশ্বস্ত করেন যে নিশ্চয় আল্লাহ্‌ বারে বারে ক্ষমাশীল। তিনি তাঁর বান্দাদেরকে ক্ষমা করতেই থাকেন, করতেই থাকেন, করতেই থাকেন --- যতক্ষণ পর্যন্ত তারা ক্ষমা চায়।

 নুহ (আঃ) আরও যোগ করেন যদি তোমরা ক্ষমাপ্রার্থনা কর তাহলে,  “ইউরসিলিস্ সামা-আ ‘আলাইকুম মিদরা-রা”, অর্থাৎ ‘তিনি তোমাদের প্রচুর রহমতের বৃষ্টি দেবেন’। লক্ষ্য করুন, নুহ (আঃ) এর কাওম এর জন্য কিন্তু বৃষ্টি ঠিকই এসেছিল। কিন্তু সেই বৃষ্টি রহমতের বৃষ্টি ছিল না, সেটা ছিল তাদের বরবাদের জন্য বৃষ্টি।  যদি তারা নূহ (আঃ) আহ্বানে কর্ণপাত করতো এবং আল্লাহ্‌র প্রতি ঈমান আনায়ন করতো, তবে আল্লাহ্‌র রহমতস্বরূপ বৃষ্টিপাত হতো। কিন্তু তারা নূহ্‌ নবীর আহ্বানে সাড়া দিলো না ফলে যে বৃষ্টি তাদের জন্য রহমত হতে পারতো, সেই বৃষ্টি তাদের জন্য অভিশাপরূপে আর্বিভূত হলো। প্রচন্ড বৃষ্টিপাতের ফলে সৃষ্টি হলো এক মহাপ্লাবন যা তাদের সকলকে ভাসিয়ে নিয়ে গেলো। যখন কোন শহর বা দেশ খরা কবলিত হয় তখন মুসলিমদেরকে ইস্তেগফার করতে উৎসাহিত করা হয়। একবার দুর্ভিক্ষের সময় উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বৃষ্টির জন্য দোয়া করতে বের হলেন এবং শুধু  ইস্তেগফার করেই শেষ করলেন। সবাই বললো, “হে আমীরুল মু’মিনীন আপনি তো আদৌ দোয়া করলেন না”। তিনি বললেনঃ আমি আসমানের ঐসব দরজায় করাঘাত করেছি যেখান থেকে বৃষ্টি বর্ষিত হয়। একথা বলেই তিনি সূরা নূহের এ আয়াতগুলো তাদের পাঠ করে শুনালেন। [ইবনে জারীর ও ইবনে কাসীর]



তিনি (আঃ) আরও বলেন, “ওয়া ইউমদিদকুম বিআমওয়া-লিওঁ ওয়া বানীন” অর্থাৎ ‘তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি বাড়িয়ে দিবেন’; এবং  “ওয়া  ইয়াজ্ব‘আল লাকুম জান্না-তিওঁ ওয়া ইয়াজ্ব‘আল লাকুম আনহা-রা” অর্থাৎ ‘তোমাদের জন্যে উদ্যান স্থাপন করবেন এবং তোমাদের জন্যে নদীনালা প্রবাহিত করবেন’ । আল্লাহ্‌র নেয়ামতের কয়েকটি ধাপ এখানে উল্লেখ করা হয়েছে বৃষ্টি এবং শষ্য যা পরস্পর সম্পর্কিত, সম্পদ ও জনশক্তি [সন্তান-সন্ততি], সমৃদ্ধ বাগান, স্থায়ী নদীনালা --- সবই হচ্ছে কোন জাতির জন্য সমৃদ্ধির লক্ষণ।  একবার এক ব্যক্তি হাসান বাসরীর মজলিসে অনাবৃষ্টির অভিযোগ করলে তিনি বললেনঃ আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। অপর এক ব্যক্তি দারিদ্রের অভিযোগ করলো। তৃতীয় এক ব্যক্তি বললোঃ আমার কোন ছেলেমেয়ে নেই। চতুর্থ এক ব্যক্তি বললোঃ আমার ফসলের মাঠে ফলন খুব কম হচ্ছে। তিনি সবাইকে একই জবাব দিলেন। অর্থাৎ আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। লোকেরা বললোঃ কি ব্যাপার যে, আপনি প্রত্যেকের ভিন্ন ভিন্ন অভিযোগের একই প্রতিকার বলে দিচ্ছেন? তখন তিনি সূরা নূহের এ আয়াতগুলো পাঠ করে শুনালেন।

 ইসলাম এতো চমৎকার একটি দ্বীন যে এখানে মুসলিমদের জন্য পার্থিব সমৃদ্ধির প্যাকেজও আছে। আল্লাহ্‌র কাছে অন্তর থেকে বিশুদ্ধ ইস্তেগফার করুন, আল্লাহ্‌ সেই বান্দা বা জাতির জন্য পার্থিব আশীর্বাদ প্রেরণ করবেন। এই কল্যাণে সিক্ত হয়ে পরলোকের সুখশান্তির জন্য নিজেকে তৈরি করে নিবেন। সুবাহান’আল্লাহ! কতই না সুন্দর আমাদের এই দ্বীন! আপনাকে বৃষ্টি, অর্থ-সম্পদ, সন্তানসন্ততি,  সমৃদ্ধ নগরে সুখ-শান্তিতে বসবাস করা --- এর কোন কিছুই আলাদাভাবে চাইতে হবে না। আপনি শুধু অন্তর থেকে ক্ষমাপ্রার্থনা করবেন। আল্লাহ্‌ এতো খুশী হবেন, তিনি সন্তুষ্ট হয়ে আপনার গুনাহ মার্জনা করবেন এবং তাঁর সাথে বোনাসস্বরূপ অন্য সব জিনিসও দেবেন। এইসব জিনিস আল্লাহ্‌র কাছে কোনই মুল্য রাখে না, কিন্তু আপনার কাছে অনেক মুল্যবান। আল্লাহ্‌‘তালার কাছে যেটা বড় ব্যপার সেটা হচ্ছে বান্দার আন্তরিক তাওবা। এই আয়াতে একটি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ তুলে ধরা হয়েছে। আল্লাহ্‌র কাছে কোনটা মুল্যবান এবং আমাদের কাছে কোনটা বেশী মুল্যবান?


আল্লাহ্‌‘তালা এখানে একশ্রেণীর মুসলিমদেরকে মেসেজ দিচ্ছেন। তারা মনে করে আল্লাহ্‌র কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করার পর তো সেই একই গুনাহ আর করতে পারবো না। সুদ, ঘুষ, কালোবাজারি, নোংরা রাজনীতি, দুই নম্বরী ব্যবসা, হারাম জিনিস বেচা-কেনা, নোংরা বিনোদন জগতের তারকা -– এইসব কাজ যদি নাই করতে পারি তাহলে আমাদের অর্থ-খ্যাতি-সম্পদ-ঘরবাড়ী-বিলাসী জীবন কিছুই তো থাকবে না। পথের ফকিরে পরিণত হবো। আল্লাহ্‌র কাছে ইস্তেগফার করলে যদি ইনকাম বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে বরং ক্ষমা চাওয়ার দরকার নাই। শেষ বয়সে হজ্জ করে এসে হিজাব পড়লে/ দাঁড়ি রাখলেই চলবে। এই শ্রেণীর মুসলিমদের আল্লাহ্‌ বলছেন, আল্লাহ্‌কে অসন্তুষ্ট করে অসৎ পথে যদি কেউ পার্থিব ‘সাফল্য’ খোঁজে তাহলে তাকে পাপের বোঝা নিয়ে একা পথ চলতে হবে। অপরপক্ষে, আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টির জন্য যদি কেউ সৎপথে থাকে এবং সর্বদা নিজের গুনাহের জন্য আল্লাহ্‌র কাছে ইস্তেগফার করে। তাহলে আল্লাহ্‌ খুশী হয়ে মার্জনা করার সাথে সাথে তাকে অর্থ-সম্পদ-সন্তান-সমৃদ্ধ জীবন সবকিছুই দান করবেন।  আন্তরিক ইস্তেগফারকারী মুসলিমের সাথে সর্বদা আল্লাহ্‌র আশীর্বাদ থাকবে। সুবাহান’আল্লাহ!

 আল্লাহদ্রোহিতার আচরণ মানুষের জীবনকে শুধু আখেরাতেই নয় দুনিয়াতেও সংকীর্ণ করে দেয়। অপরপক্ষে কোন ব্যক্তি/জাতি যদি অবাধ্যতার বদলে ঈমান, তাকওয়া এবং আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মেনে চলার পথ অনুসরণ করে তাহলে তা শুধু আখেরাতের জন্যই কল্যাণকর হয় না, দুনিয়াতেও তার ওপর আল্লাহর অশেষ নিয়ামত বর্ষিত হতে থাকে। মৃত্যু কখনো কড়া নেড়ে আসে না। তাই সময় থাকতেই আমরা সবাই যেন আল্লাহ্‌ রাব্বুল আলামিনের কাছে ইস্তেগফার করি। আন্তরিকভাবে আল্লাহ্‌র কাছে ইস্তেগফার করলে আল্লাহ্‌ তাঁর বান্দাকে মার্জনা করেন। তিনি শ্রেষ্ঠ মার্জনাকারী, তিনি মার্জনা করতে ভালোবাসেন। আসুন আমরা সবাই আল্লাহ্‌র কাছে বিশুদ্ধ ইস্তেগফার করি। তাহলে আল্লাহ্‌‘তালা আমাদেরকে ক্ষমা করার পাশাপাশি ইহকাল ও পরকালের সাফল্য দান করবেন, ইন শা আল্লাহ্‌।


[নোমান আলী খানের কুরানিক জেমস (Quranic Gems) সিরিজের ঊনত্রিশতম পর্বের বাংলা ভাবার্থ। দ্রুত অনুবাদ করার কারনে কিছু ভুল-ত্রুটি থাকাটাই স্বাভাবিক। আমার এই অনিচ্ছাকৃত ভুল আশাকরি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। যা কিছু কল্যাণকর তার সম্পূর্ণই আল্লাহ্‌র তরফ থেকে, আর যা কিছু ভুল সেটি সম্পূর্ণ আমার। আল্লাহ্‌ রাব্বুল আলামিন আমার সেই ভুলগুলো মার্জনা করুন। তিনি পরম ক্ষমাশীল, অসীম দয়ালু। আল্লাহ্‌তালা আমাদের সকলকে কুরআনের আয়াতসমূহ বুঝে পড়ার তৌফিক দান করুন এবং  সঠিক মর্মার্থ বুঝে সেই ভাবে জীবনকে পরিচালিত করার মত হিকমাহ, সাহস ও ধৈর্য দিক।  ]


সোর্স অনুবাদ - সেফাত মেহজাবীন

(To watch the video go to: https://www.youtube.com/watch?v=Ugx4MZK3EGQ)

Source:https://www.facebook.com/smahjabeen/notes

0 comments
Labels: , ,

পরিপূরক -- সূরা ইখলাস হতে শিক্ষামূলক উপদেশ

সূরা ইখলাস হতে শিক্ষামূলক উপদেশ

"আহাদ" এই ধারণাটি তথা একক সত্ত্বার এই ধারণাটি। পাকিস্থানে ইসলামিক ধর্মতত্ত্বের বিশিষ্ট একজন লেখক ডঃ রফী’ উদ্দীন এই সুরাহ সম্বন্ধে মন্তব‍্য করতে গিয়ে অতি আশ্চর্য‍্যজনক কিছু তত্ত্ব প্রদান করেন। আমি আসলেই এর প্রশংসা করি, এবং আমি মনে করি আধুনিক শ্রোতাদের মনে এই তত্ত্বগুলো গেঁথে দেওয়া প্রয়োজন। আল্লাহ মানব জাতির মধ্যে তাঁর সম্পর্কে জ্ঞান প্রদান করে তৈরী করেছেন। মানব জাতি শুরু থেকেই জানত যে, সর্বোচ্চ সত্ত্বা আল্লাহ বিদ‍্যমান। এরকম নয় যে, একজন উপাস‍্য আছেন, তিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন, এখন আমরা যা ইচ্ছা তাই করতে পারি। না, সেটা নয়। বরঞ্চ তিনিই রব, তিনিই প্রভু। আমার জীবনের মূল লক্ষ‍্যবস্তু হচ্ছে তিনি যা চান তা করা।এটা আমার সর্বোচ্চ আদর্শ। তাঁর দাসে পরিণত হওয়াই হচ্ছে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া। এটাই হবে আমার জন‍্য সবচেয়ে বড় সম্মানের বিষয়। আল্লাহর নবী (সাঃ), তাঁর বড় সম্মান ছিল তিনি আল্লাহর ‘‘عبد’’ হয়েছিলেন। আল্লাহর দাস হওয়া সবচেয়ে সম্মানের বিষয়। এটাই হচ্ছে জীবনের মূল লক্ষ‍্যবস্তু এবং আল্লাহ সেই লক্ষ‍্যবস্তুটি সকল মানবজাতির অন্তরে খোদাই করে দিয়েছেন। 
 
কিন্তু যদি আপনি সেই লক্ষ‍্যবস্তুর দিশা হারিয়ে ফেলেন তখন যেটা হয়... সেই লক্ষ‍্যবস্তু পরিপূর্ণতার পিপাসা বা ক্ষুধা আপনার মধ্যে বিরাজ করে, যদ্বারা আল্লাহ আপনাকে সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু আপনার ক্ষুধা যখন স্বাস্থ‍্যকর খাবার দ্বারা নিবারিত হয় না, তখন কি দিয়ে নিবারণ করেন? আপনি যদি সঠিক খাবার না পান, আপনি কি তাহলে বলবেন যে, আমি খাবই না। না। যখন কোন ব‍্যক্তি ক্ষুধায় কাতর থাকে এবং তার পছন্দের কোন খাবার যদি তখন সে না পায় অথবা কোন স্বাস্থ‍্যকর খাবারও নেই, শুধু আছে ময়লা আবর্জনা, গাছের ছাল-পালা মানুষ কি তা নিয়েই চোষাচুষি শুরু করবে না, যখন সে এরকম পরিিস্থতির স্বীকার হবে? অবশ‍্যই করবে। যখন আপনি মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যকে ভুলে যান, সেটা যখন আর আপনার লক্ষ্যবস্তু হয় না, তখন অবশ‍্যই আপনি এর একটি পরিপূরক খুঁজে বের করবেন। কোন কিছু থেকে অনুপ্রাণিত হওয়া অবশ‍্যই জরুরী, এটাই হচ্ছে আপনার জীবনের উদ্দেশ‍্য।

যে ব‍্যক্তি আল্লাহকে পেয়েছে, তাঁদের কি হয়? নিশ্চয়ই আমার নামায, আমার কোরবানী এবং আমার জীবন ও মরণ বিশ্ব প্রতিপালক আল্লাহরই জন্য (সুরা আনআমঃ ১৬২)। এটা তাঁদের জন‍্য খুবই সহজ যে ব‍্যক্তি সত‍্যিকারভাবে আল্লাহকে খুঁজে পায়, তাদের সালাত আল্লাহর জন‍্য, তাদের ত‍্যাগ-তিতিক্ষা আল্লাহর জন‍্য, তাদের জীবন এবং মৃত‍্যু এখন আল্লাহর জন‍্য। যে পদ্ধতিতে তারা জীবনযাপন করে, খাওয়া-দাওয়া করে, ঘুমায়, তারা তাদের জীবনে কি করতে চান, তাদের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা, তাদের স্বল্পমেয়াদী পরিকল্পনা, তারা তাদের সন্তান-সন্ততিদের নিয়ে কি করবেন, তারা কেন পড়ালেখা করছেন, কোথায় চাকরী করবেন, সবকিছুই এখন আল্লাহর জন‍্য, এটাই তাদের মূল লক্ষ‍্যবস্তু। কিন্তু যে ব‍্যক্তির লক্ষ্যবস্তু সেটা নয়, তাদের অন‍্য একটি লক্ষবস্তু খঁুজে নিতে হয়। আর অতীতে সেটা হত হয়তো কোন মূর্তি বা অন্য কোন ধর্ম, তারা খুঁজে নিত অন‍্য কোন উপাস‍্য।

কিন্তু আমাদের সময়ে সেটা অনেক করুণ উদ্রেককর এবং হতাশাজনক। এখন আমাদের অনেকেই শরীর নিয়ে চিন্তায় মগ্ন এবং তারা দৈনিক ১৮ ঘণ্টা ব‍্যায়াম সাধন করছে। তাদের জীবনের একমাত্র উদ্দেশ‍্য হচ্ছে, নিজেকে দিনের পর দিন পেশীসম্পন্ন এবং শক্তিশালী করে তোলা। এটাই তাদের জীবনের একমাত্র উদ্দেশ‍্য- নিজেকে সবসময় উর্দ্ধে রাখা, নিজের আকৃতিকে ধরে রাখা ।অথবা তারা তাদের প্রশিক্ষকদেরকে সাথে নিয়ে লক্ষ‍্য ঠিক করে বলে,‘‘আমাকে আরো বেশী রেপস (Reps এক ধরনের ব‍্যায়াম) করতে হবে, বা আরো বেশী পুশআপস (Pushups এক ধরনের ব‍্যায়াম) করতে হবে, বা আমি চাই আমার ভারোত্তলনে (Bench Press) আরো বেশী ওজন যোগ হোক ইত‍্যাদিই তাদের লক্ষ‍্য, এটাই তাদের ইলাহ (উপাসনার বস্তু) হয়ে বসে।

একজন ব‍্যক্তি যার জীবনটাই ছিল টাকা-পয়সার জন‍্য এমন কোন মানুষের দেখা পেয়েছেন কি? যারা তাদের কাজের কথা ছাড়া আর অন‍্য কোন কিছুই বলতে পারে না। তারা পারেই না। হ‍্যাঁ, আমি এই কোম্পানীতে কাজ করেছি, আমি এটা করেছি, ওটা করেছি এবং যে মুহুর্তেই তাদের কাজ চলে যায়, তারা আত্মঘাতী হয়ে ওঠে, কারন তাদের সকল চিন্তা-ভাবনা শুধু কাজ নিয়েই ছিল। সারাজীবন তারা শুধু এটাই করেছে শুধুই এটা করেছে তারা, এটা তাদের লক্ষ‍্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিল।

কারো কারো জন‍্য সেটা হয় তাদের সন্তান-সন্ততিরা। তারা বাঁচে তাদের সন্তান-সন্ততিদের জন‍্য, তারা তাদের সন্তান-সন্ততির জন‍্য সব কিছুই করে থাকে, দিবারাত্রি তাদের সন্তান-সন্ততিদের নিয়ে ভাবে। তাদের মস্তিষ্কে আর কোন চিন্তাভাবনা স্থান পায় না, তাদের সামনে আর কোন লক্ষ‍্য থাকে না তাদের সন্তান-সন্ততিদের ছাড়া এর পেছনেই তারা দৌড়ে থাকে।

যখন আপনি তাঁকে (আল্লাহকে) খুঁজে পাবেন না, তখন আপনি অন‍্য কিছু খঁুজে নেবেন এবং তার পেছনেই দৌড়াতে থাকবেন এবং তার জন‍্য আপনি আপনার জীবন বিসর্জন দিয়ে দেবেন এ ব‍্যাপারে মানুষের মধে‍্য কোনই ব‍্যতিক্রম হয় না। আজকাল এমনকি এটা হতে পারে একটি অলস ব‍্যক্তির ক্ষেত্রে এবং আপনি আমাকে জিজ্ঞেস করতে পারেন অলস ব‍্যক্তিদের বেলায় কি হবে?

জানেন তো, ঐ বাচ্চা ছেলেমেয়েরা যারা দৈনিক ২০ ঘণ্টা ভিডিও গেমস খেলে এবং তাদের সোফা থেকে নামেই না তাদের লক্ষ‍্য কি ? সেটা হচ্ছে তাদের নিজেদেরকে বিনোদিত করা। পর্দার পেছনে বসে তাদের মস্তিষ্কের কোষ ক্ষয় করা। এটাই তাদের একমাত্র উদ্দেশ‍্য এখানেই তারা পৌঁছাতে চায় তা অর্জন করার লক্ষ‍্যে তারা কঠোর পরিশ্রমে ব‍্যস্ত। এগুলোই হচ্ছে তাওহীদকে বোঝার মনস্তাত্বিক তাৎপর্য।

‘‘আল্লাহ এক’’ এটা বলা অনেক সহজ কিন্তু আমার জীবনে তিনিই (আল্লাহ) কি একমাত্র বিষয়? শুধু তিনিই কি আমার জীবনের এমাত্র কেন্দ্রবিন্দু? নাকি আমার অন‍্য অনেক কিছু আছে যার পেছনে আমি দৌড়াচ্ছি বা অন‍্য অনেক বস্তু যার সামনে আমি নিজেকে সমর্পণ করি? আল্লাহ আড়ম্বরপূর্ণ ভাষায় আমাদের এই প্রশ্নটি করেন - তিনি বলেন,....হে মানুষ, কিসে তোমাকে তোমার মহামহিম পালনকর্তা সম্পর্কে বিভ্রান্ত করল? (৮২: ০৬) তোমার কাছে এত গুরুত্বপূর্ন কি ছিল যে, তুমি তার পেছনে দৌড়াচ্ছিলে? আর তুমি এর জন্য প্রচেষ্টা চালাতে পারনি? সুবহানাল্লাহ ।

তাই যখন তিনি (আল্লাহ) "হুয়াল্লাহু আহাদ" শব্দটি ব‍্যবহার করেন, তখন এর মনস্তাত্বিক তাৎপর্য, আল্লাহর প্রতি আমাদের দৃষ্টভঙ্গির তাৎপর্য, এবং আমাদের জীবন নিয়ে আমরা কিভাবে চিন্তা করি তা সম্পূর্ণরূপে পরিবর্তিত হয়ে যায়। এখন আমার কাছে আর কিছুই গুরুত্ব পোষন করে না তাঁকে (আল্লাহ) খুশি করা ছাড়া, আমার কাছে আর কিছুই গুরুত্ব পেতে পারে না তাঁর আমার প্রতি সন্তুষ্ট হওয়া থেকে, আমার কাছে আর কিছুই গুরুত্বপূর্ণ নয় তাঁর ক্ষমা পাওয়া থেকে। আমার কাছে আর কিছুই গুরুত্ব পোষন করে না এই বিষয়ের চেয়ে যে তিনি শেষ বিচারের দিন আমার সাথে কথা বলবেন এবং বলবেন যে আমি সাফল‍্যমণ্ডিত। তিনি আমার দিকে তাকাবেন।

আর আমি তাদের মধ‍্যকার কেউ হব না যাদের দিক থেকে তিনি মুখ ফিরিয়ে নেবেন। "শেষ বিচারের দিন আল্লাহ তাদের সাথে কথা বলবেন না (২: ১৭৪)” আল্লাহ আমাদেরকে তাদের অন্তর্ভূক্ত না করুন । এগুলোই হচ্ছে শুধু ‘‘আহাদ’’ কে বোঝার কয়েকটি মনস্তাত্বিক তাৎপর্য। শুধু এই আহাদ শব্দটি। আল্লাহ যা বলছেন তা এরকমই, সুবহানাল্লাহ। আমাদের এটাই করা উচিৎ এবং আমি পরবর্তী কথা দিয়ে শেষ করতে চাই, কারন নামাজের সময় হয়ে গেছে।

আর সেটা হলো আল্লামা ইকবালের একটি কবিতা। আমি ইকবালের কবিতা আবৃতি করতে পারব না, কারন আমার উর্দূ খুবই খারাপ। কিন্তু আমি আপনাদের তাঁর একটি লাইনের অর্থ বলব যদিও আমি িনজে লাইনটি খুবই পছন্দ করি। এটা তাওহীদ সম্পর্কিত একটি কবিতা। এবং তিনি বলেন, "আগে যা (তাওহীদ) মানুষের হৃদয়কে প্রজ্বলিত করত, এখন তা বিমূর্ত দার্শনিক বিতর্কের বিষয়বস্তু" তিনি এটাই বলেন। এখন আমাদের কাছে তাওহীদ কি? বিতর্ক, আলোচনা, ধর্মতত্ত্বের উপর বিমূর্ত আলোচনা, যার কোন অন্ত নেই। কিন্তু এটা আগে যা ছিল তা হচ্ছে এমন কিছু যা হৃদয়সমূহকে প্রজ্বলিত করত। আমি কি এখনও সেই "আহাদ" এর অধিকার পরিপূর্ন করছি? আমি কি এখনও সেই "আহাদ" এর প্রতি ন‍্যায় বিচার করছি? আল্লাহ আমাদের তাওহীদের লোকদের অন্তর্ভুক্ত করুন আল্লাহ আমাদের হৃদয়ে সে আলো প্রজ্বলিত করুক যা জ্বলিত হয়েছিল ইব্রাহিম (আঃ), রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এবং সাহাবা (রাঃ) দের হৃদয়ে।
 
 
 

0 comments
Labels: , , ,

অনেকে বলেন এই পৃথিবীতে এত অবিচার, এত অন্যায় - স্রষ্ট্রা যদি থাকেন, তাহলে এরকম হবে কেন?

"অনেকে বলেন এই পৃথিবীতে এত অবিচার, এত অন্যায় - স্রষ্ট্রা যদি থাকেন, তাহলে এরকম হবে কেন?

আমরা বলি, নাস্তিকদের সাথে আমরা এই ব্যাপারে একমত। ইসলাম পরিষ্কার বলে দিয়েছে যে এই পৃথিবী অবাধ ন্যায়ের ক্ষেত্র নয়। এই পৃথিবীতে বহু লোক খারাপ কাজ করে পার পেয়ে যায়। শুধু এটাই নয়, অনেকে অনেক ভাল কাজ করে এর ন্যায্য প্রতিদান পায় না। বরং উল্টোটাও হয়। বহু ভাল লোকেরা কষ্ট পেয়েই এই জীবন পার করে দেয়। এটা কি ন্যায়?

আমাদের মনে রাখতে হবে, এই পৃথিবী একটা সমীকরণের অংশ। আপনারা স্কুলে সমীকরণের অংক করছেন, যেখানে সমান চিহ্নের ডানে বামে দুটি অংশ থাকে। আপনি যদি সমীকরণের বাম অংশে একটু পরিবর্তন আনেন তবে ভারসাম্য রক্ষার জন্য ডান অংশেও পরিবর্তন করতে হয়।

বিচার দিবস হবে সেই ভারসাম্য রক্ষার দিবস। যারা এই বিচার দিবসকে বিশ্বাস করে না তাদের কাছে শুধুমাত্র এই পৃথিবীই অবশিষ্ঠ থাকে। এই পৃথিবী দিয়েই সে স্রষ্ট্রাকে বিচার করতে শুরু করে। যখন দেখে এত অনাচার, অবিচার এই পৃথিবীতে, তখন সে বিশ্বাস করতে বাধ্য হয় স্রষ্ট্রা নেই।

আমাদের মনে রাখতে হবে আল্লাহ সব ব্যাপারে নিখুঁত ও নির্ভুল। বিচারের বেলাতেও তিনি নিখুঁত।"

--- লেখাটি উস্তাদ নুমান আলী খানের Quran for young adult series (From Bayyinah.tv) থেকে অনুপ্রাণিত।

.....................

হে আল্লাহ, জালিম সম্প্রদায়দেরকে তোমার হাতে ছেড়ে দিলাম বিচারের জন্য। হে আল্লাহ! গাজাবাসীদের বিজয় দাও। হে আল্লাহ, তুমি তাদের সহায় হও।


Source: https://www.facebook.com/NAKBangla
 

0 comments
Labels: , ,

মানসিক যন্ত্রণা থেকে আরোগ্য লাভের উপায়

শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু।

وَأَصْبَحَ فُؤَادُ أُمِّ مُوسَى فَارِغًا إِن كَادَتْ لَتُبْدِي بِهِ لَوْلَا أَن رَّبَطْنَا عَلَى قَلْبِهَا لِتَكُونَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ
বাংলা ভাবার্থঃ “ওদিকে মূসার মায়ের মন অস্থির হয়ে পড়েছিল। সে তার রহস্য প্রকাশ করে দিতো যদি আমি তার মন সুদৃঢ় না করে দিতাম, যাতে সে (আমার অঙ্গীকারের প্রতি) বিশ্বাস স্থাপনকারীদের একজন হয়”। [সুরা কাসাস ২৮:১০]
English Translation: “And the heart of Moses' mother became empty [of all else]. She was about to disclose [the matter concerning] him had We not bound fast her heart that she would be of the believers”. [28:10]


এই আয়াতটি কুরআনের বিশতম পারা থেকে নেয়া।  সুরা কাসাসের এই আয়াতটি আমার প্রিয় আয়াতসমুহের মধ্যে একটি। মুসা (আঃ) এর মায়ের বিষয়ে  এই আয়াতটিতে আলোচনা করা হয়েছে।


জীবনের বিভিন্ন সময় আমরা সবাই বিভিন্ন মাত্রার মানসিক কষ্টের মুখোমুখি হই। প্রচণ্ড মনোকষ্টের ভেতর সময় অতিবাহিত করি। প্রতিটি নিঃশ্বাসের সাথে বুকের ভেতর কাঁটা বিঁধে থাকার মত কষ্ট অনুভুত হয়। প্রিয়জনের মৃত্যুতে, প্রিয়জনের দুরারোগ্য রোগে (যখন শুধু চোখের সামনে তিলে তিলে শেষ হয়ে যেতে দেখি কিন্তু তাকিয়ে দেখা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না), যখন বাবা-মা সন্তানকে বা সন্তান বাবা-মাকে ভয়ঙ্কর সব কথা বলে, যখন স্বামী-স্ত্রী পরস্পরকে জঘন্য কথা বলে বা পরস্পরের সাথে নিষ্ঠুর আচরণ করে, বন্ধু শত্রুর মত ব্যবহার করে, অনেক আদরের ও দীর্ঘদিনের বিশ্বাসী কেউ চরম বিশ্বাসঘাতকতা করে --- তখন জীবনটাকে দুর্বিষহ মনে হয়। এছাড়াও বিভিন্ন ঘটনায় যেমনঃ চাকুরী হারানো, সন্তান হারানো, রাতারাতি সহায়-সম্পত্তি-অর্থ-খ্যাতি হারিয়ে পথে চলে আসা, সম্ভ্রম হারানো ইত্যাদি মানুষের আবেগকে চরমভাবে আঘাত করে। পৃথিবীতে এই মুহূর্তে কত শত মানুষ কি অবর্ণনীয় শারীরিক-মানসিক কষ্ট, নিরাপত্তাহীনতা,  প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুভয় ও আতংকের ভেতর সময় কাটাচ্ছে যা আমাদের কল্পনার বাইরে। ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চারা কি ভয়াবহ পরিবেশে জীবন কাটাচ্ছে, কি নৃশংসভাবে তাদের হত্যা করা হচ্ছে --- যা আমরা আমাদের সন্তানদের জন্য দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করতে পারিনা। এই হচ্ছে বাস্তবতা যা আমরা প্রতিদিন দেখছি, কখনো এর ভেতরে থেকে আবার কখনো দর্শক হিসাবে। এই আয়াতটি এইসকল আঘাতপ্রাপ্তদের জন্য একটি আশার বানী বহন করে। কারণ, মানুষ যখন মানসিকভাবে চরম বিপর্যস্ত হয়ে পরে, তখন সে ভাবে এই অবস্থা থেকে আমার কোন মুক্তি নাই, কোনভাবেই এই কষ্ট কাটিয়ে ওঠা আমার পক্ষে সম্ভব হবে না --- সেই ধরনের পরিস্থিতিকে কাটিয়ে ওঠার জন্য এই আয়াতটি একটি দিক নির্দেশনা দেয়।
 
মুসা (আঃ) এর মাকে আল্লাহ্‌‘তালা এমন একটি অসামান্য কঠিন কাজ দিয়েছিলেন, যা কিনা যেকোন মায়ের পক্ষে এককথায় অকল্পনীয়। তাঁর নবজাতক সন্তানকে ‘বাঁচানোর’ জন্য পানিতে ভাসিয়ে দিতে হবে। তাঁর সামনে শুধু দুটো রাস্তা খোলা ছিল।

এক. চোখের সামনে ফেরাউনের সৈন্যদের হাতে নিজ সন্তানের হত্যা দেখা

দুই. আল্লাহ্‌র নির্দেশে শিশু মুসা (আঃ) কে ঝুড়িতে করে নদীতে ভাসিয়ে দেয়া

 একটা সাধারণ ঝুড়ি, ওয়াটারপ্রুফ বা নেভিগেশনের ক্ষমতাযুক্ত নয়। নিজের নবজাতক সন্তানকে এমন একটি ঝুড়িতে ঢুকিয়ে নদীতে ভাসিয়ে দিতে হবে, সেই ঝুড়ি উলটে বাচ্চা পানিতে ডুবে যেতে পারে, তাকে নদীর হিংস্র প্রাণীরা খেয়ে ফেলতে পারে, ফেরাউনের সৈন্যরা তাকে দেখে তুলে নিয়ে মেরে ফেলতে পারে --- এই নাড়িছেঁড়া সন্তানকে আর কখনো দেখতে পারবে না, আদর করে বুকে জড়িয়ে তাঁর গায়ের গন্ধ নিতে পারবে না। এই সকল চিন্তা সম্ভবত একসাথে তাঁর মাথায় উঁকি দিচ্ছিল। চোখের সামনে ফেরাউনের সৈন্যদের হাতে নিজ সন্তানের হত্যা দেখা তাঁর পক্ষে সম্ভব হবে না ভেবেই তিনি নিরুপায় হয়ে বুকে পাথর চেপে শিশু মুসা (আঃ) কে নীল নদের পানিতে ভাসিয়ে দিলেন। মুসা (আঃ) এর মা যখন আল্লাহ্‌র ইশারায়  এ কাজ করেছিলেন (কারণ আল্লাহ্‌র সাহায্য ছাড়া এই ধরনের কাজ করা অসম্ভব), এই আয়াতটিতে আল্লাহ্‌ সেই মুহূর্তটি বর্ণনা করে বলছেন, “ওয়াআছ্ববাহা ফুআ-দু উম্মি মূসা- ফা-রিগান”, মূসার মায়ের মন থেকে আবেগ ও চিন্তাশক্তি লোপ পেয়েছিল। কোন মানুষ যখন মানসিকভাবে চরম আঘাতপ্রাপ্ত হয়, তখন সে কিছু সময়ের জন্য একেবারে আবেগশুন্য হয়ে যায়। তার চোখের দৃষ্টি শুন্য হয়ে যায়, যদি তার চোখের সামনে দিয়ে হাত নাড়া হয় তবুও তার চোখের পলক পরে না, তার চিন্তাশক্তি এতোটাই লোপ পায় যে তার আশেপাশের কোন কিছুতেই সে আর প্রভাবিত হয় না। নির্বাক হয়ে শুন্যদৃষ্টিতে শুধু তাকিয়ে থাকে। এই অবস্থাটিকে বলা হয়েছে ‘ফা-রিগান’। “ইন কা-দাত লাতুবদী বিহী”, অর্থাৎ 'সে তো তাঁর (মুসার) পরিচয় প্রকাশে প্রায় উদ্যত হয়েছিলো'। আরেকটু হলেই তিনি চিৎকার করে বলেই দিচ্ছিলেন যে, “আমার বাচ্চা!  আমার বাচ্চা!! তাকে বাঁচাও!!!” কিন্তু এটা যদি তিনি করতেন তাহলে ফেরাউনের নিষ্ঠুর সৈন্যরা তাঁর সন্তানকে মেরে ফেলতো।  এখানে আল্লাহ্‌ বলেছেন, “লাওলা আর্ রাবাত্বনা- ‘আলা- ক্বালবিহা”, অর্থাৎ ‘যদি আমি তার মন সুদৃঢ় না করে দিতাম’। মুসা (আঃ) এর মায়ের অন্তরজ্বালা (ফু’আদ) কে আল্লাহ্‌‘তালা অবদমিত করে তাঁর হৃদয়কে শান্ত ও অবিচল করেছিল। এখানে এই অর্থে ‘ক্বালব’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। আল্লাহ্‌ এই আয়াতে বলছেন যে তিনি এই কাজটি করেছেন। “লিতাকূনা মিনাল্ মুমিনীন",  ‘যাতে সে (আমার অঙ্গীকারের প্রতি) বিশ্বাস স্থাপনকারীদের একজন হয়’।


অনেকেই আছেন যারা মানসিকভাবে অসম্ভব আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার পর কোন অবস্থাতেই আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারে না। তারা মানসিকভাবে এতোটাই ভেঙে পরে যে স্বাভাবিকভাবে চিন্তা করার শক্তি চিরতরে লোপ পায়। কেন তারা পারে না? কারণ, আল্লাহ্‌ তাদের মন কে সুদৃঢ় করেন না। চরম মানসিক আঘাতের পর হৃদয়কে শান্ত ও অবিচল করে আবার স্বাভাবিকভাবে চিন্তা করা, স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা -– একমাত্র আল্লাহ্‌র সাহায্য ছাড়া কোন মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। মানুষকে সেই ক্ষমতা দেয়া হয় নি। আমরা যাকে মনের জোর বলি, সেটা শুধুমাত্র আল্লাহ্‌র সাহায্যেই অর্জন করা সম্ভব। হৃদয়ের ক্ষতচিহ্ন আরোগ্য করার ক্ষমতা শুধু আল্লাহ্‌র কাছেই আছে। এবং আল্লাহ্‌ কখন সেটি করেন? যখন বান্দা এক আল্লাহ্‌র উপর ঈমান আনে, আস্থা প্রকাশ করে অবিচল থাকে। শুধুমাত্র আল্লাহ্‌র উপর ঈমান আনার ফলাফলস্বরূপ আল্লাহ্‌র তরফ থেকে যে সাহায্য-শক্তি-সাহস পাওয়া যায় তার সাথে আর কোন কিছুরই তুলনা হয় না।

 কোন মায়ের পক্ষে তার সন্তানকে পানিতে ভাসিয়ে দেয়া সম্ভব নয়। কিন্তু আল্লাহ্‌‘তালা মুসা (আঃ) এর মায়ের হৃদয়কে এতোটাই শান্ত করে দিয়েছিলেন যে তিনি যে শুধু নিজের আবেগের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ লাভ করেছিলেন তাই নয়, বরং তিনি এই পরিস্থিতিতে ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করে মুসা (আঃ) এর বোনকে বাচ্চার পেছনে পেছনে যাবার নির্দেশ পর্যন্ত দিয়েছিলেন।  সন্তানের থেকে বিচ্ছেদের ফলে, তাঁর হৃদয় দুঃখ ভারাক্রান্ত হয়ে পড়েছিলো।  কিন্তু তাঁর ছিলো আল্লাহ্‌র কল্যাণকর পরিকল্পনার উপরে অগাধ বিশ্বাস।আল্লাহর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হওয়ার জন্য সময়ের প্রয়োজন। সেই সময় পর্যন্ত ধৈর্য্য ধারণের প্রয়োজন হয়। ফলে আল্লাহ্‌ মুসা (আঃ) এর মায়ের হৃদয়ে ধৈর্য্য ধারণের ক্ষমতা দ্বারা শক্তিশালী করেছিলেন। আল্লাহ্ পরম করুণাময়।


সবচেয়ে আশার কথা হচ্ছে, মুসা (আঃ) এর মা আমার-আপনার মত সাধারণ মানুষ ছিলেন, কোন নবী-রাসুল ছিলেন না। কিন্তু তিনি ছিলেন একজন দৃঢ় ঈমানের বিশ্বাসী নারী। শুধুমাত্র আল্লাহ্‌র প্রতি একান্ত ও বিশুদ্ধ বিশ্বাসের কারনেই তাঁর পক্ষে এই অকল্পনীয় কাজ করা সম্ভব হয়েছিল। তাই জেনে রাখুন, আপনি যে কোন মাত্রার মানসিক আঘাত, ব্যথা, বা যন্ত্রণায় ভুগছেন না কেন, যদি আল্লাহ্‌র উপর পূর্ণ বিশ্বাস থাকে, তাহলে আল্লাহ্‌ আপনার এই অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য অবশ্যই হস্তক্ষেপ করবেন। ফলশ্রুতিতে আপনার মন ও হৃদয়ে শান্তি আসবে ও পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাবেন। আল্লাহ্‌র সূদূর প্রসারী পরিকল্পনা ও দূরদর্শিতা কি ভাবে কাজ করে তার অনুধাবন করা সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। মুসা (আঃ) এর কাহিনীর মাধ্যমে এই চিরন্তন সত্যের দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। তাই কোন দুর্যোগ বা বিপদে ধৈর্য্যহারা না হয়ে আল্লাহ্‌র প্রতি ভরসা রেখে অগ্রসর হওয়া প্রয়োজন। আজ যা বিপদের কালো মেঘ, আগামীতে তাই-ই হয়তো সফলতার স্বর্ণ উজ্জ্বল দিন হয়ে দেখা যাবে যার খবর শুধু আল্লাহ্‌-ই জ্ঞাত।


আল্লাহ্‌ রাব্বুল আলামিন আমাদের সবাইকে তাঁর উপর সম্পূর্ণ আস্থাশীল হয়ে সব ধরনের বিপদ-আপদে ধৈর্য্য ধারণের ক্ষমতা দিক। কঠিন সময়ে আমাদের মন ও হৃদয়ে শান্তি দান করুন। আল্লাহ্‌র সহায়তায় আমরা যেন বিপদে নিজের উপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রেখে বিশ্বাস স্থাপনকারীদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারি।



[নোমান আলী খানের কুরানিক জেমস (Quranic Gems) সিরিজের বিশতম পর্বের বাংলা ভাবার্থ। দ্রুত অনুবাদ করার কারনে কিছু ভুল-ত্রুটি থাকাটাই স্বাভাবিক। আমার এই অনিচ্ছাকৃত ভুল আশাকরি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। যা কিছু কল্যাণকর তার সম্পূর্ণই আল্লাহ্‌র তরফ থেকে, আর যা কিছু ভুল সেটি সম্পূর্ণ আমার। আল্লাহ্‌ রাব্বুল আলামিন আমার সেই ভুলগুলো মার্জনা করুন। তিনি পরম ক্ষমাশীল, অসীম দয়ালু। আল্লাহ্‌তালা আমাদের সকলকে কুরআনের আয়াতসমূহ বুঝে পড়ার তৌফিক দান করুন এবং  সঠিক মর্মার্থ বুঝে সেই ভাবে জীবনকে পরিচালিত করার মত হিকমাহ, সাহস ও ধৈর্য দিক।]


(To watch the video go to: https://www.youtube.com/watch?v=DzSDr5xiGIE)

0 comments